পুজোয় যতই আসুক বর্ষা, দিদিই আসল ভরসা !

শংকর দত্ত, কলকাতা: তিনি এনআরসি আটকাতে লড়াই করেন। তিনি তিনতালাক বিলের বিরোধিতা করে গোটা দেশ তোলপাড় করেন। তবুও সময়ের নিয়মে সব কিছুই হয় যায়। তিনি রদ করতে পারেন না কিছুই। অবশ্য লোকে বলে একমাত্র শেষ প্রাকৃতিক বিপর্যয় যা বাংলার বুকে প্রবল ঘটার ছিলো, সেই ‘ফোনি’ ঝড় নাকি তাঁর ভয়েই আর আসেনি বাংলায়। বরং খড়গপুর থেকে সটান সে পিটটান মারে অন্য রাজ্য হয়ে বাংলাদেশে।

আর এখান থেকেই বঙ্গবাসীর একাংশের আশা তিনি চাইলে ঘোর দেবী-পক্ষে আটকাতে পারেন বারুনদেবকেও। আর এই কদিন মহালয়ার আগে থেকে চতুর্থী বা পাঞ্চমীর শেষ উদ্বোধনের দিন অব্দি তাঁর ‘স্তত্বপাঠ’ বা মন্ত্র উচ্চারণই একমাত্র রক্ষা করতে পারে বাংলাকে। মানে আবহাওয়া দপ্তরের হাল নির্দেশিকা ফেল হতে পারে এক মাত্র তাঁর চাওয়াতেই। এমনটাই ভাবছেন পুজো-প্রেমিক আম-বাঙালি।

এমনিতেই গোটা বিশ্বের সঙ্গে বঙ্গ জলবায়ু ঘেঁটে ‘ঘ।’ বাংলার প্যাচাল রাজনীতির মতোই এখানকার সোম-বছরের ছয় ঋতুর আর দেখা মেলে না। শীত আর গরমটা মানুষ ভোটের হওয়ার মতো খানিক অনুভব করলেও কবির লেখা ‘সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’ স্বাদকে ভুলতে বসেছে। কাশের বনে শিউলির তলায় শিশির ভেজা ঘাস এখন আর দেখা যায় না। উল্টে শারদ সুর বাজতেই ঝম ঝম করে অবিরাম দেখা বর্ষাসুরের।

শারদীয়া যে ‘বজ্জাত বাঙলীর’ই শ্রেষ্ঠ উৎসব এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখনো পর্যন্ত গোটা বিশ্বে যেখানেই দেবীর আরাধনা হোক না কেন, সর্বত্রই তারা এই কদিন আয়োজনের মাথাই থাকেন। যদিও এই উৎসব এখন সার্বোধর্মের প্রানের উৎসব। লুচি, মিষ্টি ইলিশ-পাবদা কিংবা কচি পাঠার ঝোল খেয়ে শুধুই ঢেঁকুর তোলা বাঙালিই যে চারদিন আলো মাখে তা নয়। সন্ধ্যে হলেই মায়ের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হাত মেলাতে ব্যস্ত থাকেন শিক-হুন্দোল, পাঠান-মোগল সকলেই।

তাই মহালয়া থেকে দশমী এই কটা দিন কোনও কিছুর সঙ্গেই কম্প্রোমাইজ নয়। কিন্তু অদৃষ্টের লিখন। এখন বিরেন্দ্রকৃষ্ণ বাজলেই সকাল টা আর কাশফুলের মতো সুন্দর হয় না। হয়তো ছোটবেলা থেকে পেট পুরে খেয়ে পাজামা-পাঞ্জাবী পরে অঞ্জলি দেওয়ার মহা পাপেই এখন আমরা জর্জরিত। তাই দেবী পক্ষের সূচনাটাও এখন পচা ভদ্রের মতোই প্যাচপ্যাচে কাদা ঘটার সকাল। বাবুঘাটে তার্পনে গিয়েও রোক্ষে নেই। অঝোরে ঝরছে বারিধারা। মহলায়ার পুন্য লগ্নেই রাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর খবর দিয়েছে,সামনের দিন খুব খারাপ। অন্তত দিন তিনেক রাজ্যের কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টি হতে পারে। পুজোর চারদিনেও নিশ্চিন্তি করে কি হবে তারা বলতে পারেননি। বৃষ্টি হলেও হতে পারের মতন পূর্বাভাস।

 

মা দুর্গা অসুর দমন করে এই ধরাতলে শান্তি ফিরিয়েছিলেন। বিশ্ব হয়ে উঠেছে ফুলে-ফলে সুজলা-সুফলা। এখন গোটা বিশ্ব চুলোয় যাক। পশ্চিমবঙ্গের আম-বাঙালির কি হবে সেটা নিয়েই ত্রাহি ত্রাহি রব। এদিকে এনআরসি বাংলায় হবে না, হতে দেব না, রক্ত দিয়ে আটকে দেব বলে শাসক প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে চিৎকার করলেও; মানুষকে বলছেন ভোটার লিস্টে নাম তোলো, রেশন কার্ড ডিজিটাল করে রাখো। আর বাংলা থেকে তারা খাওয়ার ভয়ে এক দল পুজোর কথা ভুলে কাতারে কাতারে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, আতঙ্কে আত্মহত্যা করেছেন। পুজোর আগে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বাপের জন্মে এদৃশ্য দেখতে হয়নি। তবুও এত কিছুর মাঝেও নতুন কিছু একটা কিনে নেওয়া, অন্যকে উপহার দেওয়া, বকশিশ দেওয়া এগুলোই আমাদের পরম্পরা। আতঙ্কের মাঝেও বাঙলী অপেক্ষার দিন গনে। অন্তত একটা দিন, একটা দিন যেন বৃষ্টি না হয়। কেউ চাইছেন পুজোর কটা দিন অন্তত বারুনবাবু ক্ষান্ত থাকুন।

আর এর মাঝেই সরকারি সাহায্য পাওয়া পুজো কমিটির অনেকেই ভাবছেন- চাইলে দিদিই একমাত্র আটকাতে পারেন বারুনদেবকে। তিনিই পারেন দুর্গার মহিষাসুর বোধের মতো রনচন্ডী হয়ে, এই ঘাতক বার্ষাসুরকে আটকে দিতে। কারণ এখনো পুজো উদ্বোধনে তাঁর মতো “স্তোত্রপাঠ’ বা ‘চন্ডীপাঠ’ কেউ করে উঠতে পারেনি এ বঙ্গে। তাই একমাত্র তিনি চিৎকার দিয়ে গলার শিরা ফলালেই রোক্ষে হতে পারে এই শারদ উৎসব। নাহলে আম-জনতার মতো সরকারের দেওয়া সত্তর কোটি টাকার পুজোর ভর্তুকিও যাবে গোল্লায়। তাই বরং এমন স্লোগান উঠলেও মন্দ হয় না, “পুজোয় যতই আসুক বর্ষা….দিদিই আসল ভরসা।”

@এস. এ. হামিদ

(Visited 14 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here