খড়গপুর-কালিয়াগঞ্জে এগিয়ে বিজেপি,জোর টক্কর করিমপুরে !

শংকর দত্ত, কলকাতা;  অবশেষে রাজ্যে আবার ভোট। আগামী ২৫ নভেম্বরেই রাজ্যের তিন জেলার তিন কেন্দ্রে উপ নির্বাচন। খড়গপুর ,করিমপুর ও কালিয়াগঞ্জে।

খড়গপুরের তৎকালীন বিধায়ক বিজেপির দীলিপ ঘোষ লোকসভায় জিতে আসার ফলে এই আসনটি ফাঁকা হয়। নদিয়ার করিমপুরের তৎকালীন বিধায়ক মহুয়া মৈত্র লোকসভায় কৃষ্ণগর থেকে জিতে আসায় করিমপুর আসনটি এবং উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জের কংগ্রেস বিধায়ক প্রমথনাথ রায়ের প্রয়ানে এই আসন টিতেও নতুন করে নির্বাচনের প্রয়োজন হয়।

শেষ লোকসভা নির্বাচনে শাসক তৃনমূলকে চাপে ফেলেছিলো গেরুয়া শিবির। প্রবল মোদী হওয়ায় রাজ্যের ৪২ আসনের মধ্যে ১৮ আসনে জয়লাভ করে বিজেপি। এর মধ্যে লোকসভার নিরিখে খড়গপুর ও কালিয়াগঞ্জ বিধানসভায় আবার বর্তমানে এগিয়ে বিজেপি।

প্রাথমিক ভাবে আতঙ্ক কাটিয়ে তৃনমূল আবার অনেকটাই চাঙ্গা। নিজেদের দিকে মানুষের মন ফেরাতে পিকে ফর্মুলাও অনেকটা কাজ দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ। অন্যদিকে ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী’র মতোই যুদ্ধ জয় করে উপনির্বাচনের তিনটি আসনই ছিনিয়ে নিতে মরিয়া বঙ্গ বিজেপি।হাল ছাড়েনি শেষ হয়ে যাওয়া কংগ্রেস ও সিপিএমও। নিজেদের অস্তিত্ব টেকাতে তারা এবার ঘোষিত ভাবেই এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে জোট প্রার্থী হয়ে লড়াইয়ের ময়দানে।

রাজ্যের প্রধান দুই দল তৃনমূল বিজেপির মতোই কংগ্রেস-সিপিএম জোটও ইতিমিধ্যেই তাঁদের প্রাথী ঘোষণা করেছে। এক কথায় সকলেই লাভের ফসল ঘরে তুলতে প্রস্তুত।প্রার্থী ঘোষণায় বরং দেরি করে ফেলেছে বিজেপিই।

এখন দেখার কোন আসনে জয়ের সম্ভাবনা কাদের বেশি।তিন আসনের মধ্যে খড়গপুরে এর আগে তৃনমূল কোনো কালেই দাঁত ফোটাতে পারেনি। সেখানে একসময় সিপিএম এবং পরে দীর্ঘকাল কংগ্রেসের আসন পাকা ছিলো। প্রয়াত কংগ্রেস নেতা জ্ঞান সিং সহনপাল(চাচা) এখানে দীর্ঘ দিনের কংগ্রেস বিধায়ক ছিলেন। তাঁকে হারিয়ে ২০১৬ সালে সেই আসন ছিনিয়ে নেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি দীলিপ ঘোষ। এর পর মেদিনীপুর লোকসভা ভোটেও খড়গপুর বিধান সভায় এত মার্জিনে তিনি জিতে যান। তাই বলাই যায় খড়গপুর একপ্রকার বিজেপির জেতা আসন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তৃণমূলের দাপুটে নেতা ভোট মাস্টার শুভেন্দু অধিকারীর নিজের জেলা মেদিনীপুর। তিনি জন্মসূত্রে পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা হলেও পশ্চিম মেদিনীপুরও এক প্রকার তাঁর কন্ট্রোলেই। তাই এই আসনটি নিজেদের দখলে নিতে এখন পুরোপুরি মাঠে নামছেন শুভেন্দু। তৃনমূল সুপ্রিমো যেকোনো মূল্যে এই আসনটি উপ নির্বাচনে নিজেদের করতে চাইছে।
এখানে তারা প্রাথী করেছে স্থানীয় নেতা প্রদীপ সরকারকে।

অন্যদিকে দীলিপ ঘোষ ও তাঁর অনুগামী প্রিয় পাত্র প্রেমচাঁদ ঝাঁকে প্রার্থী করে আসনটি আবার নিজেদের দখলে রাখতেই আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেদিক থেকে খড়গপুর নিজেদের দখলে রাখাটা যেমন বিজেপির প্রেস্টিজ ফাইট,তেমনই এই কেন্দ্রটিতে না জিততে পারাটাও তৃণমূলের পরাজয়। সিপিএম সমর্থিত জোট প্রাথী হিসাবে কংগ্রেসে এখানে প্রার্থী করেছে স্থানীয় নেতা চিত্তরঞ্জন মন্ডলকে। কিন্তু দুই প্রধান দলের লড়াইয়ে তাদের জিতে আসার সমস্যাও আছে।

নদীয়ার করিমপুর এই মুহূর্তে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। তৃনমূল শেষ লোকসভা ভোটেও এখানে এগিয়ে আছে। তাই এই আসন তারাই পাবে এমন আশায় বুক বেঁধেছে। তারা প্রাথী করেছে বিমলেন্দু সিংহ রায়কে। অন্যদিকে বিজেপি চেষ্টা করছে এই আসনটি ছিনিয়ে নিতে। আর তাই তারা প্রার্থী করেছে তাদের পরিচিত মুখ জয়প্রকাশ মজুমদারকে। যদিও রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য তৃণমূলের এই দুর্গে ধাক্কা দেওয়া খুব চাপের। কারণ এখানে সংখ্যালঘু ভোটও একটা বড় ফ্যাক্টর। সখ্যালঘু ভোটের বেশিরভাগ টাই যাবে তৃনমূল। যদিও কংগ্রেসের সমর্থনে এখানে জোট প্রাথী হিসাবে সিপিএম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে প্রার্থী করেছেন গোলাম রাব্বীকে। তা সত্ত্বেও এখানে তৃনমূলই আবার নিজেদের ধরে রাখবে বলে মনে করছেন অনেকে।

এক সময় প্রয়াত কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাশগুপ্তর নিজের লোকসভা কেন্দ্র রায়গঞ্জ থাকায় বরাবরই কালিয়াগঞ্জ কেন্দ্রটি কংগ্রেসের দখলে ছিলো। কিন্তু ২০১৯ লোকসভায় রায়গঞ্জ কেন্দ্রে সিপিএমের মোহাম্মদ সেলিমকে হারিয়ে মন্ত্রী হন দেবশ্রী রায়চৌধুরী। একই ভাবে তারা কংগ্রেসকে পিছনে ফেলে রায়গঞ্জ লোকসভার অন্তর্গত কালিয়াগঞ্জ বিধানসভাতে কংগ্রেসকে পিছনে ফেলে এগিয়ে আছে আশাতীত ভাবে। এখানে বিজেপি প্রাথী করেছে জেলা পরিষদ সদস্য কমলচন্দ্র সরকারকে। অন্যদিকে তৃনমূল প্রার্থী করেছে তপন দেব সিংহকে।কংগ্রেস বাম সমর্থন নিয়ে এখানে তাদের জোট প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করেছে তাদের দলের এই কেন্দ্রের প্রয়াত বিধায়ক প্রমথনাথ রায়ের কন্যা ধিষ্ঠাশ্রী রায়কে। তাই এখানে মূল লড়াইটা কংগ্রেস বনাম বিজেপির। যদিও তৃনমূল আসনটি ছিনিয়ে নিতে মরিয়া।

মনে রাখতে হবে লোকসভার নিরিখে খড়গপুর ও কালিয়াগঞ্জ বিজেপি এগিয়ে। করিমপুরে এগিয়ে তৃনমূল। এর মধ্যেই ২০১৬ আগে খড়গপুর এবং ২০১৬ পরেও কালিয়াগঞ্জ ছিলো কংগ্রেসের ভিত্তিভূমি।

এখন যদি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ করতে হয় তাহলে তিন কেন্দ্রেই মূল লড়াইটা হবে মূলত দ্বিমুখী। তৃনমূল বনাম বিজেপি। তবে খড়গপুরের বিজেপি প্রাথী প্রেমচাঁদ ঝাঁকে নিয়ে বিজেপির মধ্যেই অন্তর্দন্ড প্রকাশ্যে আসছে। জানা যাচ্ছে এখানে প্রেমচাঁদ ঝাঁকে এখানে পছন্দ করছে না দলেরই একটা বড় অংশ। তবে এখানে আসল বাজিটা ধরেছেন স্বয়ং দীলিপ ঘোষ। আর তাঁকে পাঙ্গা নিতে তৈরি রাজ্যের মন্ত্রী শুভেন্ধু অধিকারী।

অন্যদিকে করিমপুরে লড়াইটা দ্বিমুখী হলেও সিপিএমের পুনরিজজীবনের এটা মস্ত চ্যালেঞ্জ। আর কালিয়াগঞ্জ এ তৃনমূল-বিজেপি লড়াই হলেও ফাঁক তালে গলার সম্ভাবনায় দিন গুনছে কংগ্রেস প্রার্থী।

তিন কেন্দ্রে শেষ হাসি কে হাসবে এটা এখন থেকেই বলা মুশকিল। তবে বিজেপি বা তৃনমূল যদি ভাবে তিন কেন্দ্রেই তারা জিতবে,এটা সত্যের অপলাপ হলেও হতে পারে। কারণ লোকসভায় যে প্রবল মোদি হওয়া ছিলো, সেটা এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। এই ফাঁকে দুর্বল সংগঠন গোছাতে খানিকটা সফল হয়েছে তৃনমূল। এই অবস্থায় শুধু সম্ভাবনার কথা বলা যায় মাত্র। খড়গপুর ও কালিয়াগঞ্জ বিধানসভায় কম মার্জিন হলেও বিজেপির জিতে আসবার যেমন হওয়া তৈরি হয়েছে। তেমনি একই ভাবে করিমপুর ও খড়গপুর তৃনমূল জিতবে না এটা বলাও মুশকিল।
অন্যদিকে সংগঠন তলানিতে গেলেও এখনো কিছু মানুষ লুকিয়ে-চুড়িয়ে হলেও বামেদের বা কংগ্রেসের দিকে আছেন। এই দুটি শরিক দলের জোট হওয়ায় সেই সব ভোটার ও কর্মীরাও খানিকটা উজ্জীবিত। তাই তৃনমূল-বিজেপির ভোট কাটাকাটিতে করিমপুর বা কালিয়াগঞ্জ এর যেকোনো একটি আসনে কংগ্রেস-সিপিএম জোট প্রাথী জিতলেও জেতার ক্ষীণ আশা থাকতে পারে। আগামী ২৮ নভেম্বরেই ঘটবে আসল রহস্যের উন্মোচন।

(Visited 38 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here