২০০তম জন্মদিবসে বাংলার অদম্য মহাপুরুষ বিদ্যাসাগর

মনোজ রায়: আজ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০০তম জন্মদিবস। সেই উপলক্ষে শহরে আয়োজিত হয়েছে নানা অনুষ্ঠান। সকাল থেকেই রাজ্যজুরে বিভিন্ন জায়গায় প্রভাতফেরী, কিংবা রাস্তার মোড়ে মোড়ে পালিত হল তাঁর জন্মদিবস।  ঊনবিংশ শতাব্দীতে অনেক গণ্যমান্য মহাপুরুষরা জন্মেছিলেন। পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। সমাজে শিক্ষা ও সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। ১৮২০ সালে ২৬শে সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে ঠাকুরদাস বন্দোপাধ্যায় এবং ভগবতী দেবীর গৃহে জন্ম গ্রহণ করেন এই মহামানব ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। সমাজে শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অমূল্য অবদানের কারণে তিনি পরিচিত বিদ্যাসাগর নামে। তাঁর সম্পর্কে যত বেশিই বলা যায়, তা অনেক কম হবে।

প্রচুর দারিদ্রতার মধ্যে জীবন যাপন করলেও ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মনোভাব ছিল একদম দৃঢ়। এই কাহিনীটি আমারা ছোটবেলাতেই পড়েছিলাম যে একবার তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে কলকাতায় যাচ্ছিলেন। সেখানে পথের ধারে কিছুদুর অন্তর অন্তর মাইলস্টোন পোঁতা ছিল। বিদ্যাসাগর তাঁর বাবাকে জিজ্ঞাসা করেন, পথের ধারে শীলের মত দেখতে ওই জিনিসটা কী? তখন তাঁর বাবা তাঁকে বোঝান যে এটিকে মাইলস্টোন বলে এবং এর মধ্যে লেখা ইংরাজি সংখ্যাগুলো জায়গার দূরত্ব নির্ণয় করছে। অর্থাৎ সেখান থেকে কলকাতার দূরত্ব আর কতটা, সেটা বোঝাচ্ছে।

এরপর বিদ্যাসাগর সেই মাইলস্টোনে লেখা ইংরাজি সংখ্যা গুনতে গুনতে পথ চলতে থাকেন আর শিখে ফেলেন ইংরাজি গণনা।শিক্ষক জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের একজন বিশেষ ছাত্র ছিলেন বিদ্যাসাগর। তাঁর কাছে পড়েই তিনি সংস্কৃত কলেজে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন।এরপর বিদ্যাসাগর সেই কলেজ থেকেই সংস্কৃত বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর একে একে ব্যাকরণ,বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায়,জ্যোতিষ শাস্ত্র, কাব্য এবং অলঙ্কার প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করেন এবং একসময় সেইসব বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জনও করেন। তাঁর এক গলা জল নদি সাঁতরে মায়ের ডাকে ছুটে যাওয়ার ঘটনাটিও কারও অজানা নয়।

১৮৩৫ সালে তিনি  দিনময়ী দেবীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫ বছর। এরপর মাত্র ২১ বছর বয়সেই ৫০ টাকা বেতনের ভিত্তিতে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত হন। ১৮৪৭ সালে তিনি একটি বইয়ের দোকান স্থাপন করেন যেটার নাম দেওয়া হয় সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি। সেই বছরেই তিনি প্রকাশ করেন হিন্দি ‘বেতাল পচ্চিসী’ অবলম্বনে রচিত তাঁর লেখা প্রথম গ্রন্থ  ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ গ্রন্থটিকে। এরপর ১৮৪৯ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর লেখা ‘জীবনচরিত’ এবং তারপর ১৮৫১ সালের এপ্রিল মাসে  প্রকাশ করেন ‘বোধদয়’।

বন্ধুদের সহযোগিতায়  তিনি অবশেষে সমাজ সংস্কারের কাজে আত্মনিবেশ করেন। ১৮৫০ সালে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সাথে মিলে তিনি ‘সর্ব্বশুভকরী’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। সেই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ‘বাল্য বিবাহের দোষ’ নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত করা হয়। এরপর নিজের জন্মভূমি বীরসিংহ গ্রামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন একটি অবৈতনিক স্কুল। সেই সঙ্গে নারী শিক্ষার প্রসারও করেন তিনি। সমাজের চিরাচরিত রীতি-নীতি ভেঙে চালু করেন বিধবা বিবাহ প্রথার। যার ফলে তাঁকে অনেক অপমান ও বিদ্রুপ সহ্য করতে হয়।

এছাড়াও ছোটদের শিক্ষার জন্য তিনি রচনা করেন ‘বর্ণপরিচয়’, ‘কথামালা’ ও ঈশপের গল্পের মত কিছু অনবদ্য বই, যা আমাদের শৈশব ও কৈশোরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। পুরো এক বছরের মধ্যে  সারা দক্ষিণবঙ্গে  তিনি ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তবে নিজের কাজের জন্য তিনি কোনদিনও ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকে কোনও রকমের স্বীকৃতি বা আর্থিক সহায়তা পাননি।

শেষ জীবনে এসে তিনি কলকাতার বাদুড়বাগানে বসতবাড়ি নির্মাণ করেন এবং ১৮৭৭ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি সেখানেই বাস করতে থাকেন। রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব ১৮৮২ সালের ৫ আগস্ট বাদুড়বাগানের সেই বাড়িতে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা করতে যান।অবশেষে সেই বাড়িতেই তিনই ১৮৯১ সালে ২৯শে জুলাই প্রায় ৭১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আজ প্রত্যেক বাঙালির গর্ব। সমগ্র বাঙালী সমাজ আজ তাঁর কাছে ঋণী। বিদ্যাসাগরের জীবনী আমাদের কাছে শুধু একটি জীবনী নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ শিক্ষার সমান। শুধুমাত্র ফটো লাগিয়ে রাস্তায় রাস্তায় প্রভাতফেরী করে কিংবা তাঁর জন্মদিন পালন করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়না। তাঁর ন্যায়-নীতি, আদর্শ, কুসংস্কারমুক্ত ভাবনা এগুলি আমাদের অবশ্যই অনুসরণ করা উচিত। তাহলেই তাঁর জন্মদিবস পালন সার্থক হবে। রবীন্দ্রনাথের মতে, ১৮২০ সালে মোট বাঙালির সংখ্যা  ছিল প্রায় চার কোটি। তারমধ্যে একজনই মনুষ্যপদবাচ্য – তাঁর নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

@মনোজ

(Visited 127 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here