নিজেকে ও দলের চাঁইদের বাঁচাতে রাজীব কুমারকে খুন করাতেও পারেন তৃণমূল সুপ্রিমো

শংকর দত্ত, কলকাতা: প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র যথার্থই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি যা বলতে চেয়েছেন, রাজীব কুমার ধরা পড়লেই শাসক দলের অনেক প্রথম সারির মাথার নাম সামনে চলে আসবে। আর এ কারণে রাজ্যের শাসক দল যেকোনো মূল্যে সিবিআইয়ের জালে রাজীব কুমার যাতে ধরা না পড়েন সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ বার বার অনুরোধ, উপরোধ করে এবং নোটিশ পাঠিয়েও সিবিআই ধৈয্যের পরীক্ষা দিলেও রাজ্যের প্রশাসন কোনও ভাবেই এই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে সাহায্য করছে না, বরং উল্টে তাদের অসহযোগিতা করছে। ফেলছে আতান্তরে।

এদিকে নানান আইনী পরামর্শ নিয়ে সমস্ত রকম ঘুটি সাজিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তারের হাতে গরম সুযোগ পেয়েও সিবিআই রাজীব কুমারকে গ্রেপ্তার করা তো দূর-আস্ত, তাঁর নাগাল পর্যন্ত খুঁজেও পাইনি আজও। যদিও তাঁরা নতুন টিম বানিয়ে গোটা শহর ও তার আশপাশের সম্ভাব্য এলাকা ঢুঁরে ফেলেছে, তারপরও রাজীব রয়েছেন অধরাই। এই অবস্থায় আজ সাংবাদিকদের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র জানান, তিনি যেখানেই থাকুন সিবিআই যেন তাঁকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে এসে গ্রেপ্তার করে। কারণ শাসক দলের চাঁইরা নিজেদের বাঁচাতে রাজীবকে খুন বা গুম করেও দিতে পারে বলেই তাঁর আশঙ্কা।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন তাঁর এই বক্তব্য একেবারে অমূলকও নয়। হতেই পারে এমন কাণ্ড। কারণ এই সারদা কাণ্ডেই সরকার বিরোধী মুখ বন্ধ করাতে শাসক দলেরই সাংসদ কুনাল ঘোষকে তদন্তের নামে আটক করে জেলবন্দী করেছিল এই সরকারই এবং সেই গ্রেপ্তারি হয় রাজীবের হাত দিয়েই। কারণ তখন রাজীব কুমারই ছিলেন সারদা তদন্তের জন্য গঠিত সিট-এর মূল মাথা। এখন থেকেই পরিষ্কার যে নিজের দলের রাজ্য সভার সাংসদ এর সামান্যতম সমালোচনা শুনতে না পেরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন নিজের পুলিশ দিয়েই তাকে গ্রেপ্তার করাতে পারেন। সেখানে সিবিআই রাজীব কুমারকে গ্রেপ্তার করলে মূল ঘটনায় কোন কোন মাথার জেল হবে সেটা ভেবেই আতঙ্কে শাসক শিবির যে যেকোনো রকম ছক কসতে পারেই বলে অনেকের মত। আর এই ছকের মধ্যে রাজীবকে সিবিআই গ্রেপ্তারি থেকে বাঁচাতে তাঁকে গায়েব করে দেওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

কুণাল ঘোষ অন্য অনেক সুবিধা ভোগীর মতো সারদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগের অন্যতম ছিলেন, কিন্তু রাজীব তাঁর থেকেও অনেক বড়ো চাঁই। রাজীব গোটা সারদা ঘটালাটাই ওলটপালট করে দিতে চেয়েছেন নিজে তদন্তের মূল দায়িত্বে থাকার সুবাদেই। তিনি যে বহু তথ্য নষ্ট করেছেন, বহু তথ্য গায়েব করেছেন সেটা আজ জলের মতোই পরিষ্কার। অতি সম্প্রতি সারদার অন্যতম মালকিন দেবযানী মুখোপাধ্যায় নিজের মুখেই রাজীবের বিরুদ্ধে এই তথ্য লোপাটের অভিযোগ এনেছেন নতুন করে। যেটা রাজীবকে গ্রেপ্তার করতে ও চাপে ফেলে নতুন তথ্য পেতে সিবিআইয়ের বিশেষ হাতিয়ার এই মুহূর্তে।

অন্যদিকে সকলেরই মনে আছে, শাসকদলের সাংসদ হওয়া সত্ত্বেও রাজ্যের পুলিশ কুনাল ঘোষকে সাংবাদিকের থেকে আড়াল করতে বিভিন্ন সময় তার ওপর কী ধরনের ব্যবহার করেছিলেন। অনেক সময় কোর্টে তোলবার আগে বা পরে সরাসরি অন ক্যামেরা যেভাবে তাঁর ওপর অত্যাচার করেন এবং মারধর করেন সেটাও আজ সবার জানা। তাই কুনাল মুখ ফসকে সরকার বিরোধী কথা বলতে গিয়ে যে বাধা পান রাজীব কুমারকে যে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি বাধা দেবে শাসক দল সেটা আজ জলের মতোই পরিষ্কার। তাই এখনও যতক্ষণ পারা যায় তারা রাজীব কুমারকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বটে, তবে নিয়মের বের জালেই রাজীবকে হয় ধরা পড়তে হবে না হয় সিবিআই এর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। কারণ দেশের সুপ্রিম কোর্ট থেকে হাই কোর্ট এমনকি যে আদালতে সারদার মূল বিচারপর্ব শুরু সেই আলিপুর আদালতের নির্দেশেও রাজীবকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সিবিআই এর আর বাধা নেই এই মুহূর্তে।

অন্যদিকে পুরানো কয়েকটি বিষয় মনে করলেই বোঝা যাবে নিজেদের বাঁচাতে বা কলঙ্কমুক্ত এটা প্রমান করতে বর্তমান শাসক তৃনমূল দলের মূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সব সময়ই ডিফেন্স খেলেন। কারণ সারদাকাণ্ডে জেল হওয়ায় ওড়িশার জেলে তাঁর দলের তৎকালীন সাংসদ অভিনেতা তাপস পাল আটকে থাকলেও মমতা কোনও ভাবেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। দলের রাজনৈতিক সম্পদ হিসাবে পরিগণিত অন্য সাংসদ সুদীপ বন্দোপাধ্যায়ের খোঁজ খবর খানিকটা রাখলেও তাপস পালকে তিনি অচ্ছুৎ করে দেন এবং তাপস পাল বর্তমানে জামিনে জেলের বাইরে এলেও তৃনমূল সুকৌশলে তাঁকে আউট করে দিয়েছে। এই রকম হাজার হাজার উদাহরণ আছে। দল থেকে বেরিয়ে যেতেই তাঁর দলের এক সময়ের একাধিক দুর্মূল্য সম্পদ বর্তমানে বিজেপি র সাংসদ অর্জুন সিং, সৌমিত্র খান থেকে নিশীথ প্রামাণিকের ওপর যে ধরনের কেস মামলা দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়,সেটাও নজির সৃষ্টিকারী। পাড়ায় পাড়ায় গ্রামে গ্রামে তৃনমূল বিরোধী স্বরকে যেভাবে থামানোর চেষ্টা পুলিশ প্রশাসন ও দলের তরফে। তার নজির গুলোই বলে দেয় আর যাইহোক নিজেকে বাঁচাতে ও ভাইপো অভিষেক বন্দোপাধ্যায় বা দলের অন্য মাথাদের রক্ষা করতে মমতা যা খুশি করতে পারেন। সেক্ষেত্রে রাজীব কুমারকে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিতে চাওয়াটাও আশ্চর্যের কিছু নয় এই মুহূর্তে।

sweta

(Visited 1 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here