এই পরাজয়ই ২০২১ এ বিজেপিকে জয়ের পথে এগিয়ে দেবে

শংকর দত্ত, কলকাতা: ‘তিন পা পিছিয়ে আশা মানেই একটা বড় লংজাম্পের প্রস্তুতি। অনেক সময় লম্বা দৌড় লাগাতে গেলেও একটু পিছনে যাওয়ার দরকার পড়ে।’ কথা গুলো বলেছিলেন বিজেপি রাজ্য যুব মোর্চার দাপুটে নেতা শঙ্কুদেব পাণ্ডা।। উপনির্বাচনে এই হারটাকে বিজেপির সামগ্রিক পরাজয় বলে তিনি মানতে না রাজ। ঠিক যেমন বৃহস্পতিবারই দিল্লিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে আত্মপ্রযের সঙ্গেই দীলিপ ঘোষ সাফ জানান, ‘বহু রাজ্যে উপনির্বাচনে এমন ফল হয়েই থাকে। এমনকি অনেক সময় শাসকদলও হেরে যায়। এটা সাময়িক একটা ধাক্কা। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে সব সাফ হয়ে যাবে।’ এদিন তিনি স্বীকারও করেছেন প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে হয়তো ঠিক হয়নি, মানুষ হয়তো কোথাও প্রার্থীকে মেনে নেয়নি। এমনকি এনআরসিও কোথাও মানুষের কাছে চাপ সৃষ্টি করেছে ।

যখন এই পরাজয় নিয়ে দলের মধ্যেই আড়ালে-আবডালে সমালোচিত হচ্ছেন বঙ্গ বিজেপির প্রধান ক্যাপ্টেন দিলীপ ঘোষ, সেই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়েও তিনি ‘উনিশে হাফ একুশে সাফ’ টোটকা স্লোগানেই চরম আত্মবিশ্বাসী।

এই মুহূর্তে দিলীপ ঘোষকে দেখে আমার মনে পড়ছে স্কটল্যান্ডের রাজা ব্রুসের কথা। রবার্ট ব্রুস একাধিকবার স্কটিশদের ঐক্যবদ্ধ করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।কিন্তু বার বার তিনি পরাজিতই হয়েছিলেন। একসময় সব হারিয়ে তিনি গুহার ভিতরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে একটি মাকড়শাকে দেখলেন প্রবল হওয়ার প্রতিকূলতার মধ্যে কিভাবে শতবার চেষ্টা করে একটা জাল বুনেছিল। এই ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রুস আবার তাঁর সৈন্যদের জড়ো করে এবং শেষ পর্যন্ত বাকুনবার্নের যুদ্ধে ইংরেজদের চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত করেন।

দিলীপ ঘোষের অবস্থা ব্রুসের মতো এতখানি সঙ্গীন নয়। বরং দিলীপ ঘোষই রাজ্যে বিজেপির সভাপতি হওয়ার পর প্রথম নিজে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে জয়ী হয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে ক্যাপ্টেন কেও জিতে দেখতে হয়। লোকসভার ভোটেও তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সঙ্গে আরও ১৭ জন সাংসদ কে নিয়ে দিল্লি গেছেন।

ভোট স্ট্যট্রেজি যাইহোক, যাঁর কারিশমার জোরেই হোক শেষ লোকসভা নির্বাচনে দিলীপ ঘোষ সহ যাঁরা জিতে দিল্লি গেছেন সবটাই দিলীপ ঘোষের আমলেই।

অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, সম্মান থাকতে দিলীপ ঘোষের সভাপতি পদ এই মুহূর্তে ছেড়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু মুশকিল হলো দিলীপ ঘোষের পর তাঁর কায়দায় বঙ্গ বিজেপিকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনও মুখ নেই। যারা ঘরে-বাইরে আজ দিলীপ বাবুর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা কেউই তাঁর বিকল্প মুখের নাম বলতে পারছেন না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মার খেয়ে, তারা খেয়ে যেভাবে গত কয়েকবছর ধরে তিনি আঞ্চলিক নেতা কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি করেছেন, যে ভাবে মারের বদলা পাল্টা মার দিতে সাহস জুগিয়েছেন, যেভাবে নিজে বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে থেকেছেন সেটা অনেকেই করতে পারেননি।

[আরও পড়ুন: একুশের সাফল্য পেতে বামনেতাদের দলে ভিড়াতে তৎপরতা গেরুয়া শিবিরের!]

তবে এই ৩-০ গোলে গো-হারান হওয়ার ঘাটনাকেও মেনে নেওয়া যায় না। আর যাইহোক উপনির্বাচনে তিনটার মধ্যে দুটি আসন বিজেপি জয়লাভ করতেই পারতো। এক্ষেত্রে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে খানিকটা এক গুয়েমি হয়ে থাকতে পারে। তৃণমূলের শুভেন্ধু অধিকারী, রাজীব বন্দোপাধ্যায় বা মহুয়া মৈত্রের মতো দাপুটে, সুবক্তা শিক্ষিত এবং দলের প্রতি নিবেদিত প্রাণ সংগঠকদের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে গেলে যে ভোট স্ট্যট্রেজি দরকার সেটা বিজেপি নিতে পারেনি। যেমন অনেকেই বলছেন করিমপুরের মতো সংখ্যালঘু আধুইসিত কেন্দ্রে মাফুজা বেগমের মতো সুবক্তা সংখ্যালঘু মহিলা মোর্চার নেত্রীকে প্রার্থী করলে ফল অন্যরকম হতে পারতো। সেক্ষেত্রে এই কেন্দ্রকে ভোট করানোর দায়িত্ব পুরোপুরি মুকুল রায়ের ওপর থাকলে তিনি আলাদা খেলা খেলে দিতে পারতেন বলে অনেকে মনে করছেন। অন্যদিকে রাজনীতির ক্ষেত্রে ভালোবাসা আর প্রতিশ্রুতি কথা মাথায় না রেখে বিজেপি যুব মোর্চা থেকেই কোনও লড়াকু দাপুটে সংগঠক ফ্রেশ ভাবমূর্তির কাউকে বাইরে থেকে নিয়ে প্রার্থী করে এবং সেখানে অর্জুন সিংয়ের মতো দাপুটে সাংসদকে ভোট করানোর দায়িত্ব দিলে হয়তো বা ফল ভালো হতে পারতো। কারণ শুধু জেলা বিজেপিই নয়, আঞ্চলিক ভোটারদের মনে, বিশেষত এই অঞ্চলের অবাঙালি ও তামিল ভোটারদের মনেও প্রেমচাঁদ ঝাঁ-র জায়গা তেমন ছিল না সেটা আগাম আঁচ করতে অক্ষম হয়েছেন দীলিপ বাবু।

অন্যদিকে এই দুই কেন্দ্রের প্রাথী নিয়ে সংশয় থাকলেও কালিয়াগঞ্জ কেন্দ্রের প্রার্থী কমল সরকারকে নিয়ে কোনও সমস্যাও ছিল না। সাদামাটা কৃষিক পরিবারের জেলা পরিষদ সদস্য কমল বাবুকে এলাকার মানুষ পছন্দও করেন। সেক্ষেত্রে মূল ভোট মেশিনারি পুরোপুরিই ছাড়তে লাগতো উত্তরবঙ্গের তরুণ দাপুটে সংসদ নিশীথ প্রামানিককে। যার উত্তরবঙ্গে নিজস্ব একটা মাজবুত সংগঠন আছে।

আর তিনটি কেন্দ্র ঘুরেই রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ নিজে মনিটরিং করতেন। সবার ওপর লক্ষ জয়ের টার্গেট বেঁধে দিতেন। বাকি ১৭ জন সংসাদকেও উপনির্বাচনে কাজে ব্যাপক ভাবে ব্যবহার করা হইনি। যতটা করলে সাংগঠনিক ভাবে তাঁরা দলের কাছে দায়বদ্ধ হতে পারতেন। নিজেদের দলের বিধায়কদের ওপরও ভরসা রাখতে পারেননি। তা না হলেই এই মুহূর্তে লোকসভায় ১৮ আসনে জয়লাভের পরে উক্ত লোকসভা গুলিতে নিজেদের যে সাংগঠনিক শক্তি এবং তাদের দলের সমস্ত বিধায়কদের মিলিত শক্তি এক হয়ে যদি এই তিন কেন্দ্রে ঝাওইয়ে পড়তো তাতে অন্তত তিনটি কেন্দ্রই তাঁদের হাত ছাড়া হতো না এটা নিশ্চিত বলা যায়। কিন্তু হয়তো কোথাও তাঁদের আত্মবিশ্বাস অনেকটা দাম্ভিকতার ভোরে ছিলো। হয়তো ‘আমিই শেষ কথা’ এমন ভাবও প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বা ভোট স্ট্রাটেজি তৈরি করতে কোথাও কাজ করেছিল। নয়তো লোকসভার মতোই মানুষ দুই হাত খুলে ভোট দেবেন বিজিপিকে এমন আত্ম-সন্তুষ্টি জেগে ছিলো কারো কারো মনে। আর প্রবল আত্মবিশ্বাসই অনেক সময় যে নিজের আত্মার সঙ্গেও বিটরে করে সেটাও আজ নতুন করে প্রমাণ হল।

এরপরও বলবো, এই মুহূর্তে এক মাত্র দিলীপ ঘোষই রাজ্য বিজেপির সঠিক মুখ। যিনি ভুল হলে ভুল স্বীকার করতে জানেন, যিনি দোষ করলে ক্ষমা চাইতে জানেন, যিনি বিজেপি কর্মী খুন হলে অত্যাচারিত হলে কাঁদতে জানেন। একই সঙ্গে সমস্ত বাধা বিঘ্ন কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। যাকে কোনও বন্ধ সেমিনার হয়ে আটকে রেখে বক্তৃতা দিতে ডাকলে বলেন,’আমি ফিল্ডের লোক। মাঠে খেলতে ভালোবাসি, মানুষের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করি।’ যিনি বিজেপির প্রভাবিত কোনও সাংসকৃতিক মঞ্চে দলের কোনও নেতাকে গান করতে দেখে অনায়াসেই বলতে পারেন, ‘আমি গান কিভাবে ধরেন জানি না,তবে মেশিন গান বুঝি।’

তাই সব বাধা কাটিয়ে, নিজেদের আত্মসুদ্ধি করে সকলকে সঙ্গে নিয়েই আগামীর লড়াই বঙ্গ বিজেপি আবার ঘুরে দাঁড়াবে এখন থেকে সেটা আশাতেই তাকিয়ে বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা।

(shreyashree)

(Visited 2 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here