আত্ম-সমীক্ষার মধ্যে দিয়েই ২১ এর লক্ষ্যে বিজেপি

শংকর দত্ত, কলকাতা : সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে রাজ্যের তিন জেলার তিন কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিজেপির পরাজয়কে অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। লোকসভা নির্বাচনের রাজ্যে শক্ত জমি তৈরি করে ছ’মাসের মধ্যেই এই গো-হারান হারকে কোনও ভাবেই এক-মুখী ব্যাখ্যা দিতে না রাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে দলের মধ্যেও উঠে আসছে নানান মন্তব্য,সমালোচনা।

এই হারের পর জেলায় জেলায় তৃণমূলের তাণ্ডবকে সোশ্যাল মিডিয়াতে সমালোচনা করেছেন প্রাক্তন সাংসদ বিজেপির অধ্যাপক নেতা অনুপম হাজরা। তিনি শাসক দলকে সমালোচনার পাশপাশিই সরাসরি আত্মসমালোচনা করে নিজের দলকেও এক হাত নিয়েছেন। তিনি বলেছেন ,দলের গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব লবি প্রসঙ্গেও। লবি করতে গিয়ে রাজ্যে বিজেপি যে সংগঠিনক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সেটাও উল্লেখ করেছেন তাঁর বক্তব্যে।
একই সঙ্গে বিজেপির রাজ্য সহ-সভাপতি নেতাজী পরিবারের উত্তরসূরী চন্দ্রনাথ বসুও টুইটার এবং সংবাদমাধ্যমে এই বাংলায় এন আর সি নিয়ে দলের ভিন্ন স্ট্যান্ড পয়েন্ট থাকা উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন। এন আর সি নিয়ে তৃণমূল যে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে ভোটের ফায়দা নিয়েছে সেটা বলেছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়ও। যদিও এই হারের জন্য সরাসরি দিলীপ ঘোষ বা মুকুল রায়কে প্রকাশ্যে দলের কেউ সমালোচনা করেননি। তা সত্ত্বেও ঘুরিয়ে নাক অনেকেই দেখিয়েছেন।  বিজেপি নেতা রান্তিদেব সেনগুপ্ত হারের পরেই ফেসবুকে দলের কারও কারও আত্ম-সন্তুষ্টি ও দম্ভের কথা উল্লেখ করে পরোক্ষে সমালোচনা করেন। তবে কেউই এই হারের জন্য সরাসরি বিজেপি রাজ্য সভাপতি দীলিপ ঘোষ,মুকুল রায় বা অন্য কোনও শীর্ষ নেতার সমালোচনা করেননি।

অন্যদিকে বিজেপির এই উপনির্বাচনে হারকে সামগ্রিক হার বলে মেনে নিতে নারাজ দলের যুব মোর্চার তরুণ তুর্কি নেতা শঙ্কুদেব পাণ্ডা। বরং তিনি ২০২১ এর বিধানসভা নিয়ে অনেক বেশি আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘তিন পা পিছিয়ে আশা মানেই একটা বড় লংজাম্পের প্রস্তুতি। অনেক সময় লম্বা দৌড় লাগাতে গেলেও একটু পিছনে যাওয়ার দরকার পড়ে।’

ঠিক যেমন ফল বেরোনোর পরই বৃহস্পতিবার দিল্লিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে আত্মপ্রযের সঙ্গেই দিলীপ ঘোষ সাফ জানান, ‘বহু রাজ্যে উপনির্বাচনে এমন ফল হয়েই থাকে। এমিনকি অনেক সময় শাসকদলও হেরে যায়। এটা সাময়িক একটা ধাক্কা। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে সব সাফ হয়ে যাবে।’ এদিন তিনি স্বীকারও করেছেন প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে হয়তো কোথাও কোথাও ঠিক হয়নি। মানুষ হয়তো কোথাও প্রার্থীকে মেনে নেয়নি। দলের সাংগঠনিক ত্রুটি সংস্কার করেই বরং তিনি আবার নতুন ভাবে এগোতে চান একুশের লক্ষ্যে।যখন এই পরাজয় নিয়ে দলের মধ্যেই আড়ালে-আবডালে সমালোচিত হছেন বঙ্গ বিজেপির প্রধান ক্যাপ্টেন দীলিপ ঘোষ,সেই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়েও তিনি ‘উনিশে হাফ একুশে সাফ’ টোটকা স্লোগানেই চরম আত্মবিশ্বাসী।

তবে এই ৩-০ গোলে গো-হারান হওয়ার ঘাটনাকেও মেনে নেওয়া যায় না। আর যাইহোক উপনির্বাচনে তিনটার মধ্যে দুটি আসন বিজেপি জয়লাভ করতেই পারতো। এক্ষেত্রে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে খানিকটা এক গুয়েমি হয়ে থাকতে পারে। তৃণমূলের শুভেন্ধু অধিকারী,রাজীব বন্দোপাধ্যায় বা মহুয়া মৈত্রের মতো দাপুটে,সুবক্তা শিক্ষিত এবং দলের প্রতি নিবেদিত প্রাণ সংগঠকদের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে গেলে যে ভোট স্ট্যট্রেজি দরকার সেটা বিজেপি নিতে পারেনি।

[আরও পড়ুন: নেতাজির মূর্তি বসাতে দিল না বিধাননগর পুরনিগম! ক্ষুব্ধ বিজেপি]

অনেকেই মনে করছেন, করিমপুরের মতো সংখ্যালঘু আধ্যুষিত কেন্দ্রে মাফুজা খাতুনের মতো সুবক্তা সংখ্যালঘু মহিলা মোর্চার নেত্রীকে প্রার্থী করলে ফল অন্যরকম হতে পারতো। সেক্ষেত্রে এই কেন্দ্রকে ভোট করানোর দায়িত্ব পুরোপুরি মুকুল রায়ের ওপর থাকলে তিনি আলাদা খেলা খেলে দিতে পারতেন হতো বা।

আবার বিজেপিরই একাংশ বলছেন খড়গপুরের প্রাথী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভালোবাসা আর প্রতিশ্রুতির কথা মাথায় না রেখে বিজেপি যুব মোর্চা থেকেই কোনও লড়াকু দাপুটে সংগঠক বা পশ্চিম মেদিনীপুরের অন্য কোনও তুলনায় ফ্রেশ ভাবমূর্তির কাউকে প্রাথী করলে হয়তো বিজেপি তাদের জেতা আসন ধরে রাখতে পারতো।

অন্যদিকে এই দুই কেন্দ্রের প্রাথী নিয়ে সংশয় থাকলেও কালিয়াগঞ্জ কেন্দ্রের প্রার্থী কমল সরকার কে নিয়ে কোনও সমস্যাও ছিলো না। সাদামাটা কৃষিক পরিবারের জেলা পরিষদ সদস্য কমল বাবুকে এলাকার মানুষ পছন্দও করেন। সেক্ষেত্রে মূল ভোট মেশিনারি পুরোপুরিই ছাড়তে লাগতো উত্তরবঙ্গের তরুণ দাপুটে সংসদ নিশীথ প্রামানিককে। যার উত্তরবঙ্গে নিজস্ব একটা মাজৰুত সংগঠন আছে। দলের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে রায়গঞ্জের সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী জনপ্রিয়তা নিয়েও।

দিলীপ ঘোষ ছাড়াও বাকি ১৭ জন সংসাদকে এবং নিজেদের দলের বিধায়কদের উপনির্বাচনে কাজে ব্যাপক ভাবে লাগানো যেত। হয়তো ‘বিনা বাধাতেই জিতবো’,বা ‘মানুষ আমাদের সঙ্গেই আছে,’এমন আত্ম-সন্তুষ্টির কারণেই নির্বাচনী স্ট্রাটেজিতে কোথায়ও একটা ঢিলেঢালা ব্যাপার হয়ে গেছে। হয়তো কোথাও আত্মবিশ্বাস অনেকটা আত্মম্ভরিতাই। তবে রাজনীতিতে জয়পরাজয় থাকবেই। শুধুই সমালোচনা নয়,নিজেদের ইগো ভুলে গিয়ে,লবিবাজি থাকলে তা কঠোরভাবে দমন করে সকলে এক হয়ে হাতে হাত মিলিয়ে আবার একুশের লক্ষ্যে ঝাঁপ দিলে জয় আসতে বাধ্য। আশা করি আত্ম-বিলসেশনের মধ্যে দিয়েই শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে এখন থেকেই ২০২১ এ শেষ হাসি হাসার নতুন প্রস্তুতিই নিতে বদ্ধকর হবেন।

(shreyashree)

(Visited 28 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here