রবীন্দ্রনাথের হাতের তৈরি ছাপাখানা নিজেই এক আস্ত ইতিহাস

মনোজ রায়:

তখন ১৯১৭ সাল। জানুয়ারি মাসের ৮ তারিখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা স্টেটের লিঙ্কন শহরে অলিভার থিয়েটারে জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে একটি বক্তৃতা দেন। কবিগুরুর সেই বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে ওই দিনই লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে তাঁকে একটি উপহার দেওয়া হয়। একটি বই ছাপার যন্ত্র। নাম ‘দ্য লিঙ্কন প্রেস’। উপহারটি মূলত ছিল শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের জন্য। যন্ত্রটির গায়ে ধাতুর পাতে খোদাই করা ছিল ‘প্রেজ়েন্টেড টু দ্য বয়েজ় অব শান্তিনিকেতন’।

১৯১৮ সালে কবিগুরু শান্তিনিকেতনে সেই লিঙ্কন প্রেসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক ছাপাখানার। যার নাম শান্তিনিকেতন প্রেস। শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রেস নিজেই এক আস্ত ইতিহাস। শান্তিনিকেতন প্রেসে মুদ্রিত প্রথম বইটি  রবীন্দ্রনাথের গানের দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের করা স্বরলিপি-সহ সংকলন গীত-পঞ্চাশিকা। তারপর বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই প্রেস। বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর এই প্রেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসে। মুদ্রণযন্ত্রের সঙ্গে এক ধরনের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক ছাপাখানার সেই আদিপর্বেই ঘটে গিয়েছিল।

প্রথাগত ‘ইউনিভার্সিটি প্রেস’-এর ধারণা থেকে বাইরে গিয়ে বইয়ের বিষয় এবং তার মুদ্রণে ক্রমেই একটা নিজস্ব চরিত্র অর্জন করতে চাইছিল শান্তিনিকেতন প্রেস। কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, প্রিন্সটন বা হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস তখন প্রতিষ্ঠিত। তাদের কোনওটিকেই আদর্শ না করে সম্পূর্ণ নিজের মতো চলতে শুরু করেছিল রবীন্দ্রনাথের এই ছাপাখানা। বই তৈরির ক্ষেত্রেও একটা নিজস্ব চরিত্র আনতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

একসময় পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ গোয়েন্দা বহুবার হানা দিয়েছে এই ‘শান্তিনিকেতন প্রেসে’। কবিগুরুর বিশ্ব পরিচিতির ভয়ে সেই সময় ব্রিটিশ সরকার এই প্রেস বন্ধের চিন্তা করারও সাহস করতে পারেনি। অথচ আজ স্বাধীন দেশে বন্ধ হয়ে গেল কবিগুরুর ‘শান্তিনিকেতন প্রেস’। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সচল থাকলেও, গত নয়-দশ মাসে কোনও প্রকাশনা হয়নি ‘শান্তিনিকেতন প্রেস’ থেকে।কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে নির্দেশ এসেছে প্রেসটি পাকাপাকি ভাবে বন্ধ করে দেওয়ার।

বিশ্বভারতী সূত্রে খবর, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক সাতটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল তাদের নিজেদের প্রেস বা ছাপাখানা বন্ধ করতে হবে। তাই শতাব্দী প্রাচীন বিশ্বভারতীর প্রেসও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জানা গিয়েছে, শান্তিনিকেতন প্রেসে ছাপাখানা বিভাগে ম্যানেজার-সহ মোট ৩৯ জন কর্মী ছিলেন। ২০১৮ সালে ছাপাখানার দায়িত্বে থাকা ম্যানেজারকে কলকাতার গ্রন্থন বিভাগে পাঠানো হয়। বাকি কর্মীদেরও একে একে পাঠানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে। ওই বছর শেষের দিকে ছাপার কাজ পুরোপুরি ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

এই শান্তিনিকেতন প্রেসের জন্ম স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে। বহু ঐতিহাসিক বই প্রকাশ হয়েছে এই প্রেস থেকে। ভাবতেই অবাক লাগে, একটা হেরিটেজ প্রেস এভাবে বন্ধ হয়ে যায়! বিশেষজ্ঞদের দাবি, যার ঐতিহাসিক মূল্য এতখানি, তাকে সংরক্ষণ করা উচিত। সামান্য লাভ-ক্ষতির অঙ্কে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মাপা যায় না। প্রবীণ আশ্রমিক সুপ্রিয় ঠাকুর আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথের হাতের তৈরি জিনিস এটি। সরকারের উচিত এই ছাপাখানাকে হেরিটেজ ঘোষণা করা।’’

@মনোজ

(Visited 30 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here