রাম মন্দির নির্মাণ ভারতে বহুত্ববাদী সংস্কৃতির পরিচয়

ড. রাজলক্ষ্মী বসু

অযোধ্যার রাম মন্দির এবং তার ইতিহাস যদি স্বচ্ছতার সাথে পর্যালোচনা করা যায় তবে যুক্তির খাতিরে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের এক গ্লানিময় অধ্যায়। রাম মন্দির পুনঃনির্মাণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা যুক্তির্থে হাজার বছর আগের ইতিহাস কিছুটা তো আলোচনা করতেই হয়। একাদশ শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দির মোঘল সম্রাট বাবরের দ্বারা লন্ডভণ্ড হয়। বাবরের সেনাপতি মীর খাঁ বহুত্ববাদী ভারতীয় সংস্কৃতিকে চুরমার করে মন্দিরের উপর মসজিদ নির্মাণ করেন। সম্ভল, চান্দেরীর মন্দির বা গোয়ালিয়রের নিকটবর্তী জৈন মন্দির এবং বিগ্রহ ধ্বংস— এসবই মধ্যযুগীয় আক্রমণের বিধ্বংসী স্তূপের তলায় না জানান ইতিহাস। রাম মন্দির তো এক প্রতীক মাত্র। স্বাজাত্যবোধ এবং স্থিতিস্থাপক হিন্দুত্ব চর্চার ক্রীড়াঙ্গনকে পুনরায় লুপ্ত গৌরব ফেরানোর প্রচেষ্টা মাত্র।

হুমায়ুন এবং আকবরের রাজত্বকালে যথাক্রমে ১০ এবং ২০ বার এই রাম মন্দিরের উদ্দেশ্যে হিন্দুরা বিজয়াভিযান চালায়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় হনুমানগড়ীর মোহন্ত উদ্ভব দাস রাম জন্মভূমি উদ্ধারের চেষ্টা করেন। অযোধ্যার নবাব ফরমান আলি পরিস্থিতির চাপে পড়ে অনুধাবন করেছিলেন যে, বহুত্ববাদী হিন্দু সংস্কৃতি ছাড়া ইসলাম প্রচারও এদেশে অসম্ভব। তাই সুচারু ভঙ্গিমায় মন্দির নির্মাণ ও পূজা উপাসনার অনুমতি দিয়ে যুদ্ধাবসান ঘটালেও সিপাহী বিদ্রোহের পরাজয় তা পূর্ণাঙ্গতা দেয়নি। ১৫২৭ সাল থেকে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে প্রায় ৭৬ বার হিন্দুরা রাম মন্দির লড়াই চালিয়েছে। এখনকার এই লড়াই ৭৭তম। যা ১৯৯২ সালে বিজেপির নেতৃত্বে শুরু। চতুর্দশ শতাব্দীর কবি রামানন্দ এবং তাঁর ভক্তজন পরবর্তী সময়ে বর্তমানের বাবরি মসজিদ/রাম মন্দির এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলে মনুষ্যত্বের উপাসনা করতেন। গোঁড়া ধর্ম বা উগ্র হিন্দুত্ববাদ এবং রামন্দির তাই কোনও অর্থেই সমার্থক নয়। এ প্রশ্ন সেবক এবং তার অধিকারের।

[আরও পড়ুন: নিঃশর্ত নাগরিকত্ব চাই! দাবি শান্তনুর]

১৮৮৫ সালে নির্মোহী আখড়া অর্থাৎ যারা প্রকৃত মানবপ্রেমী তারা ফৈজাবাদ জেলা আদালতে পুনরায় মন্দির গঠনের জন্য আবেদন করেন। রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় শক্তির পৃথকীকরণ মধ্যযুগীয় বর্বরতা করতে পারেনি। স্থিতিস্থাপক হিন্দু সাম্রাজ্য চিরকালই শক্তির সাম্য রক্ষার্থে বদ্ধপরিকর। মন্দির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শুধু ধর্মনিরপেক্ষতাই নয় প্রকৃত মনুষ্যধর্ম অর্থাৎ বহুত্ববাদকেই বারে বারে প্রশ্রয় দেওয়া গেছে। তাই এই ২১ শতকে দাঁড়িয়েও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে গত ২৫ বছরের মধ্যে ডজন খানেকেরও বেশি মন্দির প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বোস্টনের একটি মুদির দোকান সংলগ্ন অঞ্চলে চার্চের মধ্যেই প্রথম মন্দিরের পাথরটি গাঁথা হয়। সর্বমতের এবং সত্যলালনের লীলাক্ষেত্র এই উপাসনা গৃহগুলি। এবং শাশ্বত ঐতিহ্যকে বহন করায় সারা বিশ্বই প্রণিধান করেছে যে, যে কোনও মন্দির নির্মাণই বহু বিশ্বাসের মিলনস্থল। মন্দির পুনঃনির্মাণ যে অন্য ধর্মকেও সাদরে গ্রহণ করতে সক্ষম তার প্রমাণ তো গত বছর করাচিতেই পেয়েছি। পুনঃনির্মিত একটি মন্দিরের উপর যখন একটি ছোট বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়, সেখানেও হিন্দু মন্দিরে শিক্ষিকা হন একজন মুসলমান। ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা সবের ঊর্ধ্বে মন্দির বিশ্বের সর্বত্রই সকলের মিলনক্ষেত্র এবং আনন্দস্থল।

রাম মন্দির পুনঃনির্মাণ কেন বহুত্ববাদের প্রতীক কারণ, হিন্দুত্ববাদ এবং বহুত্ববাদ বস্তুত সমার্থক। হিন্দু ধর্ম কাকে বলে? বেদ, স্মৃতি, পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্রানুযায়ী ধর্মকে ওই চর্তুঃবিদ শাস্ত্রে সামঞ্জস্য রূপে জগদিশ্বরের যে রূপ অভিপ্রায় ব্যক্ত হয় তাকে হিন্দু ধর্ম বলা যায়। হিন্দুধর্ম বহুত্ববাদে বিশ্বাসী বলেই পৃথিবীর সর্বত্র নানা রূপে বিরাজমান। মহাভারত, রামায়ণ, মৎস্যপুরাণ, রাজতরঙ্গিনী ইত্যাদি গ্রন্থ সাক্ষ্য প্রমাণ করে যে, হিন্দু ধর্মের ক্রীড়াখেলা বস্তুত নানা দর্শনেরই সমাবেশ, অর্থাৎ বহুত্ববাদ। মৎস্যপুরাণে বলা আছে সূর্য্যবংশীয় ইক্ষকুরাজার পুত্ররা উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুতে বহুত্ববাদী দর্শন প্রচার করেন। রামায়ণে আদি কাণ্ড, ৬২ সর্গে বলা আছে, পরশুরামের সুমেরু তপস্যার কথা। ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব এশিয়া মহাদেশের প্রায় সর্বত্রই জয়লাভ করেছিলেন। পুরী সন্ন্যাসী ব্রহ্মদেশ থেকে রাশিয়ার মস্কো পর্যন্ত স্থিতিস্থাপক বহুমুখী হিন্দু ধর্ম প্রচার করেন।

তুরস্কের বসোরা নগরে কল্যাণ রাও ও গোবিন্দ রাও নামক দেবমূর্তি এখনও প্রতিষ্ঠিত। তাতার দেশের বাখ্ নগরে পারস্যের হিঙ্গুলাজে, রাশিয়ার অস্ট্রাকানে শ্রীরামচন্দ্রের কীর্তি বর্ণিত আছে। রোমের পণ্ডিত স্ট্রাবো বর্ণনা দেন, ২০ খ্রি.পূ. অগাস্টাস সিজারের নিকট খড়্গশর্মা রাম রাজত্বের বর্ণনা দেন। আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণাংশে দুই প্রদেশ পুরুভিয়া এবং বলিভিয়া যারা হিন্দুত্ব এবং বহুত্ববাদের উপাসক। সেখানে আজও রাম-সীতার উপাসনা হয়। হিন্দু মন্দির গঠন মানেই বিশ্বের সর্ব প্রান্তরে যেমন বহুত্ববাদের পুজো করা হয়েছে অর্থাৎ জ্ঞান, বুদ্ধি, আধ্যাত্মিকতা, দর্শন শাস্ত্র সকলেরই সঙ্গম ক্ষেত্র। সুদ্রবৎ বিস্তৃত হিন্দু ধর্ম তাই রাম মন্দির পুনঃনির্মাণের মধ্য দিয়ে উচ্চ স্বরে পরিশুদ্ধরূপী জ্ঞানচক্ষে অবলোকিত সঞ্চায়িত ভারতীয় সংস্কৃতিরই পুনরুদ্ধারের উপাদান মাত্র। শাস্ত্রে বলা আছে, ‘ব্যাপকত্বাৎ পরাপি স্যাৎ ব্যাপ্যত্বাদ পরাপি চ।।’ অর্থাৎ যে জাতি বহুব্যাপী তারাই পরা জাতি। এই দার্শনিক সূত্র ধরেই বিভিন্ন গুণসম্পন্ন হিন্দুধর্মীয় ভাবাবেগ তার বহুত্ববাদের মধ্য দিয়েই বারে বারে মানব জয়গান গেয়েছেন। রাম মন্দির পুনঃনির্মাণের জ্ঞাননেত্র যতক্ষণ না উন্মোচিত হচ্ছে, ততক্ষণ ধর্মনিরপেক্ষতা নামক নিশ্চল শব্দের অভ্যাসে ‘আত্মবৎ সেবা’ নামক বহুত্ববাদের প্রথম দর্শনটি ভক্তি প্রদর্শন করার ইচ্ছায় বলবতী হচ্ছে না। রাম মন্দির নির্মাণ প্রকৃতপক্ষে আত্মোপলব্ধির চরাচর ক্ষেত্র ছিল।

‘বর্হিব্যাপার সংরম্ভো

হৃদি সংকল্প— বর্জ্জিত।

কর্ত্তা বহিরকর্ত্তান্ডু

রেবং বিহর রাঘব।।’

অর্থাৎ বশিষ্ঠদেব শ্রী রামচন্দ্রকে বলেছিলেন, হে রাম! তুমি বাইরে সকল কর্ম কর, মনে সংকল্প দৃঢ় রাখ, বাইরে নিজেকে কর্তা বলে জানো, অন্তরে নিজেকে অকর্তা বলে মানো। এই রূপ সংসার যাত্রা নির্বাহ করার উদ্দেশ্যেই রাম মন্দির নির্মিত ছিল। জ্ঞান, প্রশংসা শ্রবণে ধর্মের যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, সেই ব্রহ্মজ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যেই রাম মন্দির এবং ভক্ত সমাহার হতো। তাই রাম মন্দির পুনঃনির্মাণ অতি স্থিতিস্থাপক বহুত্ববাদী দর্শনকেই পুনঃনির্মাণের প্রয়াস মাত্র। নচেৎ সেকুলার শব্দের মোহজালে এদেশের সংস্কৃতি ও ইজরায়েলিরই মতো হবে। ধর্মীয় নিরপেক্ষতার যাঁতাকলে ইজরাইলের মতো যেন এদেশে ধর্ম এবং সংস্কৃতি গরিষ্ঠ হিন্দু এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতি গোঁড়া ইসলামের শেকলে বাঁধা না পড়ে।

(shreyashree)

(Visited 35 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here