কমিউনিস্ট পার্টি আর জেহাদি সাম্প্রদায়িকতা শতবর্ষের যুগলবন্দি

জিষ্ণু্ বসু

ধর্মের আফিমের বিষয়ে সমাজকে সচেতন করাটা মাকর্সবাদী আদর্শের অন্যতম লক্ষ্য। হিন্দুধর্মের সঙ্গে যোগ আছে বলে কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীরা প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করতে আপত্তি করেন। গণনাট্য সংঘের গানে হিন্দু দেবদেবী নামে আপত্তি থাকে। শোনা যায়, ঋত্বিক ঘটকও বলেছিলেন যে জাতির হাজার হাজার বছরের পুরাতন ইতিহাস আছে, তার স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে ধর্মীয় ছোঁয়া আছে বলে বাদ দেওয়াটা মোটেই সংস্কৃতি মনস্কতা নয়। (মেঘে ঢাকা তারা, ২০১৩) যাই হোক, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা তার সহযোগী শিক্ষা বা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের সংগঠনগুলি এই অস্পৃশ্যতা থেকে কখনও মুক্ত হতে পারেনি। তাঁরা সরস্বতী বন্দনার বিরোধিতা করেছেন, ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলার প্রতিবাদ করেছেন, দুর্গাপুজোয় প্রকাশিত দলীয় মুখপত্রের নাম পূজাসংখ্যার বদলে ‘উৎসব সংখ্যা’ বা ‘শারদ সংখ্যা’ করেছেন তাই ধরে নেওয়া যায় যে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা তার থেকে সৃষ্ট সবকটি ধারা ধর্মীয় উগ্রপন্থা থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু মজার বিষয় হল, ভারতবর্ষে মাকর্সবাদের জন্মলগ্ন থেকে জেহাদি মৌলবাদের সঙ্গে সম্পর্ক। ১৯২০ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত নিবিড় সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ইস্তানবুলে অটোমান সাম্রাজ্যের বিদায়বেলা। তখনও সুলতান চতুর্থ মহম্মদ বাহিদেদ্দিন শেষ চেষ্টা করে যাচেছন। খলিফা তখনও সারা পৃথিবীর ইসলামি দুনিয়ার প্রধান। ওদিকে মুস্তাফা কামালের নেতৃত্বে তুরস্কেও স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হল ১৯১৯ সালে। তুরস্কের মানুষ আরব সাম্রাজ্যবাদের থেকে মুক্তি চায়। তখন শেষ চেষ্টা হিসাবে ডাক দেওয়া হল জেহাদের। সারা পৃথিবীর মতো ভারতবর্ষ থেকেও জেহাদিরা যেতে শুরু করল ধর্মযুদ্ধে।

মহম্মদ সফিকি সিদ্দিকি আর মহম্মদ আলি জেহাদের ডাকে সাড়া দিযে তুরস্কের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। তাঁরা আফগানিস্তান হয়ে তুরস্কে যেতে চেয়েছিলেন। তাই উত্তর-পূর্ব সীমান্ত প্রদেশের মধ্যে দিয়ে এগোচিছলেন। সেখানেই সম্ভত তাঁদের পরিচয় সুলতান আহমেদ খান তারিন নামে আর এক মুহাজিবের সঙ্গে। কিন্তু ততদিনে রুশ বিপ্লব হয়ে গেছে। তাই তাঁরা পাকে চক্রে গিয়ে উঠলেন সোভিয়েত মধ্যপ্রাচ্যে।

এদিকে ১৯২০ সালে কমিউনিস্ট থার্ড ইন্টারন্যাশনাল, সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে ঠিক হয়েছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি অতি জরুরি। তাই মানবেন্দ্রনাথ রায়েরা সেপ্টেম্বরেই ঠিক করলেন পার্টি গঠন করা হবে। সেইমতো ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর তাসখন্দের বাকুতে জন্ম নিল কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন ১০ জন। মানবেন্দ্রনাথ রায, তাঁর স্ত্রী এভেলিন রায ট্রেন্ট, অবনী মুখোপাধ্যায়, অবনীবাবুর স্ত্রী রোজা ফিটিঙ্গফ, মহম্মদ সফিক সিদ্দিকি, মহম্মদ আলি, হজরত মোহানি, ভূপাল থেকে আসা রফিক আহমেদ, সুলতান আহমেদ খান তারিন আর এমপিটি আচার্য। মানে রায় পরিবার আর মুখোপাধ্যায় পরিবার ছাড়া কমিটির বেশিরভাগ সদস্যই মুহাজির ছিলেন। ভারত থেকে জেহাদের ডাকে আসা মহম্মদ সফিক সিদ্দিকি হলেন কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার প্রথম সম্পাদক।

তাসখন্দে পার্টি প্রতিষ্ঠা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ১৯২০ সালের অক্টোবর থেকে ১৯২১ সালের মে মাস পর্যন্ত এই শিবির চলেছিল। রফিক আহমেদ এবং সওকত ওসমানির মতো অনেকে এখানে প্রশিক্ষণ নেন। কাকাবাবু মুজফফর আহমেদের মতে ২১ জনের মতো যুবক মুহাজির এখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। মহম্মদ সফিক সিদ্দিকি থেকে সুলতান আহমেদ খান তারিন পর্যন্ত কারোরই মার্কসের দর্শন বা সাহিত্যের উপর বিশেষ অধ্যায়ন ছিল না। সেইসব মুহাজিরের মধ্যে কেউই পরে কোনও শ্রেণি সংগ্রামের কাজে যুক্ত হননি।

১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া। ১৯৩৭ সালের ২০ মার্চ মুসলিম লিগের সভায় সিদ্ধান্ত হয়- কংগ্রেসের ‘বন্দেমাতরম’ তাদের মানা সম্ভ নয়। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য আলাদা হোমল্যান্ড পাকিস্তানের দাবি জোরালো হল। পার্সি লিপিতে উর্দুকেই ভারতীয় মুসলমানের ভাষা হিসাবে মানতে হবে। অধ্যাপক সুনন্দ সান্যাল এবং সৌম্য বসু তাঁদের ‘দ্য সিকল অ্যান্ড দ্য ক্রেসেন্ট: কমিউনিস্ট মুসলিম লিগ অ্যান্ড ইন্ডিয়াস পার্টিশান’ গ্রন্থে এর বিস্তৃত বর্ণনা করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টি ভারতবর্ষকে একটি জাতি মনে করত না। পঞ্জাব, বাংলা, দ্রাবিড়দের যেমন আলাদা আলাদা রাষ্ট্র হওয়া উচিত তেমনই মুসলিম লিগের দাবি মতো পাকিস্তানও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হওয়া উচিত। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতো মার্কসবাদী তাত্ত্বিক যেমন ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ গ্রন্থে পাকিস্তানের সমর্থন করেছেন, তেমন কলকাতা ময়দানে মুসলিম লিগ আর কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া একসঙ্গে পাকিস্তানের দাবিতে প্রকাশ্য জনসভা করেছে। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট শহিদ মিনারে মুসলিম লিগ এক জনসভা ডাকে। সেই সভাতে আমন্ত্রিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড জ্যোতি বসু।

এই সভা থেকে হোসেন মহম্মদ সোহরাওয়ার্দি পাকিস্তানের জন্য ডাইরেক্ট অ্যাকশনের ডাক দেন। শুরু হয় ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’। হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণ যায়। ওই বছরই ১০ অক্টোবর কোজাগরি লক্ষ্মীপূজার দিন পূর্ববঙ্গের নোয়াখালিতে ভয়ানক দাঙ্গা শুরু হয়। যে গোলাম সারোযার হুসেইনি কৃষক প্রজা পার্টির হয়ে নোয়াখালিতে ‘লাঙল যার জমি তার’ শ্লোগান শুরু করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে কৃষক প্রজা পার্টির হয়ে নির্বাচনেও যেতেন। সেই বামপন্থী নেতা গোলাম সারোয়ার নোয়াখালি দাঙ্গাতে সবচেয়ে সাম্প্রদায়িক ভূমিকা নেন। প্রায় দু’হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে দাঙ্গা ছড়ানো হয়।

কিন্তু দেশভাগের পরে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট পার্টি বিলুপ্ত হতে থাকে। ১৯৮৪ সালের ৬ মার্চ কলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টি অফ পাকিস্তানের সূচনা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাজ্জাদ জাহিরি সিপিপি-এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আজ অবশ্য পাকিস্তানের কোনও স্থানে কমিউনিস্ট পার্টি অফ পাকিস্তানের সাইন বোর্ডও পাওয়া যাবে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ভারত সরকার ভূমি সংস্কার করে কিন্তু পাকিস্তান জমিদার ব্যবস্থা উৎখাতের কোনও প্রচেষ্টাই করেনি। যে পাকিস্তানের জন্য কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিযা মুসলিম লিগকে সমর্থন করল, স্বাধীন পাকিস্তান শ্রমিক বা কৃষকের অধিকারের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেছে। পূর্ব পাকিস্তানে ইলা মিত্রের মতো নেতৃত্ব কৃষকদের দাবির জন্য আন্দোলন করেছিলেন। পাকিস্তান সরকার একজন মহিলা নেত্রীর উপর যে পাশবিক আচরণ করেছিল তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিরল। পাকিস্তানের ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকার ১৯৫৪ সালে অসুস্থ ইলা মিত্রকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসার জন্য কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়। ইলা মিত্র আর কখনও পাকিস্তানে ফেরেননি।

কাশ্মীরের জেহাদি আন্দোলনে একেবারে প্রথম থেকেই কমিউনিস্টদের সমর্থন ছিল। কেবলমাত্র দিল্লির বা কলকাতার অতিবিপ্লবী ছাত্র সংগঠন কাশ্মীরের মুজাহিদিনদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে ‘ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে, ইনসাল্লাহ, ইনসাল্লাহ, ইনসাল্লাহ’ বলেছে ভাবলে ভুল হবে। বরং কমিউনিস্ট পার্টির সবকটি শাখা-প্রশাখা ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সময় থেকেই এই বিচিছন্নতাবাদকে মদত দিয়েছে। ‘আফজল হাম শর্মিন্দা হ্যায়, তেরে কাতিল জিন্দা হ্যায়’ এই ভাবনা দশকের পর দশক ধরে পার্টি ক্লাসে তৈরি হওয়া ভারতের সার্বভৌমত্বের বিরোধী ভাবনার ফসল।

স্বাধীন ভারতের গোয়েন্দা দফতরের প্রথম ডাইরেক্টর ছিলেন টিজি সঙ্গীভি পিল্লাই। তিনি ১৯৪৮ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নেহরুজিকে কাশ্মীরে মুজাহিদিনদের সহাযতায় কমিউনিস্টদের অভ্যুত্থানের চক্রান্তের কথা জানান (ইকনমিক্স টাইমস, ২৭ আগস্ট ২০১৬) যদিও এর ভিত্তিভূমি প্রস্তুত হয়েছিল ১৯৪২ সালেই। তখন কমিউনিস্ট পার্টি ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের বিরোধিতা করছে। লাহোর থেকে কমিউনিস্ট নেতা ফজল ইলাহি কুরবান একটি হাউস বোটে পার্টির প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীনগরে। স্বাধীনতার পরে কাশ্মীরের ভারতভুক্তির সময় সম্পূর্ণ ভারত-বিরোধী কাজ করে জিএম সাদিক, শের জং বা বকশি গুলাম মহম্মদের মতো কমিউনিস্ট নেতারা।

২০১০ সালে কলকাতার সেন্ট্রাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরির অধিকর্তা সিএন ভট্টাচার‌্য এক সাংবাদিক সম্মেলনে ভয়ানক তথ্য দেন (টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ৮ ডিসেম্বর ২০১০) ভারতবর্ষে প্রথম রেডিও কন্ট্রোল ও ভয়েস অ্যাক্টিভেটেড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস এনেছিল মাওবাদীরা। এই ভয়ানক বিস্ফোরকের প্রযুক্তি তারা কাশ্মীরের মুজাহিদিনদের মাধ্যমে আফগানিস্তানের তালিবানদের কাছ থেকে এনেছিল। এই বৈঠকে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাক্স ফোর্স ‘ভেরি হাই ফিকোন্সি ও আলট্রা হাই ফ্রিকোন্সির’ রেডিও সম্প্রচার যন্ত্র বাজেয়াপ্ত হয়েছে বলে ঘোষণা করে। সেই শুরু, যার চরমতম পরিণাম বর্ধমানের খাগড়গড়ে ২০১৪ সালে ‘ইম্প্রোভাইস-এক্সপ্লোসিফ ডিভাইস’ বানানোর কারখানাতে দেখা গেছে। কমিউনিস্ট এবং জেহাদি যুগলবন্দির এটি ভয়ানকতম পরিণাম।

জেহাদের সমর্থন, মুজাহিদিনদের প্রশিক্ষণ আর মুসলমান সমাজের উন্নতি এক নয়। মুসলমান সমাজের প্রকৃত উন্নতির জন্য পার্টি কখনও যত্নবান হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে তিনদশকেরও বেশি সময় ধরে বামফন্ট্রের শাসন ছিল। ২০০৬ সালের ৩০ নভেম্বর যখন সাচার কমিটি রিপোর্ট পেশ হল তখন দেখা গেল যে, দেশের মধ্যে যে কটি রাজ্যে মুসলমান সমাজের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সবচেয়ে খারাপ তার মধ্যে অন্যতম পশ্চিমবঙ্গ। কেরল বা পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বেও কখনও মুসলমান সমাজের বা তথাকথিত পিছিয়ে পড়া হিন্দু সমাজের মানুষও উঠে আসেনি। পার্টি গত একশো বছরে বর্ণহিন্দুদের নেতৃত্বেই থেকে গেছে।

মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব

লেখক- সাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স- এ কর্মরত 

@এস. এ. হামিদ

(Visited 535 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here