ছোট-মাঝারি নেতাদের তোলাবাজি, বৈভবেই ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন ঘাসফুল

শংকর দত্ত
মঙ্গলবার বাইপাসের তৃণমূল ভবনে মিটিং হল। জেলার ব্লক ও টাউন সভাপতিদের নিয়ে। ছিলেন জেলা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরের বহু নেতাও। হল বিজয়ার শুভেছা বিনিময়। নতুন করে দিদিকে বলো কর্মসূচির রূপরেখা,সম্প্রীতি যাত্রার পাঠ এবং জনসংযোগ ফর্মুলার নিয়মকানুন বা নির্দেশিকা জারি। কিন্তু তৃণমূল সুপ্রিমোর এতো চেষ্টা সত্ত্বেও কোথায় যেন ফাটল ধরে গেছে। আসলে তিনি এখনো রাজ্যের উন্নয়ন নিয়ে যে ভেবে চলেছেন, নিজের দলকে চাঙ্গা করতে যে কর্মসূচি ক্রমশই নিয়ে চলেছেন,সেখানে চনা ফেলে দিচ্ছেন অনেক আঞ্চলিক নেতা নেত্রীই। তারাই নিজেদের সুখ,সাম্মৃদ্ধি ও বৈভবের জন্য কথাও যেন তাল কেটে দিছেন বারবার। তাঁদেরকে চিহ্নিত করাটাই আসলে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। আমি প্রশান্ত কিশোর নয়। নয় তৃণমূলের কাছের লোকও। কিন্তু রাজ্য ঘুরে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে তাতে ধন্দ তৈরি হয় প্রতি মুহূর্তে। আদৌ দলটা থাকবে তো? ২০২১ এ সত্যিই আবার তৃণমূল ক্ষমতায় আসবে তো !!

তাই বলি,শুধু বিজয়ার শুভেছা বিনিময়ে কিছুই হবে না। হবে না লোক দেখানো সম্প্রীতি যাত্রা করেও কোনও কিছু। দিদিকে বলো কর্মসূচি যেটুক হয়েছে সেটাও ওপরতলাকে খুশি করতে। মানে কে কতো অভিনব কায়দায় প্রচার করে মিডিয়াকে খাইয়ে দিদির নজরে আসতে পারে হয়েছে তার প্রতিযোগিতাও।
তবুও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এগুলোই করে থাকেন। তিনি তার সৈনিকদের ওপর নির্ভর করেন,ভরসা করেন। আর তাই আগের কায়দাতেই এখনও জনসংযোগ করতে চেষ্টা করেন। প্রশান্ত কিশোর এসে যে সব নিদান বা বিধান দিচ্ছেন,এই গুলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সব জানা। তিনি এতদিন এভাবেই লড়াই,সংগ্রাম ও জনসংযোগ দিয়েই মানুষের মনে জায়গা করেছিলেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, তৃণমূল দল টিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন বেশিরভাগটাই নিজের আটপৌরে জীবনযাপন, আমজনতার সঙ্গে মিশে থাকার যোগ্যতা আর তাঁদের ভাষায় তাঁদের মতো করে কথা বলতে পারার কারণেই এক মাত্র।
কিন্তু মুশকিল হলো সেই মমতা দিদিকেই এখন সব সময় সিঁদুরে মেঘ দেখতে হচ্ছে। গদি হারানোর ভয় পেতে হচ্ছে। প্রশান্ত কিশোর ভাড়া করে নিজের চেনা ছক নুতন ডাইসে ফেলে শিখতে হচ্ছে। অথচ এমনটা কি সত্যিই হওয়ার ছিল?
মঙ্গলবার তৃণমূল ভবনে পশ্চিমবঙ্গের সব জেলার প্রায় ৭০০ জন দলের ব্লক ও টাউন সভাপতিদের তিনি ডেকেছিলেন। ছিলেন বহু সাংসদ, নেতা পার্টির জেলা সভাপতিরাও। তিনি সরকারে আসবার আগে থেকেই এমন মিটিং করতেন দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করতে। কিন্তু তফাৎটা হলো এখন তা করতে হচ্ছে ঘটা করে। কারণটা ঠিক কি?
কারণ একটাই এই দলে মীরজাফর ভোরে গেছে। শুধু মাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামক স্ট্যাম্পটাকে ব্যবহার করে,মাথার ওপর তাঁর ছবি টাঙিয়ে ( অনেক জায়গায় অবশ্য এখন তাঁর পাশে তাঁর ভাইপোর ছবিও থাকে) এই মুহূর্তে রাজ্যে বহু আঞ্চলিক নেতা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। তাঁরা কারা কেউ ব্লক সভাপতি,কেউ টাউন সভাপতি,কেউ জেলা বা শহরের যুব সভাপতি, আবার কেউ বা জেলা পরিষদ,ব্লক পৌরসভা এমনকি সাধারণ গ্রামপঞ্চায়েত এর সামান্য জনপ্রতিনিধি। তলাবাজির কথা মুখ ফসকে বলে ফেললেও আমরা দেখেছি গত কয়েক মাসে কি ঘটনা ঘটে গেছে এই বিষয়ে। কিন্তু এখনও বাঘের ঘরে ঘগের বাসা হয়ে আছে এটাই আগে বুঝতে হবে তৃনমূল সুপ্রিমকে। মনে রাখতে হবে।

মঙ্গলবারে তৃণমূল ভবনের বৈঠকে দলনেত্রী ও অন্য বিগশর্ট নেতার কথা মনে দিয়ে শোনার ভান করে বাধ্য ছাত্র বা ছাত্রীর মতো বসেছিলন যে সব আঞ্চলিক নেতা নেত্রীরা তারাই অনেকেই কিন্তু দলটাকে তিলে তিলে শেষ করছেন। বাপের জমে কেউ শুনেছেন পঞ্চায়েত প্রধান বলেরো স্কোরফিও নিয়ে ঘরেন? একজন ব্লক সভাপতির পিছনে ৪ জন সরকারি সিকুরিটি,ব্যক্তিগত বাউন্সার কিংবা ক্রিমিনালদের মেশিন সঙ্গে নিয়ে ঘোরার কীর্তি দেখেছেন কেউ কখনো? সমান্য টাউন সভাপতির সামনে পিছনে ৬ কনভয়। অনেকেই এখন নিজ এলাকায় এক একজন অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের কপি হয়ে উঠছেন। কিন্তু তার ভুলে যান অভিষেক একজন গুরুত্বপূর্ণ সাংসদ, একটা দলের জাতীয় স্তরের নেতা, তিনি মুখমন্ত্রীর ভাইপো এবং একজন ভিভিআইপি পলিটিশিয়ান। কিন্তু চোখ কান খোলার রাখলেই এখন জেলায় জেলায় তাঁকে নকল করে এলাকার বড় দাদা হয়ে উঠেছেন অনেকেই। আর এর পিছনেও আছে দলের এক শ্রেণীর প্রথম সারির নেতা,মন্ত্রী এবং সংসদ। তাঁরা নিজের সাংগঠনিক ক্ষমতা ধরে রাখতে,ভোট রাজনীতি করতে অথবা কাঠমানির ভাগ নিতে দেদার মদত দিয়ে যাচ্ছে এইসব নেতাদের। এমনকি দেখা গেছে একজন সাংসদের আপ্ত-সহায়ক তিনিই চালাচ্ছেন রাজ্যের বাহ ব্লক ,টাউন সভাপতি এবং জেলার যুব সভাপতিদেরর ও। তাঁর আঙ্গুলি হেলান অথবা ভালোবাসায় বহু নেতার পদ যায়,ও নেতা পদ পেয়ে যান। অভিযোগ,তার মাসিক রোজগার একজন সাংসদ মা মন্ত্রীকেও হার মানায়।

তৃণমূল দলটা এখন এভাবেই চলছে। ওপর থেকে চকচক করছে সব কিছু আর ভিতরটা ফফরা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। আর একটু করকে দাও,বা পদ থেকে সরিয়ে দাও সঙ্গে সঙ্গেই বিজেপি তে তলে তলে কেটে পড়বার তাল। এই সব বেঈমান দের, এই সব তলাবাজ, কাটমানি খোর দের আগে তাড়াতে হবে, গোপনে দলীয় তদন্ত করে দেখতে হবে একজন ভিখিরি বাড়ির ছেলে তিন চার বছরের মধ্যেই কিভাবে বিলাস বহুল বাড়ি করছে,গাড়ি চড়ছে, কিভাবে একদিক হোটেলের বা বাগান বাড়ির মালিক হয়ে যাচ্ছে। মুশকিল হলো মমতা বন্দোপাধ্যায় কোনদিনই যা ভাবেননি। আজ তাই ঘটছে। আর যা ঘটেছে সেটা সবটাই হয়তো তার আড়ালে তাঁকে অন্ধকারে রেখেই। এখনও তাঁর মন্ত্রিসভার সবাই খারাপ নই। এখনও তৃণমূলের বহু সাংসদ নেতা চান প্রকৃত অর্থেই দলটা থাকুক মানুষের জন্য। সরকার টা হোক আমি জনতার সরকার। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু বড় নেতা,মন্ত্রী বা সংসদ এবিং তাঁদের আপ্ত-সহায়করা দলটাকে তুলে দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।

মূলত এদের মদত বা আশীর্বাদের কারণেই জেলা, ব্লক ও ছোট ছোট শহরের মাথার ও যুবর বহু সভাপতি আজ এক লাফে লাট সাহেবের বাচ্ছা হয়ে গেছেন। কারখানায় কাজ করে বা এলাকায় ভাতের হোটেল করে যার মাসে পাঁচ হাজার রোজগার করবারও ক্ষমতা নেই,তাঁদের অনেকেরই এখন এখন দিনে পঞ্চাশ হাজারের বেশি কামাই! কথা থেকেই আসছে তাদের এত বৈভব? এদের থেকে ক্রমশই দূরে দলের বহু আন্তরিক কর্মী, মমতার দুর্দিনের সহযাত্রী, বহু সাধারণ মানুষ। এদের অনেকেই এখন যে জীবন যাপনে অভ্যস্থ তাঁরা গ্রামে গিয়ে এসি হীন বিদ্যুৎ হীন বাড়িতে গিয়ে রাত কাটাবেন? কল্পনা করা যায়!! তাই দিদিকে বলবো, যাদের ওপর এতো দায় দায়িত্ব দিতে চলেছেন,আপনার পিকে কে বলুন তিনি যদি পারেন একটু গোপন তদন্ত করে একটা আসলি রিপোর্ট কার্ড বের করুন। প্রকৃত অর্থে এরা সবাই আপনার কর্মসূচি পালনে দক্ষ তো? এরা সকলেই আপনার স্বপ্নের জনসংযোগ যাত্রার যোগ্য তো? কারণ এদের অনেকেই তো এখন স্নিকার বাবু। ঠান্ডা ঘর থেকে ঠান্ডা গাড়িতে ওঠেন ডান্ডাওয়ালা সঙ্গে নিয়ে,আবার ঠান্ডা পার্টি অফিসে বসে ঠাণ্ডা মাথায় শুধুই তলাবাজি আর কাটমানি খান। এদের দিকে একটু খেয়াল রাখুন। আর রাজ্যের সম্প্রীতি এখনও অটুটই আছে। তাই আলাদা সম্প্রীতি যাত্রার মানে কিন্তু সম্প্রীতি নেই এটাই বুঝবে সাধারণ মানুষ।

(shreyashree)

(Visited 62 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here