সেদিন ট্রাম দূর্ঘটনা, নাকি দৈন্যদশায় ও বিরহ দুঃখে জর্জরিত হয়ে আত্মহত্যা, তা আজও রহস্য

মনোজ রায়

“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর

হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, এতদিন কোথায় ছিলেন?

পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।”

১৯৪২ সালে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা-ভবন হতে এক পয়সায় একটি সিরিজের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয় ষোল পৃষ্ঠার ‘বনলতা সেন’। ১৮ লাইনের এই অনবদ্য সৃষ্টি বর্তমানে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতার একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সত্যজিৎ রায় এই ‘বনলতা সেন’ এর প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছিলেন।

আজ জীবনানন্দ দাশের প্রয়াণ দিবস। ১৮৯৯ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি  অবিভক্ত বাংলার বরিশালে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। তার বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন “ব্র‏হ্মবাদী” পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। আর মা কুসুম কুমারী ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি। ছোটবেলা থেকেই লাজুক ও মুখচোরা স্বভাবের ছিলেন জীবনানন্দ দাশ। তার ডাক নাম ছিলো মিলু। রোজ ভোরে বাবার কণ্ঠে উপনিষদের শ্লোকের আবৃত্তি ও মায়ের কাছ থেকে ধর্মীয় গান শুনতেন মিলু। মায়ের কন্ঠে কবিতার আবৃত্তি শুনতে শুনতে শিশু মিলুর মধ্যেও ছন্দের প্রতি ভালোবাসা জন্মে যায়।

বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে মেট্রিকুলেশন আর ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশোনা শেষ করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন তরুণ জীবনানন্দ। বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রযুগ চলছে তখন। ১৯১৯ সালে ইংরেজীতে অনার্স নিয়ে পাশ করেন। ইংরেজী সাহিত্যের ছেলে শুরু করলেন বাংলা কবিতা লেখা।

১৯২৯ সাল। মার্কিন মুল্লুকের শেয়ার বাজারে ধস নামে। সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে  তার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। পথে পথে বেকার আর কর্মহীনের হতাশার করুণ সুর ছড়িয়ে পড়েছিল কলকাতার আকাশে বাতাসে। তরুণ জীবনাননন্দের কবিতার ছন্দে ছন্দে তখন কেবলই হতাশার সুর বেজেছে। হাজার হাজার মানুষের বেদনার ছন্দগুলো বাধা পড়তে থাকে তার ‘ধূসর পান্ডুলিপি’র পাতায় পাতায়। এখন অবধি বাংলা সাহিত্যের অনন্য এক মাইলফলক হয়ে আছে এই ধূসর পাণ্ডুলিপি।

তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলি হল ধূসর পাণ্ডুলিপি(১৯৩৬), বনলতা সেন(১৯৪২), মহাপৃথিবী(১৯৪৪) সাতটি তারার তিমির(১৯৪৮), রূপসী বাংলা(১৯৫৭), বেলা অবেলা কাল বেলা(১৯৬১)। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে মাল্যবনে(১৯৭৩), সুতীর্থ(১৯৭৭), জলপাই হাটি(১৯৮৫), জীবন প্রণালী(অপ্রকাশিত), রাসমতির উপাখ্যান(অপ্রকাশিত) ইত্যাদি।

তাঁর উচ্চারিত শব্দ চিত্র বহু ক্ষেত্রেই আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তরুণ জীবনানন্দ তার কাকা অতুলচন্দ্র দাসের মেয়ে শোভনা দাসের প্রেমে পড়েছিলেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত কেবল তাকেই ভালোবেসে গিয়েছেন। কিন্তু সমাজে লোকলজ্জার ভয়ে মুখ ফুটে কোনোদিন কিছু বলে উঠতে পারেন নি। তবে তার ডায়েরির পাতায় পাতায় বন্দী করে রেখে গেছেন সেই দুঃখগুলোর কথা।

শোভনা ছিলেন তরুণ জীবনানন্দের মুগ্ধ পাঠক আর শ্রোতা। অখ্যাত এক তরুণ থেকে বাংলা সাহিত্যের নামকরা কবি হয়ে উঠার দিনগুলোতে শোভনাই ছিলেন তার অনুপ্রেরণা। তার ডায়েরিগুলো বিশ্লেষণ করে শচী নামে এক মেয়ের কথা জানা যায়। গবেষক ভূমেন্দ্র গুহের মতে, শচীই ছিলেন শোভনা। কোনও কোনও জীবনানন্দ গবেষকের মতে, এই শোভনাই ছিলেন তার মানসপ্রতিমা বনলতা সেন!

১৯৩০ সালে লাবণ্যপ্রভার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কবি। তার বিয়েতে প্রেমিকা শোভনাও এসেছিলেন। হাসিমুখে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিয়ে বাড়ি জুড়ে। এমন কষ্টের কথাগুলো হয়তো মুখ ফুটে কাউকে বলতেও পারেননি কবি। শুধু লিখে গিয়েছেন। এছাড়াও লাবণ্যপ্রভা ধীরে ধীরে ব্যস্ত হয়ে উঠেন সিনেমার কাজে। বলা চলে সিনেমার কাজে ব্যস্ত লাবণ্য একরকম বিচ্ছেদের রেখা টেনে দিয়ে কবিকে আরও বিরহের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিলেন।

জীবনের শেষ কয়েক বছর জীবনানন্দ চরম অর্থকষ্টেই কাটিয়েছিলেন। একটার পর একটা চাকরি হারিয়েছেন। কলকাতার ১৮৩ নম্বর ল্যান্সডাউন স্ট্রিটের একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। বাড়ি ভাড়া দেওয়ার মতো পয়সা পকেটে ছিলো না তার। বাড়ি বাড়ি ঘুরে টিউশনি করেছেন, আশপাশের মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার করেছেন, এমনকি বীমা কোম্পানির দালালি পর্যন্তও করতে হয়েছে তাকে।

আগাগোড়া তাঁর কবিতার সুর বিষন্ন। শিল্প জগতে মূর্ত হয়েছে বিপন্ন মানবতার ছবি এবং আধুনিক নগর জীবনের অবক্ষয়, হতাশা, নিঃসঙ্গতা। ইতিহাস চেতনা দিয়ে তিনি অতীত ও বর্তমানকে অচ্ছেদ্য সস্পর্ক সূত্রে বেঁধেছেন। কিন্তু হঠাৎ ১৯৫৪ সালের আজকের দিনেই কলকাতায় এক ট্রাম দূর্ঘটনা প্রাণ কেড়ে নেয় কবির। অনেকে বলেন, দৈন্যদশায় ও বিরহ দুঃখে জর্জরিত কবি সচেতন চিত্তেই ট্রাম লাইনে আত্মহত্যা করেছিলেন।

তাঁর বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ ‘বনলতা সেন’-এর জন্য ১৯৫৩ সালে  নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনে পুরস্কৃত হন তিনি। জীবনানন্দ কবিতা না লিখলে হয়ত অনেকের অজানাই থাকত অন্ধকারের গায়ে ঠেস দিয়ে জেগে থাকা যায়, নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতের ছবিও মানসপটে আঁকা যায় অথবা বাংলার অপরূপ রূপ, কিংবা অজানা থেকে যেত সেই বনলতা সেন, যার চোখ দেখতে পাখির নীড়ের মত।

@মনোজ

(Visited 82 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here