কৃত্তিবাস বিরচিত শ্রীরাম পাঁচালি বাঙালির গৃহের সম্পদ

1
49

 

বিনয় বর্মন,  সহকারী অধ্যাপক,  দার্জিলিং গভর্নমেন্ট কলেজ

‘রামায়ণী কথার ভূমিকা’য় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানান, ‘রামায়ণ-মহাভারতকে যখন জগতের অন্যান্য কাব্যের সহিত তুলনা করিয়া শ্রেণীবদ্ধ করা হয়নাই তখন তাহাদের নাম ছিল ইতিহাস। এখন বিদেশি সাহিত্যভান্ডারে যাচাই করিয়া তাহাদের নাম দেওয়া হইয়াছে এপিক। আমরা এই এপিক শব্দের বাংলা করিয়াছি মহাকাব্য।অর্থাৎ বাল্মীকির রামায়ণ প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের একখানা প্রমাণ্য গ্রন্থ। যুগেযুগে ভারতীয় চিন্তা ও চেতনাকে এখানে রুপদান করা হয়েছে। এইচ. জি. ওয়েলস, টয়েনবি, রমেশচন্দ্র দত্ত প্রমুখ ঐতিহাসিকদের মতে সন তারিখ যুক্ত কোন রাজা রাজরার কাহিনীকেই কেবল ইতিহাস বলতে পারিনা; যুগ ধর্মের ইতিহাস ও প্রাচীন সমাজজীবনের চিত্রপটকেও ইতিহাসের সংজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ সেদিক দিয়ে রামায়ণে প্রাচীন ভারতের সভ্যতা ও সমাজজীবনের যে সত্য ও বিস্তৃত চিত্র প্রদান করা হয়েছে তা ইতিহাসের তুলনায় কম নয়।

বাল্মীকির সময়ের প্রাচীন ভারত পরবর্তীকালে বিভিন্ন ভাষা গোষ্ঠী ও জনজাতিতে বিভক্ত হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় বিভিন্ন সাহিত্যধারার। বাল্মীকির রামায়ণে বর্ণিত প্রাচীন ভারতের এই প্রমাণই তিহাসকে পরবর্তীকালে কোন জনগোষ্ঠী উপেক্ষা করতে পারেননি। বাল্মীকির রামায়ণ অনূদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়। তামিল ভাষায় অনূদিত কম্ব রামায়ণ, মহর্ষি বম্পের রচিত মারাঠি ‘ভাবার্থ রামায়ণ’, বাংলায় রচিত মহাকবি কৃত্তিবাস ওঝার ‘কৃত্তিবাসীরামায়ণ’, কন্নড় ভাষায় রচিত অভিনব পম্প নাগচন্দ্রের ‘রামচন্দ্র চরিত পুরাণম’, মালায়লমে রচিত লুজন এনুজচন-এর ‘আধ্যান্ন রামায়ণ’, উর্দুভাষায় রচিত চক্রাবন্তের রামায়ণ এবং নেপালি ভাষায় রচিত ভানুভক্ত আচার্যের রামায়ণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বাল্মীকির পরবর্তীকালে সংস্কৃত ভাষায় রচিত তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’ সমগ্রভারতে ব্যাপক প্রচার লাভ করে।

বাঙালি কবি কৃত্তিবাস ওঝার ‘শ্রীরাম পাঁচালি’ বাংলার গৃহেরসম্পদ। এই কাব্যে একদিকে যেমন বাংলার গৃহের কথা উঠে এসেছে, তেমনি এখানে মধ্যযুগের সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিচয় রয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাই বলেছেন-‘কৃত্তিবাস কীতির্বাস কবি এ বঙ্গের অলংকার।’ পঞ্চদশ শতকে কবি কৃত্তিবাস তাঁর কাব্যরচনা করেছেন। কিন্তু তারপরেও কয়েকজন বাঙালি কবি রামায়ণের বাংলা অনুবাদ করে নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দেন। অদ্ভুত আচার্য অনূদিত রামায়ণ, মহিলা কবি চন্দ্রাবতী অনূদিত সংক্ষিপ্ত রামায়ন, শঙ্কর কবিচন্দ্রের বিষ্ণুপুরী রামায়ণ, জগৎরাম ও রামপ্রসাদের রামায়ণ এবং রামানন্দ ঘোষের ‘নতুনরামায়ণ’ এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তবে এই সমস্ত রামায়ণ কৃত্তিবাসের রামায়ণের মত এত জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি। কৃত্তিবাসের রামায়ণ আবিষ্কারের পূর্বে বাল্মিকী রামায়ণ বাঙালির গৃহধর্মে যতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, কৃত্তিবাসী রামায়ণ আবিষ্কারের পর তা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়। বাঙালির মুখে-মুখে গীতার পরেই ঘুরতে থাকে রামায়ণ কথা। কৃত্তিবাসের এই জনপ্রিয়তার কারণ কাব্যে বাঙালির গৃহধর্মের কথা এবং বাঙালির জীবনচিত্রের প্রতিফলন।

কবি কৃত্তিবাস ওঝার প্রথম মুদ্রিত পুঁথি পাওয়া যায় ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে। শ্রীরামপুর মিশন থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এরপর হীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রাচীন পুঁথি অবলম্বন করে কৃত্তিবাসী রামায়ণের পাঠ সম্পাদনা করেন। ১৩০৭ এবং ১৩১০ বঙ্গাব্দে হীরেন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন অযোধ্যাকাণ্ড ও উত্তরকান্ড। আরও পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে কৃত্তিবাসী রামায়ণের একাধিক পুঁথি প্রকাশিত হয়।

বাল্মীকির প্রাচীন ভারত নয়, বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ এবং বাঙালির সমাজজীবনই এখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে। বাল্মীকির রাম কাহিনী অবলম্বনে সপ্তকান্ড রামায়ণ রচনা করে কৃত্তিবাস গৌড়েশ্বরের দরবারে প্রশংসা লাভ করেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাই ‘প্রাচীনসাহিত্য’ প্রবন্ধ গ্রন্হে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন ‘ভারতবর্ষ রামায়ন-মহাভারতে আর কিছুই বাকি রাখে নাই…। মুদির দোকান হইতে রাজার প্রসাদ পর্যন্ত সর্বত্রই তাহার সমান সমাদর।

সপ্তকাণ্ড রামায়ণ পাঠ করলে সহজেই বোঝা যায় মূল বাল্মীকি রামায়ণের সঙ্গে কৃত্তিবাসী রামায়ণের কাহিনীগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। আসলে মধ্যযুগের অনুবাদের অর্থ ছিল আক্ষরিক অনুবাদ নয়, ভাবানুবাদ। তাই কবি কৃত্তিবাস বাল্মিকী রামায়ণের অবিকল অনুসরণ করেন নি। তবে কাব্যের কাহিনী নির্মাণে তিনি যে বাল্মীকির কাছে ঋণী ছিলেন সে কথা বাল্মীকি বন্দনার মধ্য দিয়ে কবি বুঝিয়ে দিয়েছেন-

“বাল্মীকি বন্দিয়া কৃত্তিবাস বিচক্ষণ। / শুভক্ষনে বিরচিলা ভাষা রামায়ণ।।”

তবে কৃত্তিবাসের কাব্যের মূলে রয়েছে বাঙালিয়ানা। বাল্মীকির মূল রামায়ণ থেকে কেবল সারকথা সংগ্রহ করে আপনমনের মাধুরী মিশিয়ে কবি কৃত্তিবাস শ্রীরাম কথাকে বাঙালির জীবনকাব্যে পরিণত করেছেন। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন অন্যান্য পুরাণ কাহিনী থেকে সংগৃহীত তত্ত্বকথাকে। আর এই কারণেই কবিকে মূল রামায়ণের কিছু অংশ বর্জন করে নতুন কাহিনি সংযোজন করতে হয়েছে। কৃত্তিবাস সংযোজিত নতুন কাহিনীগুলি সংগৃহীত হয়েছে অদ্ভুত রামায়ণ, যোগবশিষ্ঠ রামায়ণ, স্কন্দপুরাণ, কালিকাপুরাণ, জৈমিনি ভারত, সংহিতা প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে। তবে তিনি কখনো হুবহু অনুসরণ করেননি, বিভিন্ন পুরাণের কাহিনীকে রামায়ণের উপযোগী করে ব্যবহার করেছেন। বাল্মীকির মূল রামায়ণের অনেক কাহিনী তিনি বর্জন করলেও কখনো কাহিনীর গতির ব্যাঘাত ঘটাননি।

কাব্যের সূচনায় বাল্মীকির রামায়ণে প্রাপ্ত ক্রৌঞ্চ-মিথুনের কথা এবং শোকাহত ঋষির মুখ থেকে শ্লোক উচ্চারিত হওয়ার কাহিনী কৃত্তিবাস উল্লেখ করেননি। বরং কাব্যের সূচনায় দস্যু রত্নাকরের কাহিনী বিবৃত করেছেন। এছাড়া কার্তিকের জন্ম,বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্র বিরোধ, বিশ্বামিত্রের কথা, অম্বরিশ রাজার যঞ্জ কৃত্তিবাস তার রামায়ণে উল্লেখ করেননি। তার পরিবর্তে তিনি রাজা দশরথের পূর্বপুরুষ দিলীপরের কাহিনী তুলে ধরেছেন। যা বাল্মীকির রামায়ণে নেই। কৃত্তিবাস তাঁর রামায়ণের আদিকান্ডে রাজা হরিশচন্দ্রের উপাখ্যান বর্ণনা করেছেন। এই কাহিনী তিনি গ্রহন করেছেন ভাগবত ও মার্কন্ডেয় পুরাণ থেকে। দশরথের রাজ্যে শনির দৃষ্টি এবং অনাবৃষ্টির ফলে প্রজাগণের চরম দুর্দশার কাহিনী তিনি স্কন্দ ও কালিকাপুরাণ থেকে সংগ্রহ করেন। আদিকাণ্ডে বর্ণিত অন্যান্য পুরাণ থেকে সংগৃহীত এই সমস্ত কাহিনী ছাড়াও কবি কৃত্তিবাস নিজস্ব কল্পনায় কিছু কাহিনীকে সংযোজন করেছেন। যেমন-জটায়ু ও দশরথের মিত্রতা পাতানো, গণেশেরজন্ম, এবং সম্বরাসুরবধ, গুহক চন্ডালের সঙ্গে মিত্রতা ইত্যাদি।

অহল্যার কাহিনীর ক্ষেত্রেও উভয় কবির ভাবনাগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। বাল্মিকীর রামায়ণে ঋষি গৌতমের অনুপস্থিতিতে ইন্দ্র গৌতমের ছদ্মবেশে এলে অহল্যা মুনিবেশধারী ইন্দ্রকে বুঝতে পারেন কিন্তু তা সত্ত্বেও অহল্যা মিলনের সম্মতি দেন। কিন্তু কৃত্তিবাসের অহল্যা ইন্দ্রের ছলনা বুঝতে পারেননি। তাই জানান-

অহল্যা গৌতম জ্ঞানে করে সম্ভাষণ। / আজি কেন অতি ত্বরা গৃহে আগমন।।

কৃত্তিবাসের শ্রীরাম পাঁচালীর অরণ্যকান্ডে শরভঙ্গ ঋষি কর্তৃক রামচন্দ্রকে ইন্দ্র প্রদত্ত ধনুর্বাণ এবং রামনাম করতে করতে আগুনে দেহত্যাগের উল্লেখ আছে। কিন্তু বাল্মীকির রামায়ণে অস্ত্রদানের কোনও উল্লেখ নেই। কৃত্তিবাসের কাব্যে লক্ষণের গন্ডির কথা উল্লেখ আছে। সীতার কর্কশ বাক্য সহ্য করতে না পেরে লক্ষণ যখন সোনার হরিণরুপি রাক্ষসের অনুসরণকারী রামচন্দ্রের সন্ধানে যান তখন কুঠির প্রাঙ্গণে একটি গণ্ডি টেনে সীতাকে তা লঙ্ঘন করতে বারণ করে। লক্ষণের এই গন্ডি তথা লক্ষনরেখার কথা বাল্মিকী রামায়ণে নেই।

সুন্দরকান্ডে হনুমান সীতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে সীতা অমৃতফল খেতে দেন। কিন্তু বাল্মীকির রামায়ণে হনুমানের অমৃতফল খাওয়ার কোনও বর্ণনার উল্লেখ নেই। বাল্মীকির রামাযণে রাবন কর্তৃক বিভীষনকে ভৎসনা করার কথা লঙ্কাকাণ্ডে পাওয়া যায়। কিন্তু কৃত্তিবাস এই ঘটনা সুন্দরকান্ডেই বর্ণনা করেছেন। লঙ্কাকাণ্ডে উল্লেখিত চন্ডিদেবীর অকালবোধনের কাহিনীটি কবি কৃত্তিবাস বৃহধর্ম্মপুরাণ থেকে সংগ্রহ করেছেন। এই কান্ডেই মেঘনাদের সঙ্গে লক্ষণের যুদ্ধ এবং মৃত্যুমুখে পতিত হলে পবননন্দন হনুমানের ঋষ্যমুখ পর্বতে ঔষধ আনতে যাওয়ার কাহিনী বাল্মীকির রামায়ণে নেই। কবি কৃত্তিবাস এই কাহিনী নিয়েছেন অদ্ভুত রামায়ণ থেকে। এ প্রসঙ্গে কবি জানান-

“নাহিকো এসব কথা বাল্মীকি রচনে। / বিস্তারিয়া লিখিত অদ্ভুত রামায়ণে।।”

এছাড়া আধ্যাত্ম রামায়ণ থেকেও তিনি দুটি কাহিনী কাব্যের মধ্যে সংযোজন করেছেন। রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে লক্ষণ শক্তিশেলে পড়লে হনুমান গন্ধমাদন পর্বতে ঔষধ আনতে যায়। সেখানে ছদ্মবেশী কালনেমীর সঙ্গে হনুমানের প্রচণ্ড যুদ্ধ এবং কালনেমীর মৃত্যু বাল্মিকী রামায়ণে নেই। এছাড়া রাবণবধ করে সীতা উদ্ধারের পর রাম কর্তৃক হনুমানকে স্বর্ণহার উপহার দেওয়ার প্রসঙ্গটি কবি কৃত্তিবাস আধ্যাত্ম রামায়ণ থেকে সংগ্রহ করেছেন।

এই লঙ্কাকান্ডের মধ্যেই কবি কৃত্তিবাস নিজস্ব কল্পনাশক্তির সাহায্যে কিছু নতুন কাহিনীকে কাব্যের উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন। যেমন- তরণীসেনবধ, বীরবাহু, ভস্মলোচনবধ কবির নিজস্ব কল্পিত কাহিনী। লক্ষণ শক্তিশেলে পড়লে হনুমান গন্ধমাদন পর্বতে ঔষধ আনতে যায় এবং অর্ধরাতে রাবনের দেশে সূর্য উঠলে হনুমান সূর্যকে কক্ষতলে ধারণ করে। সূর্যকে ধারণ করার কাহিনী কৃত্তিবাসের নিজস্বসৃষ্টি। এছাড়া মহীরাবন ও অহীরাবনবধ, রামচন্দ্রের অকালবোধন ও ১০৮টি নীলপদ্মের কাহিনী বাল্মিকী রামায়ণ নেই। ব্রহ্মঅস্ত্রে রামচন্দ্র রাবণকে হত্যা করার পর রাবণের কাছ থেকে রামচন্দ্রের রাজনীতি শিক্ষা কবি কৃত্তিবাসের কাব্যে নতুন সৃষ্টি। এই সমস্ত কাহিনী কবি নিজস্ব কল্পনাশক্তির সাহায্যে নতুন করে সাজিয়ে তুলেছেন।

বাল্মীকি রামায়ণ থেকে মূল সারকথা গ্রহণ করে কবি কৃত্তিবাস কল্পনাশক্তির সাহায্যে যে নতুন কাহিনী গড়ে তুলেছেন তার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন বাঙালির জীবনযাত্রার নানা প্রসঙ্গ। ফলে কৃত্তিবাসী রামায়ণ হয়ে উঠেছে বাঙালির অন্তরের সম্পদ। মূল বাল্মীকি রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্রের যে মহৎ আদর্শ, চরিত্রের দৃঢ়তা ও বৃহৎ জীবনের ছায়াপাত ঘটেছে, কবি কৃত্তিবাস তার কোনোটিকেই গ্রহণ না করে রামায়ণকে বাঙালির সহজাত মানসিকতার উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন। ফলে ভাবগত দিক দিয়েও কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাল্মীকির রামায়ণ থেকে লক্ষণীয় ভাবে পৃথক হয়ে উঠেছে। বাল্মীকির রাম আর্যসভ্যতার প্রতি প্রতিভূ, মহাপরাক্রমশালী ক্ষত্রিয় বীর নরপতি। কিন্তু কৃত্তিবাসের রামচন্দ্র বাঙালির প্রাণের ঠাকুরে পরিণত হয়েছে। পাপি-তাপিকে উদ্ধারের জন্য তাঁর জন্ম। তাই কবি কৃত্তিবাস জানান–

“একবার রামনামে সর্ব পাপক্ষয়।”

এই রাম দশরথের মৃত্যুসংবাদে হতচৈতন্য হয়ে পড়েন। সীতা নির্বাসনের পর আত্মবিস্মৃত রাম যেন রামত্ব হারিয়ে হয়ে ওঠেন একজন সাধারন বাঙালি মানুষ। ভরত আর লক্ষণ অগ্রজের আজ্ঞাবহ বাঙালি সহোদর। বাল্মীকির লক্ষণ রাম বনবাসের প্রাক-কালে দশরথের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করেন। কিন্তু কৃত্তিবাসের লক্ষণের এই প্রতিবাদ তীব্র নয়। বরং সেখানে বাঙালির কোমল স্বভাব হৃদয়ের প্রকাশ ঘটেছে। আর সীতা আদর্শ কুলবধূ। বাঙালির মতই লজ্জাশীলা সংকুচিতা, সামান্য বিপদের আশঙ্কায় কম্পিতা-

“জানকী কাপেন যেন কলার বাদুড়ী।”

রাবণ কর্তৃক অপহৃতা সীতা তাই অসহায়ের মত বিলাপ করে।

কৈকেয়ী, মন্হরা বা সুপর্ণখা প্রতিটি চরিত্র বাঙালির ঘরোয়া আদর্শে চিত্রিত। পরম প্রতাপশালী রাবণের মধ্যেও কবি কৃত্তিবাস ভক্তিরসের সৃষ্টি করেছেন। যে রামচন্দ্রকে ‘অনাদিপুরুষ’ বলে রামের হাতেই মুক্তিকামনার জন্য অনুশোচনা করেছেন।

“জন্মিয়া ভারতভূমে আমি অনাচার। / করেছি পাতক বহু সংখ্যা নাহি তার।।”

আর রামচন্দ্র তারই ভক্ত তরণী সেনের সঙ্গে যুদ্ধ করবে ভেবে কেঁদে ফেলেছেন। বিভীষণ রামচন্দ্রকে জানায়–

“লঙ্কাপুরেও তোমার ভক্ত একজন।। / তোমার চরণ বিনা অন্য নাহি জানে। / আসিয়াছে সংগ্রামেতে রাজার শাসনে।।”

কৃত্তিবাসের বর্ণনার মধ্যেও কাব্যের বিভিন্ন স্থানে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে। রামের সন্ধানে ভরত গুহক চণ্ডালের কাছে এলে গুহক তাকে দই, দুধ, নারিকেল, সুপারি, আম-জাম, কাঁঠাল ইত্যাদি দিয়ে আপ্যায়ন করেন। রামের মিতা গুহককে ভরত আলিঙ্গন করার বাসনা প্রকাশ করলে গুহক চন্ডাল না করেননি-

“গুহক চন্ডালে ভরত দিলেন আলিঙ্গন। / সুগন্ধি চন্দন দিলেন বহুমূল্যধন।।”

আর ঋষি ভরদ্বাজ তাঁর আশ্রমে ভরতসহ সৈন্যদের যা খেতে দিয়েছেন তা বাঙালির জীবনেরই প্রতিচ্ছবি-

“সুগন্ধি কোমল অন্ন দেবের নির্ম্মাণ। / দধি দুগ্ধ ঘৃত ঘোল অমৃত সমান।। / চন্দ্রাবতী বড়া পিঠে মুগের সামলী। / সুধাময় দুগ্ধে ফেলে নারিকে লপলি।।”

বাঙালির আচার, সংস্কার ও বিশ্বাসের কথা কবি কৃত্তিবাস তাঁর কাব্যে তুলে ধরেছেন। বাঙালির দশকর্ম বিধান অনুসারে রামচন্দ্রের জন্মাচার পালন করা হয়েছে। জন্মের পর বিধি অনুসারে পুত্রদের নাম রাখা হয়েছে-

“কৌশল্যার সনে রাজা করি অনুমান। / তোমার পুত্রের নাম থুইল শ্রীরাম।। / কৈকয়ীর পুত্র দেখিয়া রাজা হরিষ অন্তর। / ভরত নাম থুইল তার দেখি মনোহর।। / সুমিত্রার তনয় জমজ দুইজন। / দুজনার নাম থুইল লক্ষণ শত্রুঘ্ন।। / একই দিবসে কৈল চারিজনের নামকরণ। / রাম লক্ষণ আর ভরত শত্রুঘ্ন।।”

এছাড়া জন্মের পাঁচদিনে পাঁচুটি, ছয়দিনে ছয়ষষ্ঠী এবং ছয়মাসে অন্নপ্রাশন করার কথা বলা হয়েছে কৃত্তিবাসী রামায়ণে। খাদ্যদ্রব্যের মধ্যেও রয়েছে বাঙালিয়ানা, যেমন মতিচুর, কলার বড়া, তালের বড়া, ছানার পায়েস ইত্যাদি। উত্তরখণ্ডে সীতাদেবী চৌদ্দ বছরের উপবাসী লক্ষণকে সহজ রান্না করে যা খেতে দিয়েছেন তা বাঙ্গালীর অন্যতম প্রিয় খাদ্য-

“প্রথমেতে শাক দিয়ে ভজন আরম্ভ। / তাহার পরে সুপ আদি দিলেন সানন্দ।। / ভাজা ঝোল আদি করি পঞ্চাশ ব্যঞ্জন। / ক্রমে ক্রমে সবাকারে কৈল বিতরণ।। / শেষে অবলমান্তে হল ব্যঞ্জন সমাপ্ত। / যদি পরে পরমান্ন পিষ্ঠকাদি যত।।”

বাঙালির বিবাহ রীতির পরিচয়ও কবি কৃত্তিবাস তুলে ধরেছেন রাম লক্ষণ ভরত ও শত্রুঘ্ন বিবাহের মধ্য দিয়ে। বিবাহের পূর্বে মঙ্গলার সহযোগে জনক ও তাঁর ভ্রাতা কুশধ্বজের চার কন্যার অধিবাস কীর্তন ও বিভিন্ন গীতবাদ্যের আয়োজন করা হয়েছে, যা বাঙালির বাঙালির সংস্কার বা রীতি-

আগে চার কন্যার কৈল মঙ্গল আচার। / তবে অধিবাস করিলা চারি কুমারী।। / নানা গীত বাদ্য বাজে নানা শব্দ শুনি। / রাজ্য শব্দ হইল আকাশবাণী।।”

বাঙালির জীবন-জীবিকা বেশভূষা, রীতিনীতির কথা কবি কৃত্তিবাস তার কাব্যে জীবন্ত করে তুলে ধরেছেন। পশুপক্ষীর কথার মধ্যদিয়ে উঠে এসেছে বাংলার প্রকৃতির চিত্র-

“সারস সারসি ডাকে কাক কাদাখোঁচা। / গৃহিণী কোকিল চিল আর কালপেঁচা।।

এছাড়া আরও রয়েছে-

“দশমুখ মেলিয়া রাবণ রাজা হাসে। / কেতকী কুসুম যেন ফুটে ভাদ্রমাসে।।”

কবি কৃত্তিবাস তার রামায়ণ পাঁচালীতে যেভাবে বাঙালির আচার-আচরণ, রীতিনীতি ও সংস্কার বিশ্বাসকে কাব্যের অন্তঃপুরে উপস্থাপন করেছেন তাতে আর্য কবির রস জাহ্নবী রামায়ণ বাঙালির মৌননদীতে পরিণত হয়েছে। এখানেই প্রকাশিত হয়েছে বাঙালি জীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শসমূহ রামের পিতৃভক্তি, লক্ষণের মাতৃভক্তি, সীতার পতিভক্তি বা প্রতিনিষ্ঠা বাঙালির বিভিন্ন নৈতিক আদর্শ আধ্যাত্মিকতায় এখানে পরিবেশিত হয়েছে। তাই কৃত্তিবাসের রামায়ণ বাঙালির হৃদয়হরণ করেছে। স্থান করে নিয়েছে বাঙালির ঘরে ঘরে। রামায়ণ পাঠ কেবল বাঙালির মনের খোরাক যোগায়নি, বাঙালির মনকে দিয়েছে শান্তির বার্তা। তাই কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাঙালির ঘরে ঘরে বেঁচেছিল আর ভবিষ্যতেও বেঁচে থাকবে।     (মনোজ)

(Visited 24 times, 1 visits today)