রামু থেকে ভোলা: এভাবেই চলবে, না থামবে?

শিতাংশু গুহ
‘নবী ও ইসলাম ধর্ম অবমাননা’র অজুহাতে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে বেশ ক’টি সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে। এর সিংহভাগ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গেছে। মাঝে কিছুদিন মুক্তমনা ও ব্লগার এই অভিযোগে প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ ভোলার ঘটনার পর একাত্তর টিভি ক’টি সুন্দর অনুষ্ঠান প্রচার করেছে। বিবিসি বাংলা চেষ্টা করেছে ঘটনার গভীরে পৌঁছতে। বাংলাদেশের মিডিয়া যদি আন্তরিকভাবে সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলো নিয়মিত প্রকাশ করতো তাহলে তীব্রতা কিছুটা প্রশমিত হতে পারতো। এখানেও সমস্যা আছে। দৈনিক ইনকিলাব বা নয়া দিগন্ত খুললে দেখা যাবে এরা বরং উত্তেজনায ঘি ঢালতে চেষ্টা করেছে। সরকার বা প্রশাসন সদিচ্ছা থাকলেও এসব ঘটনা এড়ানো সম্ভব, প্রশ্নটা হচ্ছে সদিচ্ছার। এবার প্রধানমন্ত্রী শুরুতেই কথা বলেছেন, তাকে ধন্যবাদ, এজন্যে ভোলা ‘নাসিরনগর’ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী কি চান তা পরিষ্কার হওয়ায়, প্রশাসন সঠিক অবস্থান নিয়েছে। ফলে কিছু হিন্দু’র বাড়িঘর পুড়লে  বা মন্দির-মুর্ক্তি ভাঙ্গলেও বড় ধরনের ঘটনা এড়ানো গেছে। পুলিশের গুলিতে ৪জন মারা গেছেন। সরকার পরিবার প্রতি ৫লক্ষ টাকা দিয়েছেন। ভোলার এমপি’ও তাদের অর্থ সাহায্য করেছেন। যদিও সরকার বা এমপি মৌলবাদী তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্থ হিন্দুদের কিছু দিতে ভুলে গেছেন।

[আরও পড়ুন: রাজ্য-রাজ্যপাল সংঘাত কী আদৌ মিটতে চলেছে!]

সেদিন হিন্দুদের কি ক্ষতি হয়েছিল? সরজমিনে গেলে একাত্তর টিভিকে ক্ষতিগ্রস্থরা বলেছেন, একেকটা বাড়িতে প্রায়  ২০/২৫ জনের মতো ভাগ ভাগ করে  ঢুকেছে। প্রথমে তারা ঘরে ঢুকে ঘরের জিনিসপত্র ভেঙেছে,  সামনে যাকে পেয়েছে তাকেই বেধরক পিটিয়েছে, তারপর তাদের উপসনালয় ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে। এক বাড়ির বউ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বললেন, ৭১ দেখি নাই মায়ের মুখে শুনছি, আজ মনে হইলো আমি ৭১  দেখতেছি। ঘরের এক কোনায় দাঁড়ায়ে ভয়ে শুধু কাঁপছি। আমার ৩০ বছরের সংসারের জমানো জিনিস চোখের সামনে ধ্বংস কইরা দিয়া গেল। আর এক বাড়ির  বউ বললো, দুইজন মুরুব্বী সহ ১৫/২০ জন ঘরে ঢুইকা সব জিনিসপত্র ভাঙ্গছে, ভাংচুর করে বার হয়ে যাবার সময় সেই মুরুব্বী দুইজন ছেলেদের ডেকে বললো, এই তোরা চইলা যাস ক্যান কিছুই তো করস নাই! তাই বলে চোখ টিপে পুজার ঘর দেখায়ে দিল। তারপর তারা আমাদের ধর্মীয় ঘরে ঢুইকা প্রতিমাসহ পূজার ঘর ভাইঙ্গা তচনচ কইরা যাবার সময় আমাদের সমস্ত কাপড়চোপড় উঠানে ফালায়ে আগুন লাগায়ে দিল। আর এক বৃদ্ধ মহিলা  কাঁদতে কাঁদতে বললো, ওরা যখন আমার ঘরে ঢুকলো আমি হাতজোড় কইরা বললাম, আমার স্বামী অসুস্থ ওনারে মাইরেন না, আমারে মারেন। তখন তারা ঘরের আলমিরা ভেঙ্গে সব জিনিসপত্র নিয়ে সেই বৃদ্ধাকে লাঠির আঘাতে আহত করে উল্লাস করতে করতে বেড়িয়ে যায়। এমনি আরো বহু ঘটনা।

এবার এই তান্ডব করেছে তৌহিদী জনতা। পুরো বাংলাদেশে এখন প্রচন্ড ধর্মীয় অনুভূতি সম্পন্ন তৌহিদী জনতার দাপট। আর এই তৌহিদী জনতার কাছে হিন্দু, বা সংখ্যালঘু বা মুক্তচিন্তার মানুষেরা বড় অসহায়। পুরান বোতলে নতুন মদ যেমনি, তেমনি এই তৌহিদী জনতা একাত্তরে ছিল  রাজাকার, ২০০১-এ জামাত, ২০১৩-তে হেফাজত এবং ২০১৯ সালে এরা হয়েছে তৌহিদী জনতা। এদের এখনকার অজুহাত, ধর্ম অবমাননা। ধর্ম অবমাননা কত প্রকার বা কি কি সেই আলোচনা পরে, বাংলাদেশে শুধুমাত্র ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য সকল ধর্ম ‘অবমাননা প্র্রঊফ’। হুজুররা ওয়াজে নিত্যদিন হিন্দুধর্ম নিয়ে বিষোদ্গার করলেও সনাতন ধর্মের কোন অবমাননা হয়না, বা হতে নেই? বৌদ্ধদের জন্যেও একই কথা প্রযোজ্য। বারবার ধর্মীয় অনুভূতির ধোঁয়া তুলে এ ধরণের সন্ত্রাস সৃষ্টির পেছনের অন্তর্নিহিত কারণ হচ্ছে, দেশ থেকে হিন্দুদের খেদিয়ে বের করে দেয়া। এ পুরাতন খেলা। পাকিস্তান এ খেলা খেলে সফল হয়েছে। প্রায় সকল মুসলিম অধ্যুষিত দেশে এটাই নিয়ম, তাঁরা অন্য ধর্মাবলম্বীদের তাদের দেশে থাকতে দিতে রাজি নয়? বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিলো ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে, সেই হিসাবে কিছুটা ব্যতিক্রম আশা করা গিয়েছিলো, প্রায় অর্ধ-শতাব্দী’র মাথায় দাঁড়িয়ে বলা যায়, ‘সকলি গরল ভেল’।

ভোলায় এবারই প্রথম নয়, আগেও ঘটেছে। একটু অতীতে ফিরে যাই? কি ঘটেছিলো ২০০১-এ ভোলায়? ডেইলি ষ্টারের মোহাম্মদ বদরুল আহসান তার ‘নাঁকফুল হারানো রাত’ নিবন্ধে লিখেছিলেন, ভোলার চরফ্যাশনে একরাতে একই জায়গায় প্রায় দু’শ মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়। এরমধ্যে ৮ বছরের শিশু, মধ্যবয়স্ক বিকলাঙ্গ মহিলা বা ৭০ বছরের বৃদ্ধা, কেউ রেহাই পাননি। বিএনপি-জামাত নির্বাচনে জিতে বিজয় উৎসব করেছিলো হিন্দু’র ওপর অত্যাচার করে। হিন্দু মেয়েরা ধর্ষিতা হয়েছিলো আওয়ামী লীগ বলে নয়, হিন্দু বলে। বিষয়টা এরকম ছিলো যে, ‘মুসলমানরা হিন্দু মেয়ে ধর্ষণ করছে’। অর্থাৎ ধর্মীয় বিশ্বাসের কারনে এই ধর্ষণ। ভোলায় তৌহিদী জনতার এবারকার সন্ত্রাসও ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আক্রমন। আরো একটু অতীতে ফিরে যাই, কক্সবাজারের রামু’র বৌদ্ধপল্লীতে হামলা ঘটেছিলো ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২। উত্তম বড়ুয়া’র ফেইসবুক একাউন্ট থেকে ইসলাম, কোরান ও নবীকে অবমাননা করা হয়। সর্বস্তরের জঙ্গী মুসলমান মিছিল-সমাবেশ করে বৌদ্ধপল্লীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় রামু’র বৌদ্ধপল্লী। উখিয়া, টেকনাফে কিছুটা রেশ পরে। ওই অঞ্চলে ১৯টি প্যাগোডা, মুর্ক্তি ভাঙ্গা হয়, অসংখ্য বাড়িঘরে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ১৮টি মামলা হয়, কোন অগ্রগতি নেই? যেই উত্তম বড়ুয়া-কে নিয়ে এ লঙ্কাকান্ড, সেই উত্তম বড়ুয়া-কে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি (বিবিসি বাংলা, ১৪ নভেম্বর ২০১৮)।

নাসিরনগর ঘটনা ৩০ অক্টবর ২০১৬। একই কায়দা। একই কারণ। হিন্দুদের মন্দির, মুর্ক্তি, বাড়িঘর ভাংচুর। ঘটনার দুইদিন আগে নাসিরনগরের হরিপুর গ্রামের রসরাজ দাস-র নামে ফেইসবুকে পোস্টিং  আসে ‘কাবার ওপর শিবলিঙ্গ’। স্থানীয় লোকজন রসরাজকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। তাতেও থামেনি। হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। প্রথম দিনে ৮টি হিন্দুপাড়ায় ৩০০ বাড়ীঘর, মন্দির, দেবদেবীর প্রতিমা ভাংচুর করা হয়। রসরাজের বাড়িঘর আক্রমণ, ভাংচুর হয়। ৫দিনের মাথায় ৪ঠা নভেম্বর আবার একদফা আক্রমণ হয়। আওয়ামী লীগের প্রায়ত মন্ত্রী ছায়েদুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তিনি হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলে গালি দিয়েছেন। মন্ত্রী তা অস্বীকার করেন। পত্রিকার খবর, সেদিন রাতে কয়েকশ’ নারী তিতাস নদীতে সারারাত গলা ডুবিয়ে রেখে সম্ভ্রম রক্ষা করেছেন। পিতৃপুরুষ বা স্বামীর ভিটা নয়, তিতাস যদি সেদিন তাঁদের সম্ভ্রম রক্ষা করেছিলো। আড়াই মাস পর রসরাজ জামিনে মুক্তি পান। তিনি জেলে, অশিক্ষিত। ফেইসবুক চালাতে জানেন না, পাসওয়ার্ড কাকে বলে তাও বুঝেন না। এখানে মোট ৮টি মামলা হয়েছিলো, কোন অগ্রগতি নেই?

১০ই নভেম্বর ২০১৭ সালে ঠিক একই ঘটনা ঘটে রংপুরের গঙ্গাচড়ায়। গুলি চলে, ১জনের মৃত্যু হয়। টিটু রায়, বাড়ি গঙ্গাচড়া, কিন্তু থাকতেন নারায়ণগঞ্জ। তাঁর ফেইসবুক থেকে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ ওঠে। তিনি গ্রেফতার হন। গঙ্গাচড়ায় কয়েকদিন ধরে মাইকিং হয়। ঘটনার দিন মানববন্ধনে শতশত মানুষ হিন্দুপাড়া আক্রমণ করে। মোট ৩টি মামলা হয়, কোন অগ্রগতি নেই? রংপুরে মসজিদের মাইক থেকে মুসুল্লিদের উত্তেজিত করা হয় (বিবিসি বাংলা, ১৪ নভেম্বর ২০১৮)। যশোরের অভয়নগর, সাতক্ষীরা, নন্দীরহাট সর্বত্র নবী ও ইসলাম অবমাননার অজুহাত। এর ব্যাপকতার শুরু সেপ্টেম্বর ২০১২-তে রামুতে বৌদ্ধদের ওপর ইসলাম ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অজুহাত দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী তখন রামু গিয়েছিলেন। কথা বলেছিলেন। সাত বছর পর আবার তিনি কথা বললেন ভোলার ঘটনায়। মধ্যখানে তিনি কোন কথা বলেননি, চুপচাপ ছিলেন। অথচ এই সাত বছরে ধর্ম অবমাননার নামে ছোটবড় অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। নন্দীরহাট, অভিয়নগর, সাতক্ষীরা এর অন্যতম। প্রশাসনের নির্লপ্ততা এবং বিচার না হওয়া এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি উৎসাহিত করছে। ওপরের কোন ঘটনার বিচার হয়নি, ভোলার ঘটনার বিচারও হবেনা, এমনকি ২০০১’র পর বিএনপি-জামাতের সহিংসতার বিচারও আওয়ামী লীগ করেনি। বাংলাদেশে হিন্দুদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল ছিলো আওয়ামী লীগ। সেই আওয়ামী লীগ যখন বিচার করেনা, তখন হিন্দুরা আর কার কাছে বিচার চাইবে?

(shreyashree)

(Visited 51 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here