কংগ্রেসে প্রস্তাব পাশ, ইম্পিচমেন্ট প্রক্রিয়া বৈধ

শিতাংশু গুহ, নিউ ইয়র্ক: বিভক্ত কংগ্রেসে বৃহস্পতিবার ৩১শে অক্টবর প্রায় পার্টি লাইন ভোটে ‘ইম্পিচমেন্ট ইনক্যুরি’ প্রস্তাব পাশ হয়েছে। প্রস্তাবের পক্ষে ২৩২, বিপক্ষে ১৯৬ ভোট পড়েছে। কোন রিপাবলিকান প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেননি। যদিও আগে রিপাবলিকান ছিলেন, কিন্তু এখন ডেমোক্রেট কংগ্রেসম্যান জাস্টিন আমেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। দু’জন ডেমোক্রেট নিউজার্সির জেফ ভ্যান ড্রিউ এবং কলিন পেটারসন প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। ভ্যান ড্রিউ বলেছেন, প্রস্তাবটি একেবারে পার্টিজান। এর আগে ডেমোক্রেটদের ইম্পিচমেন্ট প্রক্রিয়াকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘অবৈধ’ বলেছিলেন। রিপাবলিকানরা রুদ্ধদ্বার সাক্ষ্যের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং একসময় গোপন সাক্ষ্য কক্ষে ঝটিকা ঢুকে পড়ে পাঁচঘন্টা অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছিলেন।

তখন থেকে ডেমোক্রেটরা নভেম্বরে প্রকাশ্যে সাক্ষ্য নেয়ার কথা চিন্তা-ভাবনা করেন। ফলশ্রুতিতে হাউসে এই প্রস্তাব পাশ হয়। ইম্পিচমেন্ট প্রক্রিয়া এখন বৈধ। যদিও প্রস্তাবটি একেবারেই পদ্ধতিগত, কিন্তু এরফলে এখন সকল সাক্ষ্য প্রকাশ্যে হবে এবং ইতিপূর্বে নেয়া সাক্ষ্য-প্রমাণাদি জনসম্মুখে প্রকাশ করা যাবে। হাউস পার্মানেন্ট সিলেক্ট কমিটি’র চেয়ারম্যান এডাম শিফ এবং হাউস জুডিশিয়ারি কমিটি’র চেয়ারম্যান জেরি নাডলার পরবর্তী অভিশংসন সাক্ষ্য পরিচালনা করবেন। ডেমোক্রেটরা বলছেন, সবকিছু প্রকাশ্যে আসলে জনমত প্রেসিডেন্টের বিপক্ষে যাবে। তারা বলছেন, বিভিন্ন সাক্ষ্যে প্রমাণিত যে, ট্রাম্প তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ইউক্রেনে সামরিক সাহায্য বন্ধ করেছিলেন। জুডিশিয়ারি কমিটি’র গাইডলাইন অনুযায়ী এডাম শিফ ও জেরি নাডলারের অনুমতি সাপেক্ষে রিপাবলিকানরা সাক্ষী ডাকতে এবং তথ্যপ্রমাণাদি হাজির করতে পারবেন।

স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সকল সুযোগ-সুবিধা পাবেন, যা রিচার্ড নিক্সন ও বিল ক্লিনটন পেয়েছিলেন। মাইনোরিটি হুইপ ষ্টিভ স্ক্যালিজ বলেছেন, শুধু একপক্ষ সাক্ষী ডাকলে এটি কিসের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া? রিপাবলিকান মার্ক মিডোস বলেছেন, সবকিছুই ডেমক্রেটদের দখলে থাকলো। তারাই সব সিদ্ধান্ত নেবেন। হোয়াইর হাউস ভোটাভুটির নিন্দা করে বলেছে, ডেমোক্রেটরা উঠেপড়ে লেগেছে একজন প্রেসিডেন্টকে অপসারিত করতে। এতে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা হোয়াইট হাউসকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিচ্ছেনা। রিপাবলিকানরা বলছেন, ট্রাম্পের পুন্”নির্বাচন ঠেকাতেই ডেমোক্রেটরা ইম্পিচমেন্ট প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বন্ধু ও সমর্থক সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ডেমোক্রেটদের ইম্পিচমেন্ট প্রক্রিয়ার নিন্দা করে একটি প্রস্তাব সিনেটে উত্থাপন করেছেন। পঞ্চাশজন সিনেটর এই প্রস্তাবের সমর্থক হিসাবে স্বাক্ষর করেছেন। যদিও এ প্রস্তাব তেমন গুরুত্ববহ নয়, তবু এটি ট্রাম্পের পক্ষে রিপাবলিকানদের একটি পদক্ষেপ। ইতোপূর্বে ট্রাম্প অভিশংসন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের আরো জোরালো প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরপর তিনটি ঘটনা ঘটেছে; একটি লিন্ডসে গ্রাহামের প্রস্তাব, অপরটি গোপন সাক্ষ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং সর্বশেষ হাউসে এককাট্টা হয়ে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট প্রদান। অর্থাৎ অভিশংসন প্রক্রিয়া পার্টিজান লাইনে যাচ্ছে।

আইওয়া ককাসের এখনো বাকি তিনমাস, ডেমোক্রেট শিবিরে শক্তিশালী প্রার্থী সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তারপরে আছেন বস্টনের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন এবং ভার্মন্টের বার্নি স্যান্ডার্স। গত সেপ্টেম্বর থেকে ইন্ডিয়ানার মেয়র পিট্ বুটিয়েগ দ্রুত এগিয়ে আসছেন।

ওয়াসিংটন পোষ্ট-এবিসি নিউজ জরীপ বলছে, ইম্পিচমেন্ট প্রশ্নে আমেরিকানরা স্পষ্টত: দুইভাগে বিভক্ত। ৪৯% ইম্পিচমেন্টের পক্ষে, ৪৭% বিপক্ষে। শুক্রবার ২৫ অক্টবর ২০১৯ হাউস দু’জন অফিস অফ ম্যানেজমেন্ট ও বাজেট (ওএমবি) কর্মকর্তাকে সাক্ষ্যের জন্যে ডেকেছেন, এঁরা হচ্ছেন, ওএমবি’র অস্থায়ী পরিচালক রাসেল ভোগট এবং এর ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রধান মাইকেল ডায়াফে। ভোগট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা কেউই যাচ্ছেন না। ইম্পিচমেন্ট কমিটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টনকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে ডেকেছেন ৭ই নভেম্বর ২০১৯। এক্টিং হোয়াইট হাউস চীফ অফ ষ্টাফ মাইক মালভানিকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে ডাকা হয়েছে।

লেঃ কর্নেল আলেক্সজান্ডার বিন্ডম্যান তাঁর সাক্ষ্যে ট্রাম্প-ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মধ্যে কথোপকথনে উদ্বেগ প্রকাশের পর হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল সিকিউরিটি বিষয়ক উপদেষ্টা জন আইজেনবার্গ ডক্যুমেন্ট দেখার ওপর নুতন করে আরো কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছেন। জন আইজেনবার্গকে ডাকা হয়েছিলো সাক্ষ্য দিতে, তিনি স্পষ্টতঃ না বলে দিয়েছেন। হাউস ০৪ নভেম্বর, সোমবার রুদ্ধকক্ষে নেয়া দু’টি সাক্ষ্য প্রকাশ করেছে। প্রথমটি হলো, ১১ অক্টবরে নেয়া ইউক্রেনের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেরি ইভানভিচ। অন্যটি হচ্ছে, ১৬ অক্টবরে নেয়া মাইক পম্পিও’র সিনিয়র এডভাইজর পি.মাইকেল ম্যাককিনলে।

ট্রাম্পের ট্যাক্স ডক্যুমেন্ট প্রকাশ করার জন্যে নিউইয়র্কের প্রসিকিউটরদের আর্জি বাতিলের জন্যে ট্রাম্পের আবেদন গত ক’সপ্তাহে দুইবার ফেডারেল আপিল কোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রসিকিউটরদের এই আর্জি ঠেকাতে ট্রাম্প তাঁর স্থায়ী নিবাস নিউইয়র্ক থেকে সরিয়ে ফ্লোরিডা নিয়ে গেছেন। নির্বাচনী মৌসুমে ট্রাম্পের ট্যাক্স রেকর্ড প্রকাশ একটি জোরালো ইস্যু হবে। ট্রাম্পের পুন:নির্বাচন ঠেকাতে মরিয়া ডেমোক্রেটদের ধারণা প্রেসিডেন্টের ট্যাক্স ডক্যুমেন্টে ফাঁক-ফোকড় আছে যা প্রকাশিত হলে ট্রাম্প বেকায়দায় পড়বেন।

এডভাইস কলামিষ্ট ই.জে. ক্যারল আগে অভিযোগ করেছিলেন যে, দুই দশক আগে ট্রাম্প নিউইয়র্কের ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোর বার্গড্রফ গুডম্যান’-এ তাঁকে যৌন হেনস্থা করেছেন। জুনে প্রকাশিত এক ‘স্মৃতিগ্রন্থে’ ক্যারল সেই ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তিনি কখনো ক্যারলকে দেখেননি এবং ক্যারল তার বই ব্রিক্রি বাড়াতে এ অভিযোগ এনেছে।

ট্রাম্প ইতোপূর্বে তার বিরুদ্ধে আনীত ইম্পিচমেন্ট প্রক্রিয়াকে ‘অভ্যুত্থান’ বলে মন্তব্য করেছেন। এক টুইট স্পীকার ন্যান্সি পেলোসিকে তিনি লিখেছেন, ‘নট মাই স্পীকার’। বাইডেন ০৭ই ডিসেম্বর ২০১৫-তে কিয়েভ সফর করেছিলেন। ন্যাশনাল সিকিউরিটি এডভাইসর কলিন কাহল’র ভাষ্যমতে, বাইডেন ঐসময় এক বিলিয়ন ডলার ঋণ মনজুরের শর্ত হিসাবে ইউক্রেনের প্রধান প্রকৌশলীকে অপসারণের শর্ত জুড়ে দেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পিও নিশ্চিত করেছেন যে, জুলাই মাসে ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সাথে কথোপকথন কালে তিনি ট্রাম্পের সাথে ছিলেন। বেশিরভাগ আমেরিকান মনে করেন আবু বকর আল-বাগদাদী’র মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কৃতিত্ব দেয়া উচিত। হোয়াইট হাউস এবং রিপাবলিকানরা সামনের নির্বাচনে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নুতন ট্যাক্স প্যাকেজ দেয়ার প্রস্তাব আনছেন।

@এস. এ. হামিদ 

(Visited 39 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here