অপারেশন ভোলা: সেই পুরানো খেলা

শিতাংশু গুহ

রামু, নাসিরনগর, রংপুর হয়ে ভোলা। একই চিত্র। হিন্দু’র ফেইসবুক আইডি হ্যাক করে নবী ও ইসলামের বিরুদ্ধে কটূক্তি। ফলাফল, উত্তেজিত তৌহিদী জনতার হিন্দু বা বৌদ্ধের বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, আক্রমন, লুটপাট, ধর্ষণ, আগুন জ্বালিয়ে দেয়া বা কখনো-সখনো মৃত্যু, ইত্যাদি। আইডি হ্যাক করে মুসলমান, নবী ও ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটায় মুসলমান, ষড়যন্ত্র করে মৌলবাদীরা; আর আক্রান্ত হয়, বাড়ি পুড়ে হিন্দু’র।

এ পুরানো খেলা। ভোলায় মৌলবাদীরা আর একটি ‘নাসিরনগর’ ঘটাতে চেয়েছিলো। পুলিশের তৎপরতায় পারেনি।  ভোলার ঘটনাটি আগের অন্য ঘটনা থেকে একটু ভিন্ন। আগে পুলিশ জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি। এবার নিয়েছে। পুলিশকে ধন্যবাদ। ২০১২-তে রামু’র পর অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে, প্রধানমন্ত্রী টু-শব্দ করেননি। এবার তিনি কথা বলেছেন। এতে ইতিবাচক ফল হয়েছে, একটি বড় দাঙ্গা এড়ানো গেছে। এজন্যে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।

[আরও পড়ুন: সেদিন ট্রাম দূর্ঘটনা, নাকি দৈন্যদশায় ও বিরহ দুঃখে জর্জরিত হয়ে আত্মহত্যা, তা আজও রহস্য]

ভোলায় পুলিশ গুলি করেছে। পুলিশের উপায় ছিলোনা? তারপরও পুলিশ বিবৃতি দিয়ে দু:খ ও সমবেদনা প্রকাশ করেছে। পুলিশের গুলিতে ৪জন নিহত হয়েছেন। কোন মৃত্যুই কাম্য নয়। ঘটনার সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার। যাঁরা হ্যাক করেছে, যারা অপপ্রচার চালিয়েছে, যারা ষড়যন্ত্র করেছে, তাঁরা কেউ মরেনি। অথচ তাঁদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে বেঘোরে প্রাণ দিয়েছে অন্যরা। ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির জন্যে যাঁরা দায়ী তাদের বিচার হওয়া দরকার।

আগের কোন ঘটনার বিচার হয়নি, হলে ভোলায় অযথা প্রাণহানি এড়ানো যেতো। বিপ্লব কুমার শম্ভূ (শুভ)’র আইডি হ্যাক করেছে মোহাম্মদ শরীফ ও মোহাম্মদ ঈমান। পুলিশ বলেছে, শুভ’র আইডি হ্যাক হয়েছে, শুভ জিডি করেছে, তবু পুলিশ শুভ ও দুই হ্যাকারকে আটক করেছে। তারপর কেন এই হামলা, এই অরাজকতা? ভিডিও-তে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে, ‘এবার পুলিশ মারুম’। পুলিশ পিটানো কি এত সোজা?

[আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের শহর কলকাতায় ফিরলেন বিশ্ব বরেণ্য নোবেলজয়ী, উলু,শঙ্খ-ধ্বনিতে মাতল মহানগর]

পুলিশ মাদ্রাসার ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে, সেখানেও আক্রমণ? নিরুপায় হয়ে পুলিশ গুলি করেছে। ভিডিও স্পষ্ট বলছে, পুলিশ আত্মরক্ষায় গুলি করেছে। একজন পুলিশকে বেধড়ক মারা হয়েছে। মূলত  ভোলার ঘটনার পুলিশের কোন দোষ নেই। তৌহিদী জনতা শুভ’র ফাঁসি চাইছিলো। অপরাধী শুভ নয়, শরীফ ও ইমন। তৌহিদী জনতা কি এখন এদের ফাঁসি চাইবেন? যদি না চান, তবে বুঝতে হবে ‘সমস্যা অন্যত্র’।

প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, “একটি হিন্দু ছেলের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ভোলার সেই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। মুসলিম হয়ে কিভাবে মহানবী (সঃ) বিষয়ে খারাপ কথা লিখে অন্যকে ফাঁসায়?” ওহে তৌহিদী জনতা, এ প্রশ্নের কি জবাব আছে, আপনাদের কাছে? আচ্ছা, কারা এই তৌহিদী জনতা? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বা দেশ গঠনে এদের ভূমিকা কি? কেউ কি বলতে পারবেন, এরা এখন পর্যন্ত কোন ভালো কাজটি করেছেন?

এই ‘তৌহিদী’ জনতা এক আজব চীজ? ইসলাম রক্ষায় এদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ইসলাম রক্ষার নামে এদের পূর্বসূরীরা রাজাকার হয়ে হেন অপকর্ম নেই, যা তারা করেনি। আফগানিস্তানে জুম্মার নামাজে বোমা হামলায় বাষট্টি জন মুসলীম মরেছে, এরা আন্দোলন করেনা। ইয়েমেন মুসলমান মারছে সৌদি আরব, এরা চুপচাপ। তুরস্ক কুর্দি মুসলমান মারছে, এরা ঘুমিয়ে আছে? তবে কাশ্মীর নিয়ে এরা সতর্ক প্রহরী? বাংলাদেশের প্রগতিশীল শক্তির বিরুদ্ধে এরা লড়াকু; হিন্দুদের খেদানোর জন্যে এরা মিথ্যা নাটক সাঁজিয়ে এরা জ্বিহাদ করে যাচ্ছে।

তৌহিদী জনতার আক্রোশ ছিল শুভ’র বিরুদ্ধে। কিন্তু অন্য হিন্দুদের বাড়িঘর, মন্দির ভাংচুর বা আগুন দেয়া হলো কেন? তাহলে আক্রোশ কি সব হিন্দু ওপর? কেন ভাই, হিন্দু কি আপনার ‘পাঁকা ধানে মই দিছে?’বাংলাদেশের হিন্দু এমনিতেই তটস্থ, এঁরা নবী বা ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলেনা, আপনার মসজিদ ভাঙ্গতে যায়না, আপনার বাড়ি দখল করেনা, নাবালিকা অপহরণ করেনা, তারপরও কেন হিন্দু’র ওপর এত রাগ? কিছু কিছু ওয়াজ শুনলে অবশ্য রাগের কারণ বোঝা যায়?

পুলিশ হেডকোয়ার্টার বলেছে, বিপ্লব শুভ’র ফেইসবুক হ্যাক হয়েছিলো। প্রধানমন্ত্রী নিজে একই কথা বলেছেন। শুভ নিরপরাধ, তবু তাকে জেলে রাখতে হচ্ছে, কারণ তৌহিদী জনতা তাকে পেলে ‘বারোটা’ বাজিয়ে দেবে? প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন, তাই রক্ষা, নইলে ভোলা আর একটি নাসিরনগর হয়ে যেতো! একটি হিন্দু ছেলের আইডি হ্যাক করে ভোলার ঘটনা সাঁজানো হয়েছে। এটি পরিকল্পিত, উদ্দেশ্যমূলক এবং হেটক্রাইম। যারা এসব করলো, তাদের বিচার হবেনা?

রামু, নন্দীরহাট, অভয়নগর, রংপুরের ঘটনাও তাই ছিলো। ঐসব ঘটনায় কেউ সাঁজা হয়েছে, এমন তথ্য নেই? অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হলে হয়তো ভোলার ঘটনা এড়ানো যেতো? শুভ কি এলাকায় আগের মত বসবাস করতে পারবে? না, পারবে না! তাকে এলাকা অথবা দেশ ছাড়া হতে হবে! তার পরিবার, অথবা এলাকার হিন্দুরা? তারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন, এবং এক সময় মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন। এভাবেই চলছে, কতকাল চলবে কে জানে?

ভোলার ঘটনার প্রেক্ষিতে গুটিকয় মন্তব্য দেখলে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’র চেহারাটা বুঝতে সুবিধা হবে। ক্রিকেটার মেহেদী হাসান মিরাজ লিখেছেন, ;নবীকে গালি দিবে অন্য ধর্মাবলম্বী, মুসলমান হিসাবে সেটা সইবো কিভাবে? ডঃ তুহিন মালিক লিখেছেন, নবীকে নিয়ে ফেসবুকে এক হিন্দু কটূক্তি করায় তার ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন করা জনতার ওপর পুলিশের কিছু হিন্দু সদস্যের নৃশংস হামলা। আহত শতশত লোক। হেফাজত-ই-ইসলামের নেতা আল্লামা বাবুনগরী বলেছেন, ভোলায় নবীপ্রেমিক শহীদদের প্রতি ফোঁটা রক্তের বদলা নেয়া হবে।

এরা সমাজের ওপরে স্তরের মানুষ, এদেরই এ অবস্থা? তবে একেবারে নিরাশ হবার কারণ নেই। একজন আমেনা বেগম ছোটন লিখেছেন, “একে ছাগলামি বলা কি ঠিক হচ্ছে? মুসলমান হিন্দু সেজে পোস্ট দিয়ে অন্যদের উস্কে দিয়ে এরকম ভয়াবহ একটা ক্রাইম করেছে। আমরা ভাবি গ্রামের মানুষ সহজ সরল। ইব্লিশও হার মানবে এদের কাছে, কদিন আগেই বাপ চাচা মিলে নিজের ছেলেকে মেরেছে। এদের কাছে কি আশা করেন?

সামান্য হেরফের বাদে বাংলাদেশের বাহাত্তর বছরের ইতিহাস একই, এই দেশ, এই রাষ্ট্র, এই সংখ্যাগুরু মানুষের কাছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কি খুব একটা কিছু আশা করতে পারে?

(shreyashree)

(Visited 316 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here