সারদা-নারদা কাণ্ডে দীপাবলির মাঝেই ঘোর অমাবস্যা নামতে পারে অনেক হেভিওয়েটের কপালে

শংকর দত্ত

কলকাতা,১০ অক্টোবর : তাহলে ব্যাপারটা ঠিক কী দাঁড়ালো? রাজীব কুমারকে সিবিআই ধরতে পারেনি। সুতরাং সিবিআই ফেল। পুজো শুরুর আগে সিবিআইয়ের দল নিজদেশে ফেরত যাওয়া ইস্তক রাজনীতির নেতা থেকে বাংলার আম-আদমি ভাবতে শুরু করেছিলেন আর কিস্যু হবে না। সব গট-আপ কেস।

না মশাই ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং উল্টোটাই। রাজীব কুমারকে না পেয়ে সিবিআইয়ের কেন্দ্রীয় কর্তারা এতটাই চটেছেন যে এরমধ্যেই একটা কিছু তরফোর করবেনই তাঁরা। আর ঠিক এই কারনেই পুজোর ছুটিতেও তাঁরা বসে নেই। কেন্দ্রীয় সিবিআই কর্তাদের নির্দেশে একের পর পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছে তাঁদের কলকাতার দপ্তর। সূত্রের খবর রাজীব কুমার নাকের ডগায় থাকা সত্ত্বেও তাঁকে খুঁজে না পাওয়াটা এই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ব্যর্থতা।

আর ঠিক সেই কারণেই সারদা কাণ্ডের জাল গোটাতে তারা মরিয়া এইবার। একই সঙ্গে নারদ কাণ্ড নিয়েও তাঁরা যথেষ্ট তৎপর। এবং তাঁরা এতটাই তৎপর যে কালিপুজোর মধ্যেই জালে তুলতে পারেন দুই একটা রুই কাতলা। কেউ কেউ বলছেন, রাজীব কুমারের মতো দাপুটে আইপিএসকে আইনী মার প্যাঁচে ফেলে তারা জালে তুলতে যেমন চাইছেন। একই সঙ্গে নারদ কাণ্ডে ধরা পরে গারদে আটক থাকা আর এক আইপিএস মির্জাকে সঙ্গে নিয়ে যেভাবে মুকুল রায়ের পিছনে উঠেপড়ে লেগেছে তাতে একটা কিছু ঘটতে চলেছে নিশ্চিত।

একই সঙ্গে সদ্য বিজেপিতে যোগ দেওয়া কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ও নারদ কর্তা মাথ্যু স্যামুয়েল এর থেকে সরাসরি রুমালে মুড়ে টাকা নিচ্ছেন সেই ফুটেজ নিয়ে তাঁর ওপরও নজর সিবিআইয়ের। এদিকে কদিন আগেই পুজোর মধ্যেই মাথ্যু নিজেই দাবি তুলেছেন শোভনের গ্রেপ্তারি নিয়ে। একই সঙ্গে মির্জা যে মুকুলের এক নম্বর লোক ছিলেন এবং মুকুলের নির্দেশেই যে তিনি মির্জাকে টাকা দিয়েছেন সেটাও দাবী করেন মাথ্যু। তাই বিজেপির বর্তমান হেভিওয়েট মুকুল রায়ও ফাঁসতে পারেন বলে অনেকের ধারনা। অন্যদিকে শোভনের ভাগ্যেও দীপাবলির অমাবস্যা নামতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

আবার রাজীবকে না পাওয়ার মাঝেই অভিযুক্ত সব পক্ষকে বার্তা দিতে হঠাৎ করেই যেমন মির্জাকে জেরা করতে ডেকে গ্রেপ্তার করে সিবিআই,একই রকম ভাবে রাজ্যের শাসক দলের কোনও হেভিওয়েটকেও তাঁরা এর মধ্যেই আটক করতে পারে বলে সূত্রের খবর। কিন্তু ওই সূত্র সঠিক বা নির্দিষ্ট করে কারোর নাম বলতে রাজি নই। বরং তারা বলছে তৃণমূলের কোনও এক দুটো মাথাকে এর মধ্যেই টানবে তারা। আর নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্যই একই সঙ্গে বিজেপিতে থাকা নেতাদেরও ডাকা হচ্ছে বলে অভিমত ওই সূত্রের। অর্থাৎ সারদা নারিদ বা রোজভ্যালি কাণ্ডে তৃণমূলের কোনও নেতা বা মন্ত্রীকে যেমন তাঁরা ধরতে পারেন,একই সঙ্গে খাঁচায় বন্দী হতে পারেন অধুনা বিজেপির কোনও নেতাও।

তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ দের একাংশ বলছেন মুকুল রায়ের বাড়িতে গিয়ে যতই আগের ঘটনার পুনর্নির্মাণ করুক সিবিআই, মির্জা বা মাথ্যু যতই মুকুলকে কাঠ গোড়ায় তুলুক, দুম করে তাঁকে গ্রেপ্তার করবে না। বরং বার বার মুকুলকে জড়িয়ে তাঁর বাড়িতে যাওয়াটাকে অনেকে আই ওয়াশ বলেই মনে করছেন। কারণ খাতায়-কলমে রাজ্য বিজেপিতে মুকুল রায়ের বিশাল পদ না থাকলেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে তিনি এখানে রাজ্য-সভাপতি দীলিপ ঘোষের সমতুল্য বলেই মনে করেন অনেকে। অন্যদিকে লোকসভা ভোটে দলকে ডিভিডেন্ট এনে দেওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেরও তিনি কাছের হয়ে উঠেছেন।

সেক্ষেত্রে সিবিআই চাইলেও আদৌ তাঁকে গ্রেপ্তার করার সাহস দেখাতে পারবে কি না সেটা প্রশ্নের বিষয়। তবে শোভনকে জেরা করে তেমন বুঝলে গ্রেপ্তার করলেও করতে পারে বলে মনে করছে স্বয়ং তৃণমূলেরই অনেকে। কারণ এই মুহূর্তে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই সন্দিহান অনেকে। তাছাড়া বিজেপিতে আসবার পর ও তিনি এখনো সেই অর্থে বিজেপি র ঘরের লোক হয়ে উঠতে পারেননি বৈশাখী ঝড়েই। তাই মুকুলের ব্যাপারে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা খানিকটা মাথা ঘামালেও শোভনের ব্যাপারে যে তাঁরা কোনোও রকম হস্তক্ষেপ করবে না সেটাও এখন পরিষ্কার।

অন্যদিকে নারদ কান্ডে তৃণমূলের এক মহিলা নেত্রীকে গ্রেপ্তার করে অন্যরকম বার্তা দেওয়া হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে।
একই সঙ্গে সারদা প্রমোটিং এর সঙ্গে যুক্ত এক হেভিওয়েট মন্ত্রীকেও ঘায়েল করা হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।

মাস তিনেক আগে থেকেই কথা চলছিল দুগা পুজো বা দীপাবলির মধ্যেই সারদা তদন্তের চার্জ সিট দেওয়া হতে পারে। সেই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্ভব না হলেও চাপ বাড়বে রাজ্যের শাসক দলের ওপর। অবশ্য রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অন্য একটি মহল বলছেন, এই করে করে ২০২০ জানুয়ারি বা মার্চ অব্দি যেতেও পারে এই তদন্ত। কারণ হিসেব মতো আগামী বছরের রাজ্যে পৌর নির্বাচন। সেক্ষেত্রে অনেক পৌরসভায় নিজেদের হ্যাপাজতে নিতে মরিয়া রাজ্যের শাসক দল। সেটা নিতে তৃনমূল সুপ্রিমো আদৌ ভোট প্রক্রিয়ায় যেতে চান নাকি বহু পৌরসভায় এডমিনিষ্ট্র্তর বসিয়ে নিজেদের কব্জায় রাখতে চায় সেটার ওপরও করতে পারে তদন্তের গতিপ্রকৃতি।

তবে আদতে কী হয়,সেটা সবটাই সময়ের ওপর নির্ভরশীল। এখন কে গ্রেপ্তার হবে,কবে হবে সেটা জানতে অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের। তবে মির্জার মতোই আবার কাউকে জেরায় ডেকে গ্রেপ্তার করে যে তদন্তে ঝাঁকুনি দিতে চাই সিবিআই সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আর রাজীব কুমারের আগাম জানিনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট কী বলে সেটাও নির্ভর করছে অনেকটাই। আর সুপ্রিম কোর্ট রাজীবের আগাম জামিন নাকচ করলে এই বার যে তারা যেন যেন প্রকারেন রাজীবকে জালে তুলবেই সেটা নিয়ে দ্বিমত নেই। আর রাজীব ধরা পড়লেই তদন্ত দ্রূঢ় মাত্রা নেবে এটা বলাই বাহুল্য।

@এস. এ. হামিদ

(Visited 82 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here