ভোটে জেতার জন্য দেড়শো মানুষ খুন করেছে মমতা : বিস্ফোরক মদন

শংকর দত্ত, কলকাতা: গোটা রাজনৈতিক জীবন তাঁর লড়াইয়ের। সামান্য অটো ইউনিয়নের নেতা থেকে উঠে এসে একে বারে রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী। যদিও এই উত্থান যাঁর হাত ধরে,তিনি মমতা বন্দোপাধ্যায়। কাননের মতো তিনি ‘মা’ নামে তাঁর মোবাইল নম্বর সেভ না রাখলেও মমতাকেই জীবনের ধ্রুব সত্য মেনে এসেছেন। কিন্তু মমতার সব লড়াইয়ের সঙ্গী  নেতা সেই মদন মিত্রই আজ বিস্ফোরক তাঁর দল-নেত্রীর বিরুদ্ধে। কি বলেছেন তিনি? “তৃণমূল নির্বাচনে জেতার মরিয়া চেষ্টা করেছে। আর সেটা করতে গিয়ে তারা ১৫০ লোক খুন করেছে। এমনকি নানাভাবে প্রশাসনকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগিয়েছে।”

[আরও পড়ুন: মোদীকে চিঠি, এফআইআর অপর্ণা-সহ বিদ্বজ্জনদের বিরুদ্ধে]

সম্প্রতি এক বেসরকারি অনলাইন টিভি চ্যানেলের স্টিং অপেরাশনে উঠে এসেছে এই রকম নানান চাঞ্চল্যকর বক্তব্য। তিনি ক্যাসুয়াল ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতেই অনেক পেটের কথা বের করে ফেলেন অনেক মিডিয়ার সংবাদ কর্মীর কাছে। যে কথার ফলে তাঁর বাকি রাজনৈতিক জীবনও প্রশ্ন চিহ্নের মুখে পড়তে পারে বলেও অনেকের ধারণা। তাঁর বক্তব্য, পুলিশ প্রশাসনই এখন তৃণমূল দলটা চালাচ্ছে।এমনকি তিনি তাঁর নেত্রীকে নির্দিষ্ট করে বলেন, হেরে যাওয়ার ভয়ে মমতা একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।এমনকি তিনি বলেন, “আমি ভবানীপুরে রামকথা শুরু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে পার্টির বিরোধিতায় তা আর আয়োজন করিনি। আসলে আমার উদ্দেশ্য ছিলো ভগবান রামের ত্যাগের কথা মানুষের মনে তুলে ধরা।

তিনি স্বীকার করে নেন “জয় শ্রীরাম” স্লোগানটি শক্তিশালী হয়ে মমতাকে ভয় দেখিয়েছে, ঠিক এই কারণেই মমতা জয় শ্রীরাম শুনলে দৌড়ে তেড়ে যান। ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি মুসলিম ভোট ব্যাংকের জন্যই জয় শ্রীরাম শুনলে রেগে যান?’ ওই মাধ্যমের সাংবাদিকের এই জাতীয় প্রশ্নের উত্তরে এক প্রকার মজা করেই মদন বলেন, নানা ভোট ব্যাংক নয়,আসলে পাওয়ার ব্যাংক হারানোর ভয়েই উনি দিশেহারা হয়ে যান।

‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাকে জানতে চাইলে তিনি জানান, “এটা তৃণমূলের পাল্টা ক্ষতি করেছে। আসলে বাসে, ট্রামে ফ্রেমে সব জায়গায় মানুষ এত ছবি কারও পছন্দ করেন না।” তাহলে কি মদন মিত্র বিজেপিতে যেতে চাইছেন? বিজেপি সূত্রে খবর,তেমন কোন প্রস্তাব এখনও আসেনি। তাছাড়া উনি প্রস্তাব দিলেই ওনাকে দলে নেওয়া হবে কিনা সেটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই ঠিক করবেন। বিজেপির এক রাজ্য নেতার কথায়, উনি কি কারণে রামকথার আয়োজন করতে চেয়েছেন সেটা উনি নিজেই বলতে পারবেন। ওটা নিয়ে আমাদের মন্তব্য না করাই ভালো। তৃণমূলের এক যুব নেতার কথায়, আসলে মদনদা যদি বলেও থাকেন এই জাতীয় কথা তাহলে দেখতে হবে উনি সজ্ঞানে না অজ্ঞানে বলেছেন। আসলে স্টিং অপারেশন করবার মূল টাইম টা দেখতে হবে। কারণ এমিতেই রাত আটটার পর কোনও দিনই মদন দা সুস্থ থাকেন না। আটটা বাজলেই ‘মদ-অন’ এটা ওনার সম্পর্কে চালু কথা। বিষয় যাইহোক, তোলপাড় যে দলের ভিতরে ভিতরে হচ্ছেই সেটা বুঝতে আর সময় লাগে না।

সমস্ত ঘটনাটিই গোপনে ক্যামেরা বন্দি করেন ওই সাংবাদ মাধ্যমের এক সাংবাদিক। কিন্তু কথার ছলে মদন যে এতো জমে থাকা ক্ষোভের কথা বলে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলবেন সেটা হয়তো স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ভাবেননি। ভানেননি হয়তো বা তিনি নিজেও। কিন্তু এটাই বাস্তবে মদন বলেছেন। অন্তত ভিডিও ফুটেজ তেমনটাই বলছে। তাঁর এই বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ দেখছেন,উপভোগ করছেন এমনকি তারা পক্ষে-বিপক্ষে মতামতও দিচ্ছেন।

রাজনীতির হরেক কিসিমের মধ্যে নেতাদের চরিত্রও অনেক ক্ষেত্রে যেমন বর্ণময় তেমনি ব্যতিক্রমও বটে। আজ যে এই কথা বলে,পরক্ষণেই সুর পাল্টে অন্য গাওনা গায়। আজ যিনি নিজের দলের নেতা বা নেত্রীর পক্ষে জোর সওয়াল করে আখের গোছানোর তালে থাকেন,ক্ষমতার অলিন্দে থাকতে চান আজীবন শুধুই অপরতলা কে তল্লাই বাজি করে।কাল তিনি ল্যাং খেলে আবার উল্টো হয়ে যান,প্রয়োজনে নতুন প্রভাবশালী দলে নাম লেখাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এ দৃশ্য শুধু বাংলাবাসী নয় গোটা দেশবাসীই জানেন।

আর আমাদের পশ্চিমবাংলার রাজনীতি টিকে আছে বর্তমানে এভাবেই। যে মুকুল রায় একসময় তৃণমূলের দুনম্বর নেতা ছিলেন,তিনিই এখন কেন্দ্রীর ক্ষমতাধারী দলের এ রাজ্যে প্রায় নম্বর টু হয়ে উঠেছেন ক্রমেই। আবার এখানকার শাসকদলের এক সময়ের দুই জাঁদরেল নেতা তথা নির্বাচিত সদস্য অর্জুন সিং বা সৌমিত্র খাঁ এরাও এখন বিজেপিতে এসেছেন একাধিক কারণে। এঁরা একটা সময় সকাল থেকে রাত্রি দিদিভাই এর নামে মালা জপতেন, এখন মালা জপেন মোদি ভাইয়ের।

নয় নয় করে চলে গেছেন অনেকেই। ভারতী ঘোষ থেকে শেষতক সব্যসাচী দত্ত। সকলেরই সুর বদল হয়েছে সময়ের ফেরে। একটা সময় এভাবেই অন্যের ঘর ভেঙেছিল তৃনমূলও। এর সাম্প্রতিক ইতিহাসে তীব্র মমতা বিরোধী নেতা হিসাবে পরিচিত মুখ কংগ্রেসের ওমপ্রকাকাশ মিশ্র দলবদলীও সাক্ষী রাখে পালটিবাজির অন্য রেকর্ড। তাই রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু হয় না। নিয়তিই সব ঠিক করে,সময় বলে দেয় কার গতিমুখ কোনদিকে হবে। আর সেই সময়ের দাবি মেনে এইবার তৃণমূলের এক সময়ের হেভিওয়েট নেতা ম্যায় মন্ত্রী মদন মিত্রও পালটি খেতে চাইছে বলে অনেকে মনে করছেন।

(Visited 5,603 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here