এ কলকাতার মধ্যে আছে আর একটা কলকাতা

0
32

শংকর দত্ত, কলকাতা: রাজনীতির কারণে বা ভোট ব্যাংকের জন্য নেতা-নেত্রীরা কী না করতে পারেন। আমরা জানি অনেক হিন্দু মুসলিমদের কাছের হওয়ার জন্য ঈদের সময় মাথায় টুপি না পেলেও রুমাল দিয়ে কেউ বা আবার ঘোমটা নামিয়ে পাঁচ-ওয়াক্ত নামাজ পড়তে থাকেন। মুসলিম ধর্মের সমস্ত রীতিনীতি না জেনেও রোজার সময় কত হিন্দু নেতা বা নেত্রী রোজা ভাঙানোর সময় নিজেই ইফতারের আয়োজন করে থাকেন।

অনেকে হিন্দু হয়েও গরিব মুসলিম রোজাদারদের ছোলা-ফল-মূল বিতরণ করেন। আবার অনেক মুসলিম নেতাও ইদানিং নিজের উদ্যোগেই দুর্গাপুজো বা কালিপুজোর আয়োজন করে থাকেন। অন্য রাজ্যে এই সব নজির কম থাকলেও আমাদের রাজ্যে উদাহরণ ভুরি ভুরি। তবে স্পষ্টতই বোঝা যায়, এইসব বেশিরভাগই ভোট ব্যাংকের কথা মাথায় রেখে।

আরও পড়ুনঃ বারুইপুর টেংরাবেরিয়ায় কুমারী মা হিসাবে পূজিত হয় ৯ বছরের কন্যা

কিন্তু এমন ব্যতিক্রমী ঘটনাও আছে। যেখানে শুধুই নিষ্ঠা ভরে দুর্গাপুজোর আয়োজন করছে মুসলিম ভাইরা। শুধু আয়োজন নয়,প্যান্ডেল থেকে পাড়ায় পাড়ায় চাঁদা সংগ্রহ কিংবা ফল কাটা বা পুজোর জোগাড় সমস্ত কাজেই হিন্দু আয়োজকদের সঙ্গে সামনে সামনে অংশ নিয়ে থাকেন মুসলিম ধর্মের মানুষজন।

আর এই উদাহরণ আমাদের শহরের মধ্যেই। কলকাতার খিদিরপুর চেনেন না, বা নাম জানেন না এমন মানুষ রাজ্যে হাতে গোনা। রাজাবাজার, পার্ক সার্কাস কিংবা কলাবাগান এলাকার মতো এই এলাকাটিও মূলত মুসুলমান অধ্যুষিত। আর এই অঞ্চলের দীর্ঘদিন আয়োজিত হচ্ছে এক সার্বজনীন দুর্গাপুজোর। আর যে আয়োজনের মাথায় রয়েছেন মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন। হিন্দুরা সংখ্যায় কম। তাঁদের ক্ষমতাও কম। তাই তাদের সঙ্গে কোন ছোটবেলা থেকেই মিলে মিশে গিয়ে মা দুর্গার আরাধনায় ব্রতী হন এই অ-হিন্দুরা।

আরও পড়ুনঃ বসিরহাটে হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টিতে লন্ডভন্ড পূজোর প্যান্ডেল

খিদিরপুরের মুন্সিগঞ্জ এলাকায় হিন্দুর সংখ্যা নিতান্তই কম। কিন্তু তাই বলে কি দুর্গাপুজো হবে না! দীর্ঘ ষাট বছর ধরে সমস্ত নিয়ম-কানুন মেনে নিষ্ঠা ভক্তির সঙ্গে এখানে দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তা হিন্দু ভাইদের সঙ্গে মিলে মুসলিমরাই। তাঁরা ঠিক ঈদের সময় যেমন আনন্দ করেন, দুর্গাপুজো তেও সেই আনন্দে মেতে ওঠেন পরিবার পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে। এখানকারই এক বাসিন্দা বছর তিরিশের পারভেজ। তিনি বলেন , জানেন আমরা পুজোর দুমাস আগে থেকেই ভুলে যায় আমি মুসলিম ও হিন্দু এই ব্যাপারটা। হয়তো মসজিদে যায়, নামাজ পড়ি। বাড়িতে আমাদের নিজস্ব ধর্মীয় প্রথা মেনে চলি, কিন্তু রাস্তায় বেরোনোর আগেই মনে পড়ে যায় ডেকোরেটর্স এর টাকা এডভান্স এর কথা, মনে পড়ে যায় মা এর পুজোর ফুল-মালার অর্ডার দেওয়ার কথা।

বছর পাঞ্চান্নর ইনতিয়াজ বলেন, আসলে রাজনীতির লোকেরাই আমাদের মনে হিন্দু-মুসলিম ব্যাপারটা ঢুকিয়ে দেন। আমরা কিন্তু এইসব নিয়ে ভাবি না। পেশায় মাংস বিক্রেতা ফাইয়াজ খান বলেন, আমি কসাইয়ের কাজ করি। আমার পরিবার গোড়া মুসলিম, কিন্তু আমাদের পাড়ার পুজোয় আমি পাক্কা দু-হাজার টাকা চাঁদা দিই প্রতি বছর। আয়োজকদের একজন সন্তোষ মন্ডল বলেন, সত্যিই আমরা ভাবতে পারি না এখানে পুজোটা কিভাবে করি। ওরা না থাকলে তো কবেই পুজোটা বন্ধ হয়ে যেতো। স্থানীয় দীর্ঘ দিনের বাসিন্দা রামমাধব দাস জানান, সম্ভবত গোটা বাংলায় আমাদের এলাকার পুজোটা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের দাবী করতে পারে।

আরও পড়ুনঃ ৩৭০ ধারা রদের পর বন্দি ফারুক, ওমরের সঙ্গে শ্রীনগরে সাক্ষাত এনসি প্রতিনিধিদলের, বাকিদের মুক্তির দাবি

আর এর জন্য আমরা গর্বিত। যেখানে ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই, হিন্দু নারীর সঙ্গে বসে মায়ের বরণ ডালা সাজাচ্ছেন মুসলিম রামনি। যেখানে পুজোর পর বিকাশ নামের ছেলেটি জ্বলন্ত প্রদীপের সলতে থেকে নিজের মঙ্গলের জন্য উত্তাপ নিচ্ছে সাবিরা নামক মেয়েটির হাত থেকে। আবার জুলফিকার পরম যত্নে মহাষ্টমীর ভোগ তুলে দিচ্ছে জুঁইয়ের হাতে।

কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর বাবুমশাই কবিতায় এক জায়গায় বলেছিলেন “এ কলকাতার মধ্যে আছে আর একটা কলকাতা/হেঁটে দেখতে শিখুন”। তিনি কি উদ্দেশে বলেছিলেন সেটা অন্যকথা। তবে খিদিরপুরের এই বারোয়ারী দুর্গাপুজোর আয়োজন সত্যিই বুঝিয়ে দেয় শুধুই আলো-ঝলমল প্যান্ডেল বা থিমের পুজো নয়। মানবিক মেলবন্ধনের জন্য যে উৎসব সূচনা তার পকৃষ্ট উদাহরণই হতে পারে বন্দর অঞ্চলের অনালকিত শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপাহীন এই দুর্গা পুজটি।

MIJANUR

(Visited 11 times, 1 visits today)