ডিজিটাল রেশন কার্ড কি দুর্নীতি কমানোর জন্য, না তার অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে?

সুমন সেনগুপ্ত

আজকে একটা বেড়ানোর গল্প বলা যাক। মাঝে কিছুদিনের জন্য পরিবারের সঙ্গে আমি সিকিম এবং উত্তরবঙ্গের কয়েকটা জায়গায় বেড়াতে যাই। যখন থেকে সিকিমের রঙলিতে আমরা ঢুকি, তবে থেকেই আমাদের সঙ্গে আমাদের বাকি পরিবারের মানুষ এবং বন্ধুবান্ধবদের থেকে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। জুলুক, লুমথাং এই জায়গাগুলোতে যে মানুষেরা থাকেন তাঁদের যে কি কি অসুবিধা হতে পারে সেটা এই বেড়ানোটা না হলে হয়তো বোঝাই যেত না। লুমথাংএর উচ্চতা প্রায় ১৩০০০ ফুট, থাকার জায়গা থেকে জানলা দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব সৌন্দর্য দিনের প্রায় সবসময়েই আকাশ পরিষ্কার থাকলে দৃশ্যমান। ওই অঞ্চলে বাস করেন ১৫টি পরিবার, যাঁদের অনেকের কাছেই মোবাইল ফোন আছে এবং তা বিএসএনএলের। ঘরের একটা অংশে গিয়ে যদি জুলুকে ইলেকট্রিকের লাইন থাকে তাহলেই অন্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব। একদিন আমাদের যাওয়ার কথা কুপুপ লেক এবং প্রায় ভারত চিন সীমান্তের দিকে যেখানে বিশ্বের সর্বোচ্চ আইস হকির মাঠ আছে সেটা দেখতে। যাওয়ার পথে আমাদের গাড়ির চালক বললেন যে গাড়ির ব্রেক কাজ করছে না এবং সেটা সারানোর জন্য বা অন্য কোনও গাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করতে গেলে তাঁকে ফোন করতে হবে। যেহেতু ওই সময়ে জুলুকে ইলেকট্রিসিটি তখন ছিল না, তাই সেই মুহূর্তে কিছুতেই কারুর সঙ্গে যোগাযোগ করা গেল না।

এই কথাগুলো কেন বলছি? যে সময়টাতে দেশের মানুষদের ডিজিটাল বানানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন প্রধানমন্ত্রী  নরেন্দ্র মোদী, যে সময়টাতে গ্যাসের বুকিং করতে মোবাইলকেই মাধ্যম বানাতে বলছেন সরকার, সেই সময়ে কিন্তু জুলুক, লুমথাং এর মানুষজন রান্নার গ্যাস নিয়ে আসেন সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক থেকে যা প্রায় ৮০ কিমি দূরে এবং কোনও ফোনের বুকিং ছাড়াই। এই ১৫ টি পরিবারের হাতে টাকা থাকলেও কিন্তু তাঁরা খাবার খেতে পারেন না যদি না কেউ গ্যাংটক থেকে পয়সা দিয়ে খাবার কিনে আনেন। এই অঞ্চলে কোনও রেশন দোকান নেই, যা আছে ওই গ্যাংটক কিংবা রংলিতে। কেউ অসুস্থ হলেও কিন্তু যোগাযোগের কোনও উপায় নেই।

ফিরে আসছি যখন কালিম্পং মহকুমা দিয়ে তখন চোখে পড়লো একটি পোস্টার। ডিজিটাল রেশন কার্ড সংশোধন বা নতুন করার জন্য আধার কিংবা অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে রেশনকার্ডের সংযোগ করানোর পোস্টার। দেখেই মনে হল একটু অঞ্চলের মানুষদের সঙ্গে কথা বলি, তাঁদের কি মত? ঠিক যা ভেবেছিলাম তাই। যদিও কালিম্পং বাংলার অন্তর্গত, কিন্তু সেখানেও কানেকশনের অবস্থা তথৈবচ। আমার নিজের যেহেতু অন্য একটি কানেকশন, সেটা প্রায় নেই বললেই চলে, ইন্টারনেটের কথা তো ছেড়েই দিলাম। আরও যেটা জানা গেল যে এই অঞ্চলে যে রেশন দোকানগুলো আছে সেখানে যে ই- পিওস মেশিনগুলো আছে সেগুলো জিও কোম্পানির এবং সেগুলো চলে জিও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। অঞ্চলের মানুষজনের বক্তব্য বেশীরভাগ সময়েই কানেকশন না থাকার ফলে মানুষজন দূরদূরান্ত থেকে এসে যথেষ্ট বিপদে পড়েন বরাদ্দ রেশন না পেয়ে এবং এই নিয়ে যথেষ্ট অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে মানুষের মধ্যে।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন যে কোনও সামাজিক প্রকল্পে আধার লাগবে না, তা সত্ত্বেও তাঁর রাজ্যেই বিভিন্ন জায়গায় এই রেশনকার্ড এবং আধারের সংযোগ করানোর জন্য ভোর না হতেই মানুষজন লাইন দিচ্ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাগরিকপঞ্জী এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে আতঙ্ক। কলকাতায় ফেরত আসার পর এই বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে যখন ‘সারা ভারত ফেয়ার প্রাইস শপ ডিলারস অ্যাসসিয়েশনে’র বিশ্বম্ভর বসুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, তিনিও এই বিষয়ে সহমত পোষণ করেন। তিনি সেইসাথে জনান, যদিও আধার দিয়ে রেশনের দুর্নীতি কমানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এই পদ্ধতিতে তো উল্টে বহু মানুষ বাদ পড়ে যাবেন।

বিশ্বম্ভর বসুর কথায়, তাঁদের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠিও লিখেছেন যে- জোর করে এই পিওএস মেশিন বসানো চলবে না। কেন্দ্রীয় সরকার নাকি এখন বলা শুরু করেছেন যে হয় এই বরাদ্দ রেশনের বদলে টাকা নিতে হবে, নয়তো আধার সংযুক্ত করা এই পিওএস মেশিন নিতে হবে। অথচ দুটো পদ্ধতিই ত্রুটিহীন নয়। একটাতে সরাসরি টাকার দুর্নীতি হবে অন্যক্ষেত্রে খাদ্যের দুর্নীতি হবে। এক্ষেত্রে ভিন্ন মত থাকতে পারে- একজনের বরাদ্দ রেশন অন্যজন পাবেন না, কিন্তু ঘটনাচক্রে দেখা গেছে যে আঙুলের ছাপ নকল করেও উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় রেশনে দুর্নীতি চলছে। আধার আসলে দুর্নীতি কমানোর নামে প্রকারান্তরে দুর্নীতিকেই মান্যতা দেওয়া নয় কি?

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যখন এই আধারের কারণে বাদ পড়ে মানুষের মৃত্যুর খবর আসছে, যখন শুধু এই কারনেই ঝাড়খণ্ডে ১১ বছরের সন্তোষী, দুমুঠো ভাতের জন্য মারা গেছে তখন এই পদ্ধতি কি আবার কিছু মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে না? আমরা যারা শহরে থাকি, যাঁদের সেই রকম ভাবে প্রতিদিনকার গ্রাসাচ্ছদনের জন্য রেশন দোকানে যাওয়ার প্রয়োজন হয়না তাঁরা কি সাধারণ মানুষের এই সমস্যাটা বুঝতে পারবো, বা বলা ভালো বুঝতে চাইব?

মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব

লেখক- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুকার ও সমাজকর্মী

@এস. এ. হামিদ

(Visited 104 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here