বাংলাদেশে মূর্তিভাঙা জানান দিচ্ছে, দুর্গাপুজো এসে গেছে!

1
203

শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক: দুর্গাপূজা এসেই গেলো। শারদীয়া দুর্গোৎসব জানান দেয় শরৎকাল এসে গেছে। অথবা শরৎকাল জানান দেয় দুর্গাপূজা এসে গেছে! বাংলাদেশে মুর্ক্তিভাঙ্গা জানান দেয় দুর্গাপূজা এসেছে। বাঙালির সর্ববৃহৎ সার্বজনীন উৎসব দুর্গাপূজা। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “দুর্গাপূজা শুধু হিন্দু’র নয়, মানব জাতির কল্যাণের জন্যে।” বাংলাদেশে পাঁচদিনের পূজায় একদিন ছুটি। এবার সপ্তমী পূজার দিন রংপুরে নির্বাচন। পূজায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আচ্ছা, পূজায় নিরাপত্তা লাগে কেন? আবহমান বাংলায় পুলিশি বেষ্টনীর মধ্যে দুর্গাপূজা কি বঙ্গীয় সংস্কৃতি’র নুতন আঙ্গিক? নাকি বাঙালি সংস্কৃতি এবং অধুনা বাড়বাড়ন্ত মরু সংস্কৃতি’র সংঘাত?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, “পূজামণ্ডপ ও প্রতিমা ভাঙ্গচুরের সব ঘটনা উদ্দেশ্যমূলক, তা নয়। এখানে নেতৃত্ব নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। যেগুলো উদ্দেশ্যমূলক, সেসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। যাতে এসব ঘটনা আর না ঘটে। কিছু কিছু ঘটনা নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে।” ‘ওহ মাই গড’, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কি বুদ্ধিশুদ্ধি হবে কবে? পূজার নেতৃবৃন্দের মধ্যে সমস্যা আছে ঠিকই, কিন্তু এজন্যে হিন্দুরা মুর্ক্তিভাঙ্গে এমন কথা শুধু মন্ত্রীর মুখেই মানায়? মন্ত্রী মহোদয় কি বোঝাতে চাচ্ছেন যে, হিন্দুরা প্রতিমা ভেঙ্গে মুসলমানের ওপর দোষ চাপায়? মন্ত্রীর কথায় দুর্বৃত্ত প্রশ্রয় পাচ্ছেনা তো?

আরও পড়ুন: [সপ্তমীর দিন ভোট কেন্দ্রে নয়, পূজা মন্ডপে যাবো: হিন্দু মহাজোট]

বাংলাদেশে এ বছর ৩১,১০০ পূজা হবে। হিন্দুর সংখ্যা কমলেও পূজার সংখ্যা বাড়ার কারণ কোন্দল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্য মতে, পূজার সার্বিক নিরাপত্তায় এবার সাড়ে তিন লক্ষ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবে। প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু পূজা-মণ্ডপ প্রহরায় পুলিশ লাগে কেন? এমনকি পাকিস্তান আমলেও তো পুলিশ লাগতো না, মণ্ডপে-মণ্ডপে দু’চারজন লাঠিহাতে আনসার পাহারায় থাকতো? বাংলাদেশে আসলে ‘বিদ্যমান চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ বজায় রাখতেই ব্যাপক পুলিশ প্রহরা প্রয়োজন। পুলিশ না থাকলে ‘সম্প্রীতির’ আসল চেহারাটা দেখা যেত!

স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সালে দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর দিন পুরো বাংলাদেশে একযোগে প্রতিমা ভাঙ্গা হয়েছে। প্রতিবছর ভাঙ্গে, ভাঙ্গার এই খেলা চলছে তো চলছেই। কখনো কখনো দুর্বৃত্ত গ্রেফতার হয়েছে, কিন্তু পুলিশ বারবার ‘পাগল’ আখ্যা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে! বাংলাদেশে পাগলরাও যথেষ্ট বুদ্ধিমান, তাঁরা শুধু মন্দির ভাঙ্গে, মুর্ক্তি ভাঙ্গে? এদেরই হয়তো বলে, ‘জাতে পাগল তালে ঠিক’। গত ৪৮ বছরে পাগলরা এভাবে মুর্ক্তি বা মন্দিরভাঙ্গা চালিয়ে যাচ্ছে। আজ পর্যন্ত এ অপরাধে একজনের বিচার হয়নি, কেউ শাস্তি পায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্লীজ, অন্তত একটি দৃষ্টান্ত দেখিয়ে আমাকে মিথ্যা প্রমান করুন!

এবার ২০১৯ এর সেপ্টম্বরের গুটিকয় মুর্ক্তিভাঙ্গার কথা বলি। এ দৃষ্টান্তগুলো ‘সিন্ধুতে বিন্দুমাত্র’, হাজারো ঘটনার মধ্যে মাত্র ক’টি। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে মন্দির ভাঙ্গচুরের চেষ্টাকালে বিল্লাল হোসেন নামে এক দুষ্কৃতিকারীকে জনতা আটক করে পুলিশে দেয়, পুলিশ বলেছি, বিল্লাল পাগল (১৮ সেপ্টেম্বর, ঢাকা ট্রিবিউন)। ঝালকাঠিতে মন্দিরে ঢুকে শিবমুর্ক্তি ভেঙ্গেছে সশস্ত্র দূর্বৃত্ত (২২সেপ্টম্বর, দৈনিক কালেরকন্ঠ)। সোহেল নামে এক যুবক মির্জাপুরে দুর্গাপ্রতিমা ভাঙ্গে, জনতা তাঁকে ধরে পুলিশে  দেয়, পুলিশ বলেছে, ‘সোহেল মানসিক ভারসাম্যহীন’ (১৯সেপ্টেম্বর কালেরকন্ঠ)।

আরও পড়ুন: [হিন্দুরা আর সংখ্যালঘু থাকবে না বাংলাদেশে!]

আরও আছে। পুরাতন সাতক্ষীরার ঘোষ পাড়ায় ১৭ সেপ্টেম্বর দূর্গা প্রতিমা ভাঙ্গা হয়েছে। চট্টগ্রামের বন্দর থানাধীন গোসাইল ডাঙ্গায় মন্দির ভাংচুর ও আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ১৩ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ে কালীমন্দিরের দু’টি প্রতিমার মাথা ভেঙ্গে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্ত। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভবানীপুর মহেষপুর গ্রামে মাওরা বাড়ি মন্দিরের প্রতিমা ভেঙ্গেছে ৬ সেপ্টেম্বর। দুর্বৃত্তরা কালী প্রতিমার মাথা, তিনটি হাত ও আরেকটি প্রতিমার একটি হাত ভেঙ্গে নিয়ে যায়।  গাজীপুরের মনিপুর উত্তরপাড়ার দুর্গা মন্দিরে ০৯ সেপ্টেম্বর রাতে প্রতিমা ভাঙ্গচুর করেছে সন্ত্রাসীরা। ৩০ আগষ্ট শুক্রবার রাতে কুড়িগ্রামের সিন্দুরমতী মন্দিরে মুর্তি ভাংচুর করেছে দূর্বৃত্ত। পাশের শিব ও কালি মন্দিরের বারান্দার দেয়াল ভেঙ্গে ফেলেছে। সিন্দুরমতী পুকুরের মূল ফটকে অবস্থিত পাথর দিয়ে তৈরি মহাদেব মূর্তি ভাংচুর করতে পারেনি তবে সাপের মাথা ভেঙ্গে ফেলেছে। দিনাজপুরের বোঁচাগঞ্জের ‘করই দূর্গা মন্দির’-এ দুর্গামুর্ক্তি ভাঙ্গা হয়েছে।

আর কত দৃষ্টান্ত দেবো? দিয়ে লাভ কি, প্রশাসন তো এসব দেখে না, গত ৪৮ বছর দেখেনি? এটাই সম্প্রীতি, সম্প্রীতির বাংলাদেশ! মুর্ক্তিভাঙ্গাই বুঝি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি? আমার ধর্ম আমার। আমরা মুর্ক্তিপূজা করবো না পাথরে মাথা ঠেকাবো তাতে অন্যের কি? তোমার অনুভূতিতে আঘাত লাগে, আমাদের বুঝি অনুভূতি নাই? তুমি আমার মুর্ক্তি ভাঙ্গতে পারো, আমার বিশ্বাস ভাঙ্গবে কি করে? ফ্রান্সে মসজিদে হামলার পর দেশের মানুষ হিজাব পরে রাস্তায় নেমে মুসলমানদের সন্মান জানিয়েছিল। কলকাতায় গরু খেয়ে হিন্দুরা মুসলমানদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অরল্যান্ড কতকিছুই না করলেন? বাংলাদেশে কি এমনটা আশা করা যায়? প্রগতিশীল দাবিদার ভাইয়েরা, আপনাদের ঘুম ভাঙবে কবে? সদ্য সৈয়দা সেলিমা আক্তার লিখেছেন, “ওরা প্রতিমা নয়, আসলে হিন্দুদের মন ভেঙ্গে দিতে চায়।” ([email protected])

@মনোজ 

(Visited 71 times, 1 visits today)