কাঁটাতারের ওপারে ভারতীয় গ্রাম, করিমপুরের চরমেঘনায় ঢুকতে লাগে পরিচয়পত্র

চরমেঘনা গ্রামে তৃণমূল-বিজেপির প্রতীক চিহ্ন আঁকা।

মোকতার হোসেন মন্ডল,করিমপুর: এদেশেরই গ্রাম। অথচ এখানকার মানুষকেই ভোটার কার্ড বা পরিচয়পত্র জমা দিয়ে যেতে হয় গ্রামে। নদিয়ার করিমপুর-১ ব্লকের হোগলবাড়িয়া থানার চরমেঘনা গ্রামে এমনটাই হয়। কাঁটাতারের ওপারে বেশ কিছু ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে গেলেই পাওয়া যাবে এই গ্রাম। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এখানে বহুকাল থেকে মানুষ বাস করে। কিন্তু দেশভাগের পর এই অংশটা বাংলাদেশে পড়ে। কিন্তু স্থানীয় মানুষ ভারতের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখেন। কেননা গ্রামের ওদিকে মেঘনা নদীর পরেই বাংলাদেশের মানুষের বাস। অর্থাৎ চরমেঘনা গ্রামের একদিকে ভারতের কাঁটাতার অন্যদিকে মেঘনা নদী। ফলে মাঝে পড়ে থাকতে হয়েছে এখানকার মানুষকে।

অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী সত্যমী বিশ্বাস এই প্রতিবেদককে বলেন, আমার বাড়ি বাসন্তী। এখানে বিয়ে হয়েছে। কিন্তু কোনও আত্মীয় আসতে গেলে বিএসএফকে পরিচয়পত্র জমা দিয়ে আসতে হয়। আবার আমরা যদি ওখানে না যায় তবে হবে না। এর ফলে অনেক আত্মীয় ঘুরে যায় আবার অনেকে রাগ করে আসেনই না। এখানে কেউ তাই বিয়ে দিতে চাই না।’

এই গ্রামটিতে হিন্দুদেরই বাস। গ্রামবাসী অভিজিৎ মন্ডলে কথায়, এই গ্রামটা বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল আর ওই পাশের জামালপুর ভারতের মধ্যে ছিল। ২০১৫ সালে জামালপুর বাংলাদেশের মধ্যে গিয়েছে। আর আমরা ভারতের মধ্যে তবে সরকারি ভাবে ঘোষণা হওয়ার আগে থেকেই আমাদের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ। কিন্তু এখনও সমস্যা মিটেনি। কাঁটাতারটা মেঘনা নদীর উপর দিয়ে দিতে হবে। দিনে কতবার পরিচয়পত্র দেখিয়ে, খাতায় নাম লিখে সই করে আসা যাওয়া করা যায় বলুন।
অপর এক গ্রামবাসী নিখিল মন্ডল বলেন, এখানে কোনও সুবিধা নেই। রাতে কেউ অসুস্থ হলে খুব সমস্যা। কেননা সন্ধ্যার পরেই বিএসএফ কাঁটাতারের গেট মেরে দেয়। ভারতে বাস করি। কিন্তু করিমপুর বা দেশের সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ হয় না।
বহুদিন থেকে বাস করলেও এখানকার বেশিরভাগ মানুষই হতদরিদ্র। পাকা বাড়ি হাতেগোনা। আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া প্রায় নেই বললেই চলে। নেটওয়ার্ক মেলেনা মোবাইলে।  আশপাশে খেত।
বহু ভারতীয় কৃষক কাঁটাতার ওপারে চাষ করে।

৭০ বছরের রবীন মণ্ডল সখেদে জানালেন, ‘আগে এইসব কাঁটাতার ছিল না। সারাজীবন আমাদের কষ্টে গেল। এখন তো আমরা ভারতের মধ্যে আছি। বহু সমস্যা থাকলেও দেশ পেয়েছি। আগে জামালপুর ভারতের মধ্যে থাকলেও তেমন সুযোগ পায়নি আবার আমরা বাংলাদেশের মধ্যে থেকেও দেশ পায়নি। দুই দিকের কাঁটাতারের মাঝে পড়ে আছি। এই মেঘনা নদী ছাড়া আমাদের দুঃখের কথা কেউ জানে না। তখন দেশ স্বাধীন হল বটে, কিন্তু আমাদের কেউ নিল না! দুইদিকে কাঁটাতার রেখে মাঝে মানুষ রেখে দেশভাগ হয়!

তবে অতীতের সেই কথা মনে করতে চায় না চরমেঘনা। স্থানীয়দের দাবি, এখানে স্কুল, হাসপাতাল করা হোক। আর যত দ্রুত সম্ভব কাঁটাতারটা মেঘনা নদীর দিকে করা হোক। কেননা, ভারতে বাস করেও কাঁটাতারের ওপারে আর কতদিন থাকতে হবে? প্রশ্ন তাঁদের।

অষ্টমশ্রেণির প্রীতম বিশ্বাস শিকারপুরের একটি খ্রিস্টান পরিচালিত স্কুলে পড়ে। কাঁটাতার পেরিয়ে যেতে হয়। তার দাবি, ভারত সরকার আমাদের জন্য একটা হাইস্কুল করে দিক।
ভোট এলে এখানে প্রার্থীদের খুব বেশি দেখা মেলে না। কেউ কেউ একবার দেখা করে দ্রুত বেরিয়ে যান। তবে তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি ও সিপিএম প্রার্থীর পোস্টার।
বিজেপি প্রার্থী জয়প্রকাশ মজুমদার, মাফুজা খাতুন, অজিতা রায় সহ অনেকে বিএসএফ এর অনুমতি নিয়ে গিয়েছিলেন ভারতীয় ভূখণ্ড চরমেঘনায়। তবে পরিচপত্র জমা দিতে হয়েছে। কত গাড়ি ঢুকল, কত লোক এসেছে সব লিপিবদ্ধ করেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সব ঠিকঠাক থাকলে তবেই কাঁটাতারের গেট দিয়ে গ্রামে যেতে ও আসতে দিচ্ছে। এইসব দেখে একজন বললেন, একেই বলে নিজভূমে পরবাসী!
তবে শতকষ্ট আর যন্ত্রণা নিয়ে চরমেঘনা আজ ভোট দিতে যাচ্ছে। যেই জিতুক, ভারতের এই গ্রামটি কি দেশের মূলধারার সঙ্গে মিশতে পারবে? পাবে কি সব রকম নাগরিক সুযোগ? এইসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ভবিষ্যতেই।

bipasha

(Visited 13 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here