আমি টুরিস্ট নই রাজ্যপাল, সংঘাত চরমে

শংকর দত্ত , কলকাতা:   রাজ্যের সঙ্গে আবার সংঘাতে রাজ্যপাল।  শুক্রবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিলিট ও ডিএসসি উপাধী নিয়ে কোর্ট বৈঠক শেষে রাজ্যপালের  তোপ দাগেন রাজ্যের কয়েকজন মন্ত্রীর বিরূদ্ধে। যা দেখে রাজনৈতিক মহলে রীতিমতো শোরগোল পরে আছে। শুরুটা খানিকটা ভালো হলেও এই মুহূর্তে রাজ্য ও রাজ্যপালের সম্পর্ক সত্যিই তিক্ততায় পরিণত হয়েছে। প্রথম দিকে রাজ্যে যোগ দেওয়ার পরই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে দেখতে যাওয়া বা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় দেখে রাজ্যবাসী খানিকটা হলেও আশান্বিত হয়েছিলেন,হয়তো রাজ্য সরকারের সঙ্গে নতুন রাজ্যপালের সম্পর্ক এই মুহূর্তে ততটা খারাপ দিকে যাবে না।

কিন্তু দেখা গেল জগদীশ ধনকর পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যপাল হিসাবে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পর থেকেই বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়ছে না। বিশেষত তিনি যোগ দেওয়া ইস্তক নানা বিষয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে তাঁর সংঘাত লেগেই আছে। আর এ নিয়ে বিশিষ্ট মহলেও তাঁকে নিয়ে হইচই শুরু হয়েছে। বিশেষত মাস খানেক আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে আটকে পড়ায় তিনি তাঁকে উদ্ধার করতে যাওয়া নিয়ে তিনি একমাত্র বিজেপি নানা মহলে সমালোচিত হয়েছেন। যদিও এই সব সমালোচনা ও বিতর্ককে পাত্তা না দিয়েই তিনি তাঁর বক্তব্যের জায়গায় এককাট্টা আছেন, এমনকি তাঁর প্রতিটা সমালোচনার উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন। আর তার প্রমান এদিনও পাওয়া গেলো যাদবপুর ক্যাম্পাসেই।

এদিন কোর্ট মিটিং থেকে বেরোনোর পরই সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে ধরে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন। যে প্রশ্নের বেশিরভাগই নানা ইস্যুতে তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূলের আনা অভিযোগ। প্রধান বিষয় হিসাবে এদিন অবধারিত ভাবেই উঠে আসে রাজ্য সরকার আয়োজিত পুজো কার্নিভাল নিয়ে তাঁর অভিযোগের পাল্টা হিসাবে রাজ্যের এক মন্ত্রীর মন্তব্য। যিনি বলেছিলেন, আসলে উনি তো কার্নিভ্যালে পর্যটক(টুরিস্ট) হিসাবে এসেছিলেন। এর উত্তরে এদিন ধনকর জানান, ‘মনে রাখতে হবে আমি রাজ্যপাল হিসাবে গিয়েছিলাম,টুরিস্ট হিসাবে নয়।’

অন্যদিকে তাঁর নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগ নিয়ে রাজ্যের প্রবীণ মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমাতেই সমালোচনা করে বলেন, ‘রাজ্যকে ওভারটেক করে উনি কেন্দ্রের দ্বারস্থ হয়েছেন। গত পঞ্চাশ বছরে কোনও রাজ্যপালকে নিরাপত্তার অভাবে ভুগতে হয়েছে বলে শুনিনি।’ এর পাল্টা হিসাবে এদিন নরম হয়েই তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমার নিরাপত্তা নিয়ে না জেনে মন্তব্য করেছেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। একজন মন্ত্রী হয়ে তিনি কী ভাবে এমন মন্তব্য করতে পারলেন জানি না!’

রেড রোডে রাজ্য সরকার আয়োজিত পুজো কার্নিভ্যালে তাঁকে অসম্মান করা হয়েছে বা তাঁর বিরুদ্ধে সেন্সর করা হয়েছিলো বলে কদিন আগেই ক্ষোভ প্রকাশ তিনি। তাঁর জবাবে রাজ্যের তরফে মন্ত্রী তাপস রায় বলেছিলেন, ‘আসলে উনি একজন প্রচার সর্বস্ব রাজ্যপাল। প্রচারে থাকার জন্যই এই সব কথা বলেন।’ এমনকি তৃণমূল এর মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যকে প্রায় পাত্তা না দিয়েই জনান, ‘রাজ্যপাল বলছে ওনাকে বলতে দিন। আর তিনি কিছু বললেই কি তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে হবে নাকি?’ এর আগে অন্য একটি বিষয়েও তিনি লক্ষণ রেখা অতিক্রম করছেন বলে অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের তরফে।

এইসব কিছুর বিরুদ্ধেই তিনি কারোর নাম না করেই আজ সোজাসাপ্টা জবাব দিয়ে রাজ্যপাল বলেন, ‘ আমি লক্ষনরেখা অতিক্রম করি না। ‘ রাজ্যের নেতা-মন্ত্রীদের কাছে এই ধরনের মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এদিন তিনি বেশ জোরের সঙ্গেই জানান, ‘ কেউ কেউ আমাকে টুরিস্ট বলেছেন।  একজন সাংবিধানিক প্রধান কিভাবে টুরিস্ট হতে পারেন? ‘ তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেই এদিন বুঝিয়ে দেন , ‘আমি সাংবিধানিক কর্তব্য পালনে বাধ্য। আর সে জন্য মানুষের সঙ্গে কথা বলাটাও জরুরি।’ এদিন সাংবাদমাধ্যকেও একহাত নিয়ে রাজ্যপালের অভিযোগ, ‘আমি বৈঠক ডাকলে সরকার পক্ষের কেউ আসে না। অথচ বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিরা তাতে অংশ নেয়। এই উপেক্ষা একেবারেই কাম্য নয়। মিডিয়া কি এই সব বিষয়কে সমর্থন করেন?’

মোটমাট এ রাজ্যে যাত্রা শুরুটা প্রাথমিক ভাবে ভালো হলেও এই মুহূর্তে রাজ্য সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তিক্ততায় ভরা। যেটা তাঁর পূর্বসূরী কেশরিনাথ ত্রিপাঠীর শেষ দিন পর্যন্ত ছিলো। যদিও বিজেপির রাজ্য সভাপতি সহ অন্যান্য অনেক প্রথম সারির নেতারাই রাজ্যপালের বক্তব্যের সঙ্গে সব ক্ষেত্রেই সহমত পোষণ করেছেন।

(shreyashree)

(Visited 29 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here