হিন্দুরা আর সংখ্যালঘু থাকবে না বাংলাদেশে!

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক | September 9, 2019 | 8:45 pm
বাংলাদেশের হিন্দুরা।

শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক: প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নিজেদের সংখ্যালঘু ভাববেন না। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে গণভবনে প্রায় ছয় হাজার হিন্দু’র সমাবেশে বুধবার ৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০১৯ তিনি একথা বলেন। একই দিন ঢাকার দৈনিক ভোরের কাগজ প্রথম পাতায় বিশাল হেডিং করেছে, ‘দুর্গাপূজায় আনন্দ থাকছে না হিন্দুদের’। পত্রিকাটি পূজার সময় রংপুরে ভোট, বুয়েট ও মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা, ইত্যাদি প্রসঙ্গ টেনে দুই হিন্দু নেতার উদৃতি দিয়ে বলেছে, এসব পাকিস্তানী মানসিকতা পরিহার করা দরকার। সেদিন দিবাগত রাতে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা কবিরপুর সার্বজনীন দূর্গা মন্দিরের মুর্ক্তি ভাঙ্গে দুর্বৃত্তরা। এ লেখাটি লিখতে লিখতে খবর এলো হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার দত্তগ্রামে কে বা কারা দূর্গামূর্তি ভাংচুর করেছে। আরো জানলাম, দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ-এ করই সার্বজনীন দূর্গা মন্দিরে প্রতিমা ভাংচুর করেছে  দুর্বৃত্ত। ঠাট্টা করে একজন লিখেছেন, মুর্ক্তিভাঙ্গা জানান দিচ্ছে দুর্গাপূজা আসছে।

বাংলাদেশে হিন্দুদের মন্দিরে প্রতিমা ভাঙার ছবি।

বাংলাদেশে পূজা এলে মুর্ক্তি ভাঙ্গে এটি নুতন কিছু নয়। সবার এতে গা-সহা হয়ে গেছে। পাকিস্তান আমলে হরদম ভেঙ্গেছে, দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে অষ্টমী পূজার দিন সারাদেশে একযোগে প্রতিমা ভাঙ্গা হয়েছে। ভারতের রামমন্দির-বাবরিমসজিদ উপাখ্যানে বাংলাদেশে মন্দির-মুর্ক্তি ভেঙ্গেছে, নির্বাচনের আগে-পরে ভেঙ্গেছে, রামু, নাসিরনগর, রংপুর, সাতক্ষীরা ঘটনায় ভেঙ্গেছে। ভাঙ্গছে তো ভাঙ্গছেই। ভাঙ্গনের এই মহোৎসব চলছে, হয়তো চলবে যতদিন হিন্দুশূন্য নাহবে? এটি থামার কোন লক্ষণ নেই? থামার কোন কারণও নেই? কারণ, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আজ পর্যন্ত মন্দির-মুর্ক্তি-প্যাগোডা-চার্চ ভাঙ্গায় কারো বিচার হয়নি, কেউ শাস্তি পায়নি। কখনো কখনো দুর্বৃত্ত গ্রেফতার হয় বটে, কিন্তু পুলিশ পাগল সার্টিফিকেট দিয়ে ছেড়ে দেয়! অর্থাৎ বাংলাদেশে শুধু পাগলরা অন্য ধর্মের মন্দির বা মুর্ক্তি ভাঙ্গে?

বঙ্গবন্ধু কন্যা হিন্দুদের নিজেদের সংখ্যালঘু না ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন। ঠিক আছে, আমরা ভাববো না, কিন্তু বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে গেলো কবে এবং কেন? ১৯৭২ সালে তো আমরা সংখ্যালঘু ছিলাম না! বস্তুত: ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু’র ঐতিহাসিক ভাষণের পর সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে এক বিপ্লব ঘটে, পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক মানুষগুলো রাতারাতি বাঙ্গালী এবং অসাম্প্রদায়িক হয়ে যায়? তারপর মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, একটি গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান এবং ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ। তবুও টুকটাক ঘটনা ছিলো, খৃষ্টান ইউসি ডুগারের সুন্দরী কন্যা অপহরণ, শত্রূ বা অর্পিত সম্পত্তি আইন ইত্যাদি ছিলো। এরপর জাসদের জন্ম। পরাজিত ও সাম্প্রদায়িক শক্তি জাসদে ভীড় জমায়, শক্তিশালী হয় জাতীয় সমাজতাত্রিক দল (জাসদ)।

বাংলাদেশের হিন্দু জন জোয়ার।

১৯৭০’র নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ভোট পেয়েছে ৩৯.২%। এরমধ্যে প্রায় অর্ধেক ছিলো হিন্দু ভোট, কারণ হিন্দুরা ১০০% আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। হিসাবটা একেবারে পোক্ত তা বলছি না, তবে এ রকম: সেবার পাকিস্তানের মোট ভোটার ছিলো ৫৬,৯৪১,৫০০। তন্মধ্যে পূর্ব-পাকিস্তানে ৩১.২১১,২২০ এবং পশ্চিম-পাকিস্তানে ২৫,৭৩০,২৮০। ভোট পড়েছিল ৬৩%। অর্থাৎ পূর্ব-পাকিস্তানে ভোট দিয়েছিলো আনুমানিক ১৯,৬৬৩,০৬৯ (৬৩x৩১,২১১,২২০/১০০=১৯,৬৬৩,০৬৯) ভোটার। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছিলো ১২,৯৩৭,১৬২ ভোট। আসন না পেলেও আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ভোট পড়েছিলো ৬,৭২৫,৯০৭ (১৯,৬৬৩,০৬৯-১২,৯৩৭,১৬২= ৬,৭২৫,৯০৭)।  

৬৭ লক্ষের উপর ভোট, এই ভোটগুলো কাদের? ভুট্টো’র পিপিপি বা পাকিস্তান পিপলস পার্টির পূর্ব-বাংলায় ভোট পাওয়ার কোন কারন ছিলোনা, এই ভোটগুলো ছিলো মুসলিম লীগ এবং জামাত ও অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর। পাকিস্তানের ৩০০ আসনে ৮১টি সিট্ পেয়েছিলো পিপিপি এবং তারা ভোট পায় ১৮.৬%। তিনভাগে বিভক্ত মুসলিম লীগ পায় ১৩.৮% এবং ইসলামী দলগুলো ১৩.৯%। হিসাবটা পুরো পাকিস্তানের হলেও মুসলিম লীগ এবং ইসলামী দলগুলোর শক্তি স্বাধীন বাংলাদেশে একেবারে কম ছিলোনা। এরা পরাজিত হলেও সক্রিয় ছিলো, যা টের পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর। সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় পঞ্চম সংশোধনী বা ‘বিসমিল্লাহির রহমানের রাহিম’। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ রূপ নেয় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে। আরো পরে ১৯৮৮ সালে আসে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এর পরেও কি হিন্দু’র সংখ্যালঘু না হয়ে উপায় আছে?

বাংলাদেশে হিন্দুদের আক্রমনের প্রতিবাদে।

এ সময়কার বাংলাদেশ এতটাই উদার যে, সংবিধানের ললাট থেকে ৫ম ও ৮ম সংশোধনী উঠিয়ে নেয়ার কথা কেউ ভাবতেই পারেন না? সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এসেছিলো, আদালতের রায় পক্ষে ছিলো, তবু অষ্টম সংশোধনী বাতিল হয়নি। এখন আমাদের সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানের রাহিম’ আছে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আছে, এবং ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। বঙ্গবন্ধু আমলে শুধু ধর্মনিরপেক্ষতা ছিলো, তাই তখন সংখ্যালঘু ছিলোনা। ৫ম ও ৮ম সংশোধনী থাকলে সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু থাকবে। বাস্তবতা হচ্ছে, রাষ্ট্র একটি ধর্মকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এ জন্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আছে, অন্যদের আছে ট্রাষ্ট। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটে ইসলামের খেদমতে আছে ১০০৯কোটি, আর বাদবাকি সবার  জন্যে ৬৫কোটি টাকা। এরপর সংখ্যালঘু থাকেনা কি করে?

সংখ্যালঘু হয়ে বেঁচে থাকতে কে চায়? হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান বা আদিবাসী, উপজাতিরা কেউ সংখ্যালঘু হতে চায়নি, রাষ্ট্র তাঁদের সংখ্যালঘু বানিয়েছে। সংখ্যালঘুর গ্লানি থেকে মুক্তির উপায় সংখ্যালঘু’র হাতে নেই, এর দায় সংখ্যাগুরুর। সংসদে এখন আওয়ামী লীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ট, দল চাইলে এক মিনিটে দেশে আর সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু বিভাজন থাকবে না? এই বিভাজন রেখে আমরা বাঙ্গালী হতে পারবো না, বড়জোর বাঙ্গালী হিন্দু বা বাঙ্গালী মুসলমান হতে পারবো। তবু বঙ্গবন্ধু কন্যা যখন বলেছেন, আসুন আমরা, নিজেদের আর সংখ্যালঘু পরিচয় না দিয়ে সংখ্যাগুরু মুসলমানের মত নিজেদের হিন্দু, বৌদ্ধ বা খৃষ্টান হিসাবে পরিচয় দেই। বাঙ্গালী না হয় আরো পরে হবো? আপাতত: সবাই মিলে গান গাই, ‘একদিন বাঙ্গালী ছিলাম রে–’। # [email protected];                                                                                                                           (মনোজ)

 

ক্লিক করুন এখানে, আর চটপট দেখে নিন ৪ মিনিটে ২৪টি টাটকা খবরের আপডেট