‘’দিস ইজ দ্যা ব্রেড অব ইন্ডিয়া”…বিপ্লবীর প্রয়াণে আজও অটুট গেরিলার ভারতপ্রেম

স্বর্ণার্ক ঘোষঃ  আজ থেকে প্রায় ৩৬ বছর আগের কথা। ১৯৮৩ সাল, জরুরি অবস্থা থেকে বেরিয়ে ভারতীয় অর্থনীতি সদ্য অক্সিজেন নিতে শুরু করেছে। ধুকছে মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবি ও ছাত্রসমাজ। সে বছরই ২৫ শে জুন ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ক্যারিবিয়ানদের হারিয়ে ‘ওয়ার্ল্ড কাপ’ ছিনিয়ে নিয়েছিল গাভাস্কার-অমরনাথরা। কপিল দেবের ছেলেদের সেই ঐতিহাসিক জয় বিপ্লবের সূচনা করেছিল  ভারতীয় ক্রিকেটের। সুদূর টেমস নদীর তীরে সেই জয়  কিছুটা হলেও প্রাণের জোয়ার এনেছিল দরিদ্র ভারতবাসীর মনে, কিন্তু টেমস থেকে হাজার মাইল দূরে যমুনা নদীর তীরে কোনও দরিদ্র কৃষক পরিবার কিংবা কারখানার কোনও হত দরিদ্র শ্রমিক সেই জয়ে কি নিজের জয় ভেবে তখন হাসতে পেরেছিল? সময়ের প্রেক্ষাপটে তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক থাকলেও সমাজের প্রান্তিক শ্রেনীর মনে কিন্তু সেদিন একটু হলেও আশা জেগেছিল অন্য একটা কারণে। কারণ সেই বছরই গান্ধীর দেশে পা রেখেছিলেন ‘বিপ্লবী গেরিলা’ ফিদেল কাস্ত্রো। ভারতের প্রতি তার প্রেম ও শ্রদ্ধা প্রমানিত হয়েছে একাধিকবার। ছোট্ট একটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে তা তুলে ধরলাম ।

১৯৮৩ সাল, তদকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সভাপতিত্বে দিল্লিতে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলন আয়োজন করেছে ভারত। সেই অনুষ্ঠানে একদিকে যেমন হাজির প্যালেস্টাইনের বিদ্রোহী নেতা ইয়াসের আরাফত তেমনই অন্যদিকে রয়েছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো। সম্মেলনে সবকিছু ঠিকমত চললেও ছন্দপতন হল জর্ডনের রাজা হুসেন বক্তৃতা দিতে ওঠার সময়ই। মঞ্চে বসে থাকা প্যালেস্টাইনের বিদ্রোহী নেতা আরাফত অপমানিত বোধ করে বসলেন। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে সেই সময় জর্ডন-পিএলও’র সম্পর্ক নিয়ে  চলছে বিস্তর টানাপোড়েন। তাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই ঘটনাটিকে তিনি অপমানের চোখে দেখে নির্দেশ দিলেন তিনি তখনই দিল্লি ছেড়ে দেশে ফিরে যাবেন, বেরিয়ে এলেন সভাঘর থেকে। আপৎকালীন সেই পরিস্থিতিতে যথেষ্টই অস্বস্তিতে পড়তে হয় আয়োজক ভারতকে। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন ম্যাডাম গান্ধীও। সেদিনের  ঘটনাটি কিন্তু নজর এড়ায়নি কাস্ত্রোর। আরাফত কে বেরোতে দেখেি সোজা বেরিয়ে আসেন তিনি। পথ আটকে দাঁড়ান আরাফতের। জিজ্ঞেস করেন, ‘’আর ইউ ফ্রেন্ড অব প্রাইম মিনিস্টার ঈন্দিরা গান্ধী অর নট?’’…।। প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে যান আরাফত। এরপর বলেন, ‘’ফ্রেন্ড? আই কন্সিডার ঈন্দিরা গান্ধী ইস মাই সিস্টার অ্যান্ড আই অ্যাম হার ব্রাদার’’।

ফিদেল- ‘’ ইন দ্যাট কেস ইউ শুড ভিহেভ লাইকে ব্রাদার অ্যান্ড স্টে ফর দ্যা সামিট’’।

সেই দিন এভাবেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে লজ্জা ও অসম্মানের হাত থেকেই শুধু বাচাননি তিনি রক্ষা করেছিলেন নয়াদিল্লির কূটনৈতিক স্বার্থও। সেদিনের কথা মনে করলে প্রাক্তণ বিদেশমন্ত্রী নটবর সিং একাধিকবার ফিদেলকে বলেছেন‘’ আ গ্রেট ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’’।

১৯৬০ সাল, মার্কিন আগ্রাসনের হাত থেকে সংগ্রামের  মধ্যে সদ্য স্বাধীনতা পেয়েছে কিউবা। সেই বছরই জাতিপুঞ্জের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে এসেছেন ফিদেল।  কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত ৩৪ বছরে সেই বিপ্লবীকে রুম দিতে অস্বীকার  করে নিউ ইয়র্কের সমস্ত হোটেলিয়ার্সরাই।  হোটেলের রুম না পেয়ে সেই যোদ্ধাকে সেইদিন আশ্রয় নিতে হয়েছিল অ্যাফ্রো-অ্যামেরিকান অধ্যুষিত হার্লেমে। আশ্চর্জের বিষয় শত ব্যাস্ততার মধ্যেঅ সেইদিন ফিদেলের সঙ্গে দেখা করতে  হার্লেমে হাজির হয়েছিলেন জওহরলাল নেহেরু। যার থেকে বার বার ফিদেলের সঙ্গে ভারতের আত্মীয়তার যোগ প্রমানিত হয়েছে।  তিনি যেমন ভালবাসতেন কিউবাকে তেমনই ভালবাসতেন ভারতকেও।

ফিদেলের সারা জীবনই উৎসর্গিত ছিল তাঁর দেশ কিউবা তথা দুনিয়ার তামাম শোষিত, নিপীড়িত মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে। সেটাই যে বিপ্লবী বাম রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য, চলে যাওয়ার আগে সেই কথাটা স্মরণ করিয়ে দিতে ভুলে যাননি তিনি।

বরং বলেছেন আরও ব্যাপক আকারে গণতন্ত্রের প্রসার ঘটাতে, সাধারণ মানুষের অধিকারবোধ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিতে। কিউবা থেকে শ’য়ে শ’য়ে ডাক্তার পাঠিয়েছেন ভেনেজুয়েলা বা বলিভিয়াতে গরিব মানুষের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করতে। শুধু লাতিন আমেরিকায় নয়, আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দেশে, এমনকী ২০০৫-এর ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরে পাকিস্তানেও, কিউবার ডাক্তাররা এসে দুঃস্থ-আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা করে গেছেন।

আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী নীতি এবং চোখরাঙানির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়েছেন সারা জীবন হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের স্নাতক তরুনটি।  মহান বিপ্লবী চে-গুয়েভরার সঙ্গে হাত মিলিয়ে উৎখাত করেছেন মার্কিন পুতুল ব্যাতিস্তা সরকারকে। আমেরিকার দশ জন রাষ্ট্রপতি এসেছেন, চলেও গেছেন। সেই ১৯৬১-র বে-অফ-পিগস আগ্রাসন থেকে পরবর্তী কালের সিআইএ-র হত্যার চক্রান্ত, কোনও কিছুই হারাতে পারেনি ফিদেলকে। ওবামার ডাকে সারা দিয়ে কিউবা-আমেরিকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন দেশের অর্থনীতির স্বার্থে, কিন্তু আমেরিকাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে এর মানে আত্মসমর্পণ নয়, সম্মানজনক সহাবস্থান।

মার্কিন নিষেধাক্কার মুখে কিউবায় চরম খাদ্যাভাব। সেইসময় ভারত কয়েক হাজার টন রুটি পাঠিয়েছিল কিউবায়। আর তার কৃতজ্ঞতায় ফিদেলের  মুখ থেকে বেড়িয়ে এসেছিল একটাই শব্দ ‘’দিস ইজ দ্যা ব্রেড অব ইন্ডিয়া, ডোন্ট ওয়েস্ট ইট মাই ফেলো সিটিজেন’’…।কিউবাবাসীর মনে ভারতপ্রেম জাগিয়ে তুলতে সেদেশে ভারতীয় সিনেমা দেখা বাধ্যতামূলক করা হয় ফিদেলের হাত ধরেই। ভারতের জনগণের প্রতি ফিদেল কাস্ত্রোর ছিল বিশেষ উষ্ণতা, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি ছিল তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

২০১৬ সালের ২৫ শে নভেম্বর দীর্ঘ অসুস্থতার  প্রয়াত হন এই বিপ্লবী জননেতা।   জানা গেছে সে বছরই  এপ্রিলে শেষ বারের মতো  পা রেখেছিলেন হাভানা কনভেনশন সেন্টারে, কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায় ফিদেল  শেষ বারের মতো বলেছিলেন, তাঁর ৯০ বছর বয়স হতে চলেছে, সময় ফুরিয়ে এসেছে, “হয়তো এই শেষ বারের মতোই আমি এই মঞ্চে বক্তৃতা করছি।”

তিনি চলে গেছেন প্রায় তিন বছর।  পিগ-বে থেকে কলোরাডো নদীতে জল গড়িয়েছে অনেক। ভাই রাউলের হাত ধরে কাছাকাছি এসেছে  হাভালা-হোয়াইট হাউস। লেগেছে উদারতার হাওয়া। কিন্তু  দেশ-কালের সীমানা ছাড়িয়ে পুজিবাদী যাতাকলের শোষণে পড়লে মানুষ আজও হয়ত স্মরণ করেন দাঁড়িওয়ালা বিপ্লবীকেই। তাই শুধু কিউবাই নয় গেরিলার ‘সিগারের’ গন্ধে আজও হাসি ফোটে যমুনার তীরে  সেই কৃষক পরিবারটির মনে।

[email protected]

(Visited 53 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here