প্রযুক্তির জালে সবাই

ড. রাজলক্ষ্মী বসু: পুজোর ছুটি মানেই আরও একটা বিষয় বাঙালিদের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে— তা হল বেড়াতে যাওয়া। এই পুজো ভ্রমণের কথা মাথায় আসতেই এবার যেন মনের আনাচে-কানাচে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ মন্দা বাজারেরও অশনিসংকেতটি তার ভ্রূকুঞ্চিত রূপ দেখাচ্ছে। ধরুন আপনি বেড়াতে গেছেন গোয়া, সবান্ধবে বা সপরিবারে, সেখানে কোনও এক ট্যুরিজম সংস্থার, তাও আবার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন, দায়িত্বে সব ভ্রমণ এবং বিনোদন। হঠাৎই সকালে শুনলেন আপনার এমন দায়িত্বের ভার থেকে পলাতক ভ্রমণ সংস্থাটি। ভাবতে বিস্ময় জাগছে। কিন্তু এমনটাই যে হয়েছে। তুর্কি, মিলান থেকে গোয়া — কত শত ভ্রমণপ্রেমী তাদের কালোভ্রমণ মুহূর্তের সাক্ষী হলেন — কেই বা জানে। বিশ্ব মন্দার বাজারে আরও এক অশনিসংকেত ভ্রমণ সংস্থাগুলিরও। যেমন ধরুন, বিশ্বখ্যাতিসম্পন্ন সংস্থা থমাস কুক, ঠিক পুজোর প্রাক্‌কালেই আকস্মিক ইন্দ্রপতন হল।

ইতিহাসের সরণি বেয়ে কত ঐতিহ্যের ভাগীদার সংস্থা, যারা কিনা রবীন্দ্রনাথেরও ভ্রমণসঙ্গী ছিল, তার সাধের ব্যবসাটি গুটিয়ে দিতে বাধ্য হল। জার্মানি, তুর্কি, স্পেন, গ্রিস, সাইপ্রাস থেকে ইজিপ্ট কত মানুষ চাকরি খোয়ালেন, আর ভ্রমণের মধ্যগগনে ভ্রমণপ্রেমিকরা তাদের হোটেলের কক্ষটিও ছাড়তে বাধ্য হল। বাক্স এবং বাক্স বোঝাই স্বপ্ন নিয়ে ভ্রমণপ্রেমী এখন বিভিন্ন দেশেই ভবঘুরের মতন এপাশ-ওপাশ করছেন — বিশ্বব্যাপী প্রায় ছ-লক্ষ ভ্রমণার্থী দেশে ফেরার জন্য বাড়ি ফেরা জন্য চাতক।

থমাস কুক-এর মতন বিশ্বখ্যাতিসম্পন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও ২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণের বোঝায় ভারাক্রান্ত হয়ে শেষমেষ স্তব্ধ হল। যারা কিনা সারা বছরে তিন মিলিয়ন হলিডে প্যাকেজ বিক্রি করতে পারলেই এ ঋণের বোঝা থেকে ছুটি পেত। ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডে প্রায় ৭০০টিরও বেশি ভ্রমণ সংস্থা তার হালখাতা বন্ধ করেছে। দীর্ঘ দু-শতাব্দীর ঐতিহ্যশালী থমাস কুকও তার শেষ রক্ষা করতে পারল না। জিজ্ঞাসা একটাই। কেন? মন্দার বাজারে প্রকোপ কি তাহলে পর্যটন শিল্পেও? পরিসংখ্যা বলছে পর্যটকদের সংখ্যা ফি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাহলে পুরোনো সংস্থার এমন কঙ্কালসার দৃশ্য কেন? উত্তর একটাই পরিবর্তন। মন্দার যুগে অনলাইন পর্যটক সংস্থারই বাড়বাড়ন্ত যেখানে কম ব্যয়ে বেশি মুনাফা। ঝক্কিও নিঃসন্দেহে কম। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কোনও বোঝাপড়া নেই — আছে কেবল ক-টা ওয়েবসাইট আর সাধের মুঠোফোন।

অস্ট্রেলিয়ান-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্কমপিটার এ হেন পরিবর্তনকে বলেছিলেন — ‘ক্রিয়েটিভ ডেসট্রাকশান’। ‘ক্যাপিটালিজম, সোশ্যালিজম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ বইতে তিনি তাই উল্লেখ করেছিলেন এই ক্রিয়েটিভ ডেসট্রাকশানই চাকরি আগ্রাসনের ভূমিকায় আসীন হবে। মানুষের জায়গায় আসবে যন্ত্র। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে শ্রমের সংজ্ঞা বদলাবে — শ্রম পরিবর্তন হবে শিল্পে। পরিবর্তনের এমন স্রোতে জনজীবন ও জীবন তরণী বহমান যে, অচেনাই চিনতে বেশি আগ্রহী আমরা। যা চলছিল তার থেকে নতুনত্বের অভিনন্দন সর্বক্ষেত্রে। প্রযুক্তি জীবনের আনাচে-কানাচে। ফিসফিস করছে প্রতি পদক্ষেপে। ‘অনলাইন জীবন’ যেন সব কিছুকেই টপকে যাচ্ছে। তাই ঠিক থমাস কুকের মতনই হাঁসফাঁস করছে খুচরো শিল্পগুলিও।

‘রিটেল অ্যাপোক্যালিপস’ আরও এক নতুন শব্দ প্রসব প্রযুক্তি কর্তৃক। যার অর্থ ইট-পাথরের দোকানঘরের অবলুপ্তি এবং অনলাইন বাজারের দ্রুত ধাবমানতা। রেকর্ডিং সংস্থা, টেলিভিশন, ভিডিও, স্ক্যানার, হাতঘড়ি — আরও কত কাজ একা মুঠোফোন সামলাচ্ছে। অনুমেয় আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে উল্লিখিত এমন অনেক শিল্পই অবলুপ্ত হবে। শুধু কি তাই বই দোকান, দোকান কর্মচারী, পোস্টমাস্টারও হয়ত আগামী দিনে তার প্রয়োজন হারাবে। নিত্যদিনের যেমন তেল-সাবানের ফর্দই তো হারিয়ে গেছে। আমেরিকায় তাই ‘ঘোস্ট মল’ এক নতুন শব্দ। অনলাইনেই সব সম্ভব। নিত্যদিনের সব প্রয়োজনই যদি প্রযুক্তিই জোগায় তাহলে বছরে একবার ভ্রমণটাই বা কেন বাকি থাকে? তাই তো ঐতিহ্য মাথা নত করে আগন্তুক প্রযুক্তির কাছে। চালকবিহীন গাড়ি যদি বাজারে রমরমিয়ে ওঠে তাহলে মান্ধাতার আমলের, স্টাইলের পর্যটন শিল্পে তো ঐতিহ্য দিয়ে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করতে পারবে না। পারলও না। প্রযুক্তির নব ও পুনর্বণ্টনের যুগসন্ধিক্ষণে আমরা দণ্ডায়মান। পরিবর্তন তো সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল যেদিন সে আগুন আবিষ্কার করল। হয়তো অনেক ঐতিহ্য হারাচ্ছে, হয়ত অচল গাড়ির মত তারা কোনও এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। এও তো সত্যি পরিবর্তনটাও সুবিধার জন্য তার প্রয়োজনের বাজার দখল করছে। পুঁজির বণ্টন এতে অনেকটাই সমহারে হবে।

‘একাই মালিক’ — এ ধারণা হয়ত আগামী দিনে লুপ্তপ্রায় হবে। সেদিকেই গুটি গুটি পায়ে সবাই অগ্রগামী। খুব সহজ করে বললে, একজনই চাকরি দেবে বাকি সবাই শ্রমিক এ ধারণার থেকেও হয়তো নিষ্কৃতি পাবে এই মন্দার মধ্য দিয়েই। এই মন্দার প্রকোপ ও প্রযুক্তির অর্ঘ্য সবাইকেই নিজের মতো করে কাজ করারও সুযোগ করে দিচ্ছে। যে থমাস কুকের উদাহরণ দিয়ে শুরুটা ছিল, তা তো এক রূপক মাত্র। প্রযুক্তির হিড়িকে সবাই বহমান। বাণিজ্য জগত যে তারই দিনের সমানে ও চাহিদার মতো চলতে পারবে। ঐতিহ্য আর প্রয়োজনের টানাপোড়েনে বারে বারে প্রয়োজনই প্রয়োজনীয়।

bipasha

 

(Visited 7 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here