রাজ্যের বেহাল পরিস্থিতি, তবুও গড়িয়াহাট থেকে হাতিবাগান তিল ধারণের জায়গা নেই, বাঙালি মজেছে প্রাক-শারদীয়াতে

0
21

শংকর দত্ত, কলকাতা: খবরের কাগজের পাতায় দেশের অর্থনীতি নিয়ে লম্বা লম্বা বিশ্লেষণ। রাজ্যের অবস্থা ভাঁড়ে মা ভবানী। দান-খয়রাত করেই রাজ্য শেষ। রিজার্ভ ব্যাংকের টাকা তুলে নিচ্ছে কেন্দ্র সরকার। গাড়ি-বাড়ি বিক্রি হচ্ছে না। দেশ ও রাজ্যের পরিস্থিতি একই রকম। এই আলোচনা এখন সর্বত্র। ট্রেনে-বাসে, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে কিংবা মদের টেবিলে। সর্বত্র একটা দিশাহীন অবস্থা। ‘বাজার পুরো ঘেঁটে গেছে, কামাইয়ের অবস্থা খুব খারাপ’ বা ‘বেতন কবে পাবো বোঝা মুশকিল’ কিংবা ‘এইবার তো কোম্পানি আর বোনাসই দিলো না’ ….এই জাতীয় আলোচনার মধ্যেই উঠে আসছে হতাশা, বঞ্চনার করুণ ছবি। তারই মধ্যে মহানগর সেজেছে আলোর রোশনাইয়ে।

আম-বাঙালি মেতে উঠেছেন তার শ্রেষ্ঠ উৎসবে। কোথাও কোনও খামতি নেই, নেই কোনও হতাশা বা না পাওয়ার চিত্র গড়িয়াহাট, হাতিবাগান, কলেজ স্ট্রিট কিংবা ধর্মতলার পুজো শপিংয়ের ভীড় বুঝিয়ে দিচ্ছে বাঙালির কোনও দুঃখ নেই, নেই অভাবের রাত্রিযাপন। বরং দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে হলেই মহানগর জানিয়ে দিচ্ছে, ‘এই বেশ ভালো আছি’ বা ‘এমনি করেই দিন যদি যায় যাক না’ গোছের পরিস্থিতির কথা। সত্যিই তো বাঙালির এই মূল উৎসবে কেনো থাকবে দুঃখের প্রতিচ্ছবি, কেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেশের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের মুখের বলি রেখা গুনবে বঙ্গবাসী। তার চেয়ে পুজোর অনেক আগেই শেষ রূপটান-টা মেরে নিতে চান অনেকেই। শপিং করবার মধ্যেই এই কদিনে কেউ দৌড়াচ্ছেন হেয়ার স্টাইল ঠিক করতে, কেউবা আবার পাড়ার পার্লারে গিয়ে লাইন লাগাচ্ছেন পুজোর আগে নিজের মুখমন্ডলটা একটু ঘষে নিতে। এরই মধ্যে সেলফি, ফেসবুক,ইস্টাগ্রামে নিজেকে আলতোভাবে জানান দেওয়ার লড়াই। মোটমাট তীব্র অভাব, অনটন, অসুস্থ বাবা-মার ওষুধ কেনা, হসপিটাল-ঘর করেও নিজেকে ঠিক রেখেছে বাঙালি।

বাঙালি মেতেছে শারদ উৎসবে। বিশ্বকর্মা পুজো,বুড়ো-রান্না খেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতেই এসে যাবে বিরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিসাহুর মর্দিনী’। মহালয়া। আর মহালয়া মানেই তো মায়ের আগমন, চোদ্দ-গুষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে থেকে মা হাজির হবেন ধরাতলে। ৫ দিনেই দেখে নেবেন এখানকার মানুষের প্রকৃত অবস্থা ঠিক কেমন। আর পাঁচ দিনের এই ঝলকানি, রোশনাই দেখেই তিনি বুঝে যাবেন, দেশে-বিদেশে যেখানে যত বাঙালি আছেন, তাঁরা ভালোই আছেন। তাদের কোনও চাহিদা নেই, নেই কোনও মন-কষ্ট। এ নিয়েই কথা হচ্ছিল ভবানীপুর জগুবাবুর বাজারে আসা দক্ষিণ কলকাতার এক বঙ্গ তনয়ার সঙ্গে। সুমনা, বয়স ২৬। কাজ করেন সল্টলেকের একটি কল সেন্টারে। জানতে চাইলাম, এবার তো দেশের অর্থনীতির হাল খুব খারাপ। পুজোর বাজেটে কোনও কাট-ছাঁট? তাঁর স্পষ্ট উত্তর, ‘না ব্যাপারটা তেমন নয়। দেখুন দেশ জাতি নিয়ে এতো ভাবার সময় নেই। ওটা রাজনীতির লোকেরা বুঝবেন। বছরে এই কটা দিন একটু অন্যরকম ভাবে হিসেব করে রাখি। সারা বছর এ জন্য আলাদা ভাবে টাকা জমায়। তাই বাজেট কাট-ছাটের কোনও প্রশ্নই নেই। মোটমাট এই কদিন যা ইচ্ছে করবো, যেখানে খুশি ঘুরবো। বাড়ির কোনও বাধা নেই।’

শহরের একটি নামী ইভেন্ট গ্রূপের ম্যানেজার কৃষ্ণাশিস। গড়িয়াহাট-এর একটি নামী শপিং মল থেকে বেরোলেন দুই-হাতে দুটি বড় ব্র্যান্ডেড ব্যাগ নিয়ে। পাশে তাঁর হবু স্ত্রী নীহারিকা। বললাম, রাজ্যের হাল তো খুব খারাপ। পুজোর আনন্দে কোনও চাপ পড়বে মনে হয়? বছর ৩২ এর এই যুবকের পাল্টা প্রশ্ন, ‘আচ্ছা আমরা শুনেছি বাংলা মিডিয়ার হালও খুব খারাপ। কাগজে পড়ছি অনেক জায়গায় লোক ছাঁটাইও হচ্ছে। তাঁর মধ্যেও তো আপনি কাজ করছেন, নিশ্চয়ই শপিংও করবেন?’  আমি কি আর বলি, ‘হ্যাঁ কিছুটা দায়িত্ব কর্তব্যও পালন করতে হয়। বলতে পারেন নিয়ম রক্ষা’ গোছের উত্তর দিতে যেতেই ২৭-এর তন্বী নীহারিকা আমার কথা একপ্রকার প্রায় কেড়ে নিয়েই বললেন, ‘দাদা এটাই ভাবুন, সকলেই নিজের মতো চলছেন। আর আমরা যদি টাকা নেই, পয়সা নেই বলে হাহাকার করে ঘরে বসে থাকি,তাহলেও কি দেশের অবস্থা পাল্টাবে? তাছাড়া আমরা কেনাকাটা করছি বলেও তো এত মানুষ করেকম্মে খাচ্ছেন।’ এরপর ওরা আর দাঁড়ালেন না, উবের এসে দাঁড়িয়ে আছে। নমস্কার করে বললেন দাদা আবার দেখা হবে। আমিও বললাম ভালো থাকবেন।

মেট্রো ধরে নামলাম শোভাবাজার। সোজা হাঁটা লাগলাম স্টার থিয়েটারের দিকে। মানে এখন আমার গন্তব্য হাতিবাগান-শ্যামবাজার। এখানের পুজোর বাজারে কেমন ভীড় এটা দেখতেই যাওয়া। প্র্যাকটিক্যালি এই ১০ মিনিটের হাঁটা পথটাই এদিন ফুটপাথ ধরে আসতে সময় লাগলো প্রায় আধঘন্টা। যাঁরা উল্টোদিকে থেকে আসছেন, সকলের হাতেই নামী-অনামি কোম্পানির ব্যাগ। কেউ কেউ ফিরছেন ব্র্যান্ডেড জুতোর বাক্স ব্যাগে ভরে।
শেষমেশ ঢুঁ মারলাম হাতিবাগান। সত্যি বলতে কী সন্ধ্যে ৬টায় তিল ধারণের জায়গা নেই। গোটা বিধান সরণী জুড়ে গাড়ির লাইন। ট্রাফিক পুলিশের ছয়লাপ। বাস চলছে সম্বুক গতিতে। টাউন স্কুলের পাশের রাস্তা জুড়ে মেয়েদের প্রসাধনীর বড় বড় দোকান। ভিড়ে ঠাসাঠাসি। ভিড় জমে আছে ফুটপাথের দোকানগুলিতে আরও বেশি। জামা-কাপড় জুতোর সঙ্গেই ভিড় জমিয়ে অনেকে কিনে নিচ্ছেন ঘরকন্নার জিনিস। বহু ভ্যাবাচ্যাকা পুরুষ রাস্তায় সাইড লাইনে সিগরেট ফুকছেন। নাম করা শাড়ি বা গয়নার দোকানেও জমাটি ভিড়। ভিড় দেখে একদম মনে হবে না বাঙালি ভালো নেই। বরং এই শহরের বেচাকেনার চিত্রই বলে দেয় বাঙলী খুব খুব ভালোই আছে।
কলেজস্ট্রিট মোড়ে এসেও এক চিত্র। ভিড়ের মধ্যেই নামী কোম্পানির পান্ডারা রাস্তায় নেমে এসেছে। বলা যায় প্রায় হাত ধরেই তাঁরা খদ্দের টানতে ব্যস্ত। কেউ আবার আদি ও নকল ‘কানজিলাল’ চেনাতে ব্যস্ত। মোড়ের মাথায় জ্যাম লেগেই আছে। হাওড়া যাওয়ার বাস যাচ্ছে এমন ভাবে, দেখে মনে হবে সামনে কোনও বড় মিছিল যাচ্ছে। অনেকেই আবার বাজারহাট সেরে ঢুকছেন দিলখুসা রেস্টুরেন্টে, কেউ আবার ছেলেমেয়েকে সঙ্গে এনেছেন কফি হাউস দেখাবেন বলে।

ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন অনির্বান চক্রবর্তী। একটি নামকরা শাড়ির বিপনির মধ্যেই আলাপ। আমিও নিজের মতো দরদাম করছি। তিনি বউয়ের জন্য কিনবেন কাঞ্জিভারম। তাঁর স্ত্রীর দিকে তাকিয়েই বুঝলাম বহির্জাগত নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যথা নেই। একের পর একটি শাড়ির পাট ভাঙছেন। কোনোটাই তাঁর পছন্দ হচ্ছে না। কথায় কথায় জানলাম মধ্য পঞ্চাশের অনির্বানবাবু থাকেন ভাটপাড়ায়। বললাম ‘ওখানের পরিস্থিতি তো খুব গরম। টিভিতে দেখি আপনাদের ওখানে শুধুই গন্ডগোল।’ বনেদী এই ব্যবসায়ীর উত্তর, ‘দাদা এই রাজ্যে কোথায় গন্ডগোল নেই বলুন তো। তারমধ্যেই নিজেকে সেফ রেখে ব্যবসা করতে হবে। কামাই তো দরকার। যে বাজার বুঝতেই তো পারছেন। দিনকে দিন খরচ যে হারে বাড়ছে?’ জানতে চাইলাম, ‘ওখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুজোর বাজারে কোনও প্রভাব ফেলছে না?’ তিনি বললেন, ‘দেখুন এইসব চলতেই থাকবে সারা বছর। কিন্তু পুজো তো বছরে একবারই আসবে দাদা। এই কটা দিন পরিবারের লোকজনকে একটু খুশি রেখেই চলতে চেষ্টা করি। নিজেরও ভালোই লাগে। ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে কাটাই।’
চারদিকে চরকিপাক মেরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে পুজোর গন্ধ মেখে বাড়ি ফিরলাম। রাতে একান্তে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ভাবলাম, সত্যিই তো এটাই জীবন। মনে পড়লো সেই গানটা…”আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহ দহন মাঝে…”। মনে হলো মন্দ কী, এভাবেই সব ভুলে বেঁচে থাক বাঙালি তার নিজস্বতা নিয়েই।

sweta

(Visited 4 times, 1 visits today)