দিদির মদতেই টলিউডে সিন্ডিকেট রাজ….. চলচ্চিত্র উৎসবের মধ্যেই বিস্ফোরক পরিচালক মিলন

গোটা শহরে যখন আলোর ঝলকানি। যখন বলিউড বাদশা শাহরুখ খান, রাখি গুলজারের মতো মানুষরা এসে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে এসে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করছেন। যখন কলকাতা সন্নিহিত সিনেমা-প্রিয় মানুষেরা এক প্রকার উৎসব-ফোবিয়ায় ভুগছেন। তেমনই দিনে বলা যায় চলচ্চিত্র উৎসব শেষ হওয়ার আগেই বোমা ফাটালেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের পুরস্কারপ্রাপ্ত এক প্রতিষ্ঠিত প্রবীণ চিত্র-পরিচালক। তিনি মিলন ভৌমিক। ইদানিং বিজেপি পন্থী বুদ্ধিজীবী বললেও অত্যুক্তি হয় না। তাঁর সঙ্গে কথা বললেন শংকর দত্ত।

যুগশঙ্খ: কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গিয়েছিলেন ? নতুন সিনেমা কি দেখলেন ?

মিলন: শুনুন এই যে ফেস্টিভ্যাল এখন হচ্ছে, সবটাই লোক দেখানো। কিছু মানুষকে খুশি রাখতে গিয়ে সরকার আম জনতার পয়সা নষ্ট করছে। তাছাড়া কেন যাব বলুন তো? এখানে আমাদের কোনও সম্মান আছে, আমাদের একটা আমন্ত্রণ কার্ড অবধি পাঠায় না। আর এরা এই সব শিখবেই বা কি করে। মাথায় কারা বসে আছে ভাবতে হবে তো? মুশকিল হল বলতে খারাপ লাগে যিনি এখন ফেস্টিভ্যাল কমিটির চেয়ারম্যান সেই রাজ চক্রবর্তীই এক সময় আমার সিনেমায় জুনিয়র আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করেছেন। এরা অতীত ভুলে যান।

যুগশঙ্খ: কিন্তু আপনাকে আমন্ত্রণ করবেই বা কেন? আমি তো প্রকাশ্যে এখন বিজেপি করেন। সরকার বিরোধী কথা বলেন। সব সময় সরকারের সমালোচনা করেন বলে জানি।
মিলন : প্রথম থেকেই এটা কিন্তু হয়নি। বামফ্রন্টের সময়েও আমরা অনেক সম্মান পেতাম। এমনকী এই সরকার আসার পরও প্রথম দিকে এইগুলো ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখলাম শাসক দলের একটা চক্র গোটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিটা দখলে নিতে চাইছে। সরাসরি রাজনীতির কারবারিরা হঠাৎ করেই আমাদের জগতে ঢুকে পড়ল। তারাই সর্বময় কর্তা হয়ে উঠতে থাকল। তখন তাদের কোনও সমালোচনা করা যাবে না। কোনটা ভুল কোনটা ঠিক, এটা বলতে গেলেই আমাদের একঘরে করবার চেষ্টা শুরু হয়। সব কিছুতেই বাধা। বাধ্য হয়ে সাধারণ কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করবার জন্য আমরা অন্য শিবিরে গেছি। তাও সেটা ২০১৪ সালের পরে।

যুগশঙ্খ: তো এখন ইন্ডাস্ট্রির আসল চিত্রটা ঠিক কী? আমাদের কাজ করতে সমস্যাটা ঠিক কোথায় ?

মিলন: আরে ভাই, এখানে সমস্যা কি আর একটা একটা? গোটা টালিগঞ্জ ফিল্ম জগৎ জুড়েই তো সমস্যা। বলতে পারেন, আলোর নীচেই গভীর অন্ধকার । তবে শুনুন, এখানে রেজিস্টার্ড টেলি-শ্রমিক প্রায় পঞ্চাশ হাজার। এরা আলাদা আলাদা গিল্ডের মেম্বার, এদের সবার ওপরে আছে ফেডারেশন। তাছাড়া রয়েছে আরও হাজার ১৫-২০ নন-রেজিস্টার্ড শ্রমিক। এদের পরিবার নিয়ে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যাটা কয়েক লক্ষ। কিন্তু ফেডারেশন এঁদের খোঁজ রাখে না। এদের রুটি-রুজি নিয়ে কেউ ভাবে না। এখন এরা সবাই প্রায় বেকার। না খেয়ে মরছেন এতো মানুষ। এ ছাড়া সিরিয়াল জগতের কতো কর্মী কাজ করেও তাঁদের প্রাপ্য পান না সময়মতো।

যুগশঙ্খ: কিন্তু সমস্যাটা ঠিক কোথায়? কাদের জন্য এই সব চলছে?

মিলন: কেন বিশ্বাস ব্রাদার্স এর নাম জানেন না? গোটা টলিউড তো দুই ভাই মিলে জিম্মা নিয়ে নিয়েছে কোন কালেই। এখন তাঁদের ইচ্ছাতেই লোকে কাজ পায়, তাঁদের বিরুদ্ধে গেলেই কাজ চলে যায়, এমনকী টালিগঞ্জ থেকেও উধাও হয়ে যেতে হতে পারে?

যুগশঙ্খ: মানে ! একটু খুলে বলবেন কি ? এরা কারা ? প্রোডিউসার,নাকি কোনও বিশেষ দাদা ?

মিলন: আরে বোঝার কিছুই নেই। এরা কোনও দাদা নয়, তবে প্রোডিউসারদের বাবার বাবা বলতে পারেন। গোটা দুনিয়া জানে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস আর তাঁর ভাই স্বরূপ বিশ্বাস এখন এই শিল্পটা গিলে খাচ্ছেন। তারা তাদের ফেবারের লোকজনকে নিয়ে কাজ করছে। এমনকি ‘ইমপা’র মতো চলচ্চিত্র মহলের প্রধান সংস্থাটিকে শেষ করে দিয়ে শ্রীকান্ত মোহতার সংস্থাকে দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি কন্ট্রোল করাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। এখন সেই সংস্থায় সবকিছু ঠিক করে। মানে কার সিনেমা কোন হলে চলবে, কত দিন চলবে এই সব। আর এর জন্য ইম্পার প্রাপ্য টাকা দিতে হয় উক্ত সংগঠনকে। বলতে পারেন ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচারস অ্যাসোসিয়েশনকে ‘শিখণ্ডী’ করে এঁরা এখানে একটা প্যারালাল গভর্নেন্স চালাচ্ছে। বলতে পারেন লুটতরাজ , সিন্ডিকেট চলছে এখানে।

যুগশঙ্খ: আপনি সরকার পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে এতো কথা বলছেন, আপনারা সুবিধা করতে না পেরে বিজেপিতে গেছেন। কিন্তু সেই বিজেপিতেও ব্যাপক ধান্দাবাজি চলছে, মানে আপনাদের এই চলচ্চিত্র জগতের মানুষের মধ্যেই। কারো সঙ্গে কারও যোগ নেই। যে দুদিন আসছেন, তিনিই একটা করে নতুন সংস্থা খুলে বসছেন। কে কোন নেতার কত কাছের সেটা বোঝানোর জন্যই শুধু লাফালাফি হচ্ছে? ফিল্মে কায়দা করতে না পেরে আবার সেই বিধানসভায় টিকিট পাওয়ার তাল আর কী !

মিলন: যদি আমার কথা বলেন এটা বলরে পারি, আমার এমন কোনও মোহ নেই। আর আমি যখন বিজেপিতে এসেছি তখন অনেকেই ছিলেন না। আমরা ২০১৪ তে যোগ দেওয়ার পর রীতিমতো প্রতিটা জেলায় জেলায় গিয়ে বিজেপির সদস্য সংগ্রহ অভিযান করেছি। তখনও এখানে বিজেপিকে মানুষ পছন্দ করত না। আজ বিজেপির এই সাফল্যের ভাগিদার সাধারণ কর্মীরা। কিন্তু আজ সত্যিই খারাপ লাগে, আমাদের জগতের অনেকেই এখন বিজেপিতে আসছেন, এসেই তাঁরা মাথায় চড়ে বসছেন। কোথাও একটা ভুল হচ্ছে হয়তো। তবে আমার শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ভরসা আছে। ঠিক সময় তারা সঠিক ডিসিশন নেবেন।

যুগশঙ্খ: তার মানে তো আপনাদের মতো যারা নির্বিবাদী পুরনো মানুষ। যারা এক সময় ভালো কাজ করেছেন, তারা না ঘরকা না ঘাটকা! এগোলেও বিপদ পিচলেও বিপদ আপনাদের।

মিলন: এই রকম ভাবার এখনও সময় আসেনি। প্রথম কথা পিছনে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। অর্থাৎ যায়নি যেটা বলতে চাইছেন যে আমি তৃণমূলে ফিরব কিনা,সেটার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। বরং বিজেপিতে থেকে আরও ভালোভাবে কাজ করব। দরকার হলে সক্রিয় রাজনীতি করব টেকনিশিয়ান দের স্বার্থে, শ্রমিকদের বা জুনিয়র আর্টিস্টদের স্বার্থ নিয়ে। এখানে এখনও আমাদের দল ক্ষমতায় আসেনি, তাই বাধা বিপত্তি এখনও আছে। আগামী দিনে দিলীপদার নেতৃত্বে আমরা ফিল্ম জগতের মানুষকে দিশা দেখতে পারবো এটা আমার বিশ্বাস। আমার টিকিট পাবার লোভ নেই,কিন্তু কাজটা করতে চাই মানুষের স্বার্থে।

যুগশঙ্খ: এতদিন বিজেপিতে এসেছেন বলছেন, শাসক দলের বিরুদ্ধে এত নৈতিকতার কথা বলছেন, এখনও পর্যন্ত একটা পদক্ষেপ নিতে পেরেছেন–যা টেকনিশিয়ানদের স্বার্থে কাজে লাগে বা এই জগতের মানুষের উপকার আসেন এমন কিছু !

মিলন: কে বলল পারিনি। এক মাত্র আমিই টলিপাড়ায় টেককনিশিয়ানদের নিয়ে প্রকৃত কিছু ভাবছি। ইতিমধ্যেই অনেকের কার্ড হয়ে গেছে। তারা যাতে নিয়মিত কাজ করে সময়ে তাদের পারিশ্রমিক পান তার জন্য লড়ছি, ক্যামেরাম্যান থেকে মেক-আপ আর্টিস্ট এদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, মিলন ভৌমিক তাঁদের পাশে বিপদের সময় কিভাবে দাঁড়িয়েছেন। অন্যদিকে ভোট করতে না দিয়ে হুমকি দিয়ে ভোটে দাঁড়াতে না দিয়ে ‘ইমপা’ -কে যেভাবে শাসকদলের লোকজন নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছেন, তার বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করছি। কোর্টে ও আপিল করেছি। এবং আমাদের আশা, মাননীয় বিচারক আমাদের পক্ষে রায়দান করেই এই অবৈধ কমিটিকে বেআইনি ঘোষণা করবেন অচিরেই। আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষমতায় আমরা চেষ্টা করছি, দলও আমাদের পাশে আছে। আশা করি সাফল্য একদিন আসবেই।

যুগশঙ্খ: কিন্তু এতো ঝামেলায় আল্টিমেটলি তো সিনেমা শিল্পেরই ক্ষতি হচ্ছে! এর থেকে মুক্তি কোথায় ? এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ ই বা কি?

মিলন: দেখুন এটা বলতে পারি, এই সব টেকনিশিয়ানরা দলে দলে এখন আমাদের সদস্য হচ্ছেন। ওরা বুঝতে পারছেন বর্তমান সরকার প্রোডাকশন থেকে পাওনা টাকা আদায় করে দিতে পারবে না, ওদের জন্য সরকার কিছুই করবে না। এখন ওদের একটা নিবিড় ছায়া দরকার। তাই আমাদের লক্ষ্য ওদের জাতি দল নির্বিশেষে প্রত্যেকের জন্য সহায়তা সুনিশ্চিত করা। সেটার জন্য বিজেপির দলীয় তৎপরতা ও সাহায্যে আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ রেখে চলছি। আশা করি আগামী দিনে সব ঠিক পথে চলবে।

যুগশঙ্খ: ১৯৮৮ সালে ‘ফিরে পাওয়া’ ছবির প্রোডিউসার হিসাবে আপনার আত্মপ্রকাশ, পরে পরিচালক হিসেবে ‘লহ প্রণাম’ ছবির জন্য আপনি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পান। দিল্লির গ্যাং রেপ কাণ্ড নিয়ে ‘নির্ভয়া’ বানিয়ে অন্য একটা পরিচিতি পান, কিন্তু সেই আপনার তৈরি ছবিই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ওপর ‘১৯৪৬ ক্যালকাটা কিলিংস’ বা দাঙ্গা ছবি মানুষ দেখতেই পেল না। এটা কেন হল ?

মিলন: জানি না কিসের ভয়, কেন এত আতঙ্ক। এ পর্যন্ত আমি ৭০ টা ছবি করেছি। বাংলার বহু বিখ্যাত অভিনেতা অভিনেত্রী আমার ছবিতে বিভিন্ন সময় কাজ করেছেন। অথচ আমার ছবি ই ওরা বন্ধ করে দিল। আসলে স্রোতের বিরুদ্ধে কাজ করাটা এই সরকার কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারে না। আরে ছবি খারাপ না ভালো সেটা তো দর্শক ঠিক করবে। এরা হয়তো আমাকেই ভয় পেয়েছে।

যুগশঙ্খ: শেষ প্রশ্ন আপনি সফল পরিচালক, প্রোডিউসারও বটে। দায়িত্ব সামলেছেন একাধিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদেও। তাহলে আলাদা করে সংগঠন খুলতে গেলেন কেন? এমনিতেই তো আপনাকে অনেকেই ভালোবাসেন শ্রদ্ধা করতেন।

মিলন: হ্যাঁ সারা জীবনে আমি মানুষের ভালোবাসা প্রচুর পেয়েছি। আমার বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীর লোক, দাদু ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাই ছবি করার নেশা যতই থাক, যতই কাজ করতে গিয়ে বাধা থাকুক, সেনা জওয়ান বাবার মতো লড়াইটা চালিয়ে যেতে শিখেছি। আর দাদু স্বাধীনতা সংগ্রামী হওয়ায় সারা জীবন মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করবার পোকাটা ছিলই যেদিন থেকে ইন্ডাস্ট্রিতে নাম লিখিয়েছি। বলতে পারেন এখন এইগুলোই আরও বেশি করে করব। এক জীবনে আমি নিজে যে সম্মান, ভালোবাসা আর অর্থ উপার্জন করেছি সেটা দিয়ে হয়তো বাকি জীবন আমার চলে যাবে। কিন্তু যারা অসহায়, যারা নিপীড়িত তাদের জন্য কথা বলবার মানুষ কোথায়? তাই এখন আমাদের নতুন সংগঠন ‘বঙ্গীয় চলচিত্র সংস্কৃতি সংঘ’ মানুষের জন্য কথা বলছে। বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। শ্রমিকরা যেমন তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক বুঝে পান, তাঁদের যেমন কেউ ঠকাতে না পারেন একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে তাঁদের স্বাস্থ্য বীমা, পরিবার কল্যাণের সুযোগ সুবিধা যাতে তাঁরা পেতে পারেন সে ব্যাপারে আমরা প্রতি মুহূর্তে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শুধু তাই নয়, আগামী দিনে আমরা টালিগঞ্জের তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধেও আন্দোলনে নামতে চলেছি।

bipasha

(Visited 19 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here