‘দশমী’ কথাটির সঙ্গে “বিজয়া” শব্দটি কেন উচ্চারিত হয়! জানেন কি?

0
30

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক, কলকাতা: “দশমী”… না হয় সকলেই বোঝেন। কিন্তু, “বিজয়া” মানেটা কি? “বিজয়া” আর “বিসর্জন” .. বুঝি সমার্থক? কেনই বা “বিসর্জন দশমী” বা শুধু “দশমী” শব্দটি ব্যাবহার না করে “বিজয়া দশমী” বলা হয়?

আজ শুভ বিজয়া দশমী…। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সকলেই নিজেদের প্রিয়জনের সঙ্গে কুশল বিনিময় সুসম্পন্ন করেছেন…। আপনাদের কখনও কি একবারও মনে হয়েছে… দশমী কথাটির সঙ্গে “ বিজয়া ” শব্দটি কেন উচ্চারিত হয়? চার দিনের আরাধনার শেষে আজ তো প্রতিমা নিরঞ্জনের/বিসর্জনের দিন……।। তাহলে তো “বিসর্জন দশমী” বা শুধু “দশমী” শব্দটি ব্যাবহার করাই তো অধিক যুক্তি সঙ্গত ছিল…। তাই না? তাহলে কি “বিজয়া” মানে “বিসর্জন” বুঝি? …

আমরা এই অনুষ্ঠানে কী কী দেখি?… ছোটরা বড়দের প্রনাম করে আশীর্বাদ নিচ্ছে…।। সমবয়সীরা নিজেদের মধ্যে কোলাকুলি করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন…।। সবাই মিষ্টিমুখ করেছেন…।। সধবা মহিলারা সিঁদুর খেলায় মেতেছেন……।। বিসর্জনের আগে অনেকেই আনন্দে নাচেন ……।।…. তাই তো….? আচ্ছা, এবারে একটা কথা ভাবুন দেখি …..। কোথাও এমনটি দেখেছেন, যে কাউকে বিদায় দিতে গেলে লোকে নাচে?…সেখানে তো চোখে জল আসার কথা! … কান্না’র কথা ….।। – কি ঠিক বলছি তো?

এর পিছনেই লুকিয়ে আছে আমাদের “ক্ষাত্রবীর্যে”র পরিচয় বহনকারী এক সুন্দর ইতিহাস ….
আসলে বাস্তবে …. এই “ বিজয়া ” শব্দটি এসেছে… ‘বিজয়’ থেকে…।। দেবী দুর্গা হলেন শক্তি’র দেবী…. তার আরাধনার মূল উদ্দেশ্য – মহাশক্তি লাভ করা। জয় লাভ ও যশ লাভ….। প্রকৃতপক্ষে পুরাকালে আমাদের দেশীয় রাজন্যবর্গ দেবী দুর্গার আরাধনা করতেন শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়লাভের উদ্দেশ্যে। দেবী দুর্গার পূজা শেষ করে এই দিনটিতে পররাজ্য জয় করার উদ্দেশ্যে তারা বীর বিক্রমে ধাবমান হতেন…।। তাই এই দিনটির অপর একটি নাম “সীমানা উল্লঙ্ঘন দিবস”। এমনকি রামচন্দ্রও রাবণকে পরাস্থ করার জন্য শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন… যার রুপ আজকের এই সার্বজনীন দুর্গাপূজায় রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে দেবীর পুজার সময় বসন্তকাল…… রামচন্দ্র অকালে তার বোধন করেছিলেন…… তাই এই পুজাকে “অকাল বোধন”ও বলে…।। সেই সময় কিন্তু জলের মধ্যে প্রতিমা নিরঞ্জনের এই রীতি ছিল না…।

যুদ্ধে রাজা তো আর একা যেতেন না…।। তার সঙ্গে চলত এক বিরাট সৈন্যবাহিনী … অনেক লোক লস্কর… ইত্যাদি। তারা যুদ্ধে যাবেন …… কিন্তু সেখানে তাদের প্রাণ সংশয়য়ের আশঙ্কা সর্বদা…… তাদের মধ্যে কয়জন জীবিত ফিরতে পারবেন…… কেউ জানে না…।। তাই…… যুদ্ধে যাবার আগে…। দেবীর আরধনা করে শক্তি অর্জন ও আশীর্বাদ পাথেয় করে তারা প্রস্তুত হলে…আর এই জীবনে কখনও দেখা হবে কিনা…? এই ভেবে……… তারা বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রনাম করে আশীর্বাদ নিতেন …… শিশুরা তাদের প্রনাম করতো…।। সবাই শেষ বারের জন্য একত্রে কোলাকুলি করে জয়ের শপথ নিতেন…।। আর কখনও তাদের খাওয়ানো যাবে কিনা…? এই ভেবে………পরিবারের লোকেরা মূলত মহিলারা তাদের মিষ্টি মুখ করাতেন…।।

তাঁদের সিঁথির সিঁদুর যেন অক্ষয় থাকে…… সেই উদ্দেশ্যে পরিবারের বিবাহিত স্ত্রীরা দেবীর পায়ে সিঁদুর দিয়ে তা নিজেদের সিঁথিতে ধারন করতেন…।। এই বিষয়টিই আজ মহিলাদের সিঁদুর খেলায় রূপান্তরিত হয়েছে ……।। লক্ষ করলে বুঝতে পারা যায়… এই কারনেই আজো এই অনুষ্ঠানে বিধবা বা কুমারী মেয়েদের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নেই……।।

আর বাকি থাকে উল্লাস পর্ব……যোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করার জন্য রনভেরীর সঙ্গে সমবেত উল্লাস …… যা আজো দশমীর নাচ বলেই পরিচিত এবং ছেলে – মেয়ে – বুড়ো নির্বিশেষে সবাই এতে অংশগ্রহন করে…।। এই বিষয়টি আজো খেলার মাঠে যখন খেলোয়াড়ের দল নামে… তাঁদের উৎসাহ দেবার চিত্রটির সঙ্গে তুলনীয়……নতুবা দেবীকে বিসর্জন দেবার মধ্যে বিষাদ লুকিয়ে থাকে… আনন্দ থাকে না। আর বিষাদে কে আর নাচতে পারে ?

আজ সে রাজাও নেই আর নেই সেই রাজ্য জয়ের উন্মাদনাও …… আর আমরাও হারিয়েছি আমাদের সে যুদ্ধ জয়ের মানসিকতা।…. লড়াই করে ঘাম বা রক্ত কোনটাই আর আজ আমরা ঝরাতে চাই না। তাই … “বিজয়া দশমী” শব্দটির যথাযথ তাৎপর্যও লোকচক্ষুর অন্তরালে অন্তর্হিত হয়েছে…।।

‘দশমী’ কথাটির প্রাসঙ্গিক তাৎপর্য সহজবোধ্য। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথিতে দেবী কৈলাস পাড়ি দেন। সেই কারণেই ‘বিজয়া দশমী’ নাম। কিন্তু এই দশমীকে ‘বিজয়া’ বলা হয় কেন, তার পৌরাণিক ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে একাধিক কাহিনি সামনে আসে।

পুরাণে কথিত আছে, মহিষাসুরের সঙ্গে ৯ দিন ও ৯ রাত্রি যুদ্ধ করার পর দশম দিনে জয় লাভ করেন দেবী দুর্গা। সেই জয়কেই চিহ্নিত করে বিজয়া দশমী। তবে উত্তর ও মধ্য ভারতে এই দিনে যে দশেরা উদযাপিত হয়, তার তাৎপর্য ভিন্ন। শ্রীশ্রীচণ্ডীর কাহিনি অনুসারে, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে দেবী আবির্ভূতা হন, এবং শুক্লা দশমীতে মহিষাসুর-বধ করেন। বিজয়া দশমী সেই বিজয়কেই চিহ্নিত করে। তবে উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই দিনে যে দশেরা উদযাপিত হয়, তার তাৎপর্য অন্য। ‘দশেরা’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘দশহর’ থেকে, যা দশানন রাবণের মৃত্যুকে সূচিত করে।

বাল্মীকি রামায়ণে কথিত আছে যে, আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমী তিথিতেই রাবণ-বধ করেছিলেন রাম। কালিদাসের রঘুবংশ, তুলসীদাসের রামচরিতমানস, কিংবা কেশবদাসের রামচন্দ্রিকা-য় এই সূত্রের সঙ্গে সংযোগ রেখেই বলা হয়েছে, রাবণ-বধের পরে আশ্বিন মাসের ৩০ তম দিনে অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন করেন রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ। রাবণ-বধ ও রামচন্দ্রের এই প্রত্যাবর্তন উপলক্ষেই যথাক্রমে দশেরা ও দীপাবলি পালন করা হয়ে থাকে। আবার মহাভারতে কথিত হয়েছে, দ্বাদশ বৎসর অজ্ঞাতবাসের শেষে আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমীতেই পাণ্ডবরা শমীবৃক্ষে লুক্কায়িত তাঁদের অস্ত্র পুনরুদ্ধার করেন এবং ছদ্মবেশ-মুক্ত হয়ে নিজেদের প্রকৃত পরিচয় ঘোষণা করেন। এই উল্লেখও বিজয়া দশমীর তাৎপর্য বৃদ্ধি করে।

শুভ “বিজয়া দশমী”………………………।

sweta

(Visited 24 times, 1 visits today)