দীপাবলির পরেই চার্জশিট! জালে উঠতে পারে রাঘববোয়াল

শংকর দত্ত, কলকাতা: এবার রোজভ্যালি কাণ্ডে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চিঠি দিল সিবিআই। একই সঙ্গে তলব করা হল অর্থ দপ্তরের এক স্পেশাল অফিকেরকেও। জানা যাচ্ছে, আগামী ১৮ তারিখের মধ্যেই ওই ওএসডি-কে সিবিআই দপ্তরে দেখা করতে বলা হয়েছে। রাজীব কুমারকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় সারদায় আপাতভাবে তদন্তের গতি কমে গেছে মনে করছে যখন রাজ্যের মানুষ। ঠিক তখনই রোজভ্যালি কাণ্ডে তারা তদন্তের গতি জোরালো করল।

সূত্রের খবর, নারদ বা সারদা-রোজভ্যালি কাণ্ডে কালিপুজোর পরেই সিবিআইয়ের জালে পড়তে চলেছেন হেভিওয়েটদের কেউ কেউ। তবে তাঁরা কারা বা কোন দলের এখনই নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। এমনও হতে পারে রাজনীতির বাইরের কোনও ব্যক্তিও গ্রেপ্তার হতে পারেন, যাঁদের অনেকেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এইসব সংস্থার সঙ্গে আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সূত্রটি বলছে, কংগ্রেস নেতা তথা প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরমকে ধরে সিবিআই যে দক্ষতা দেখতে পেরেছিল বা নিজেদের ক্ষমতা প্রমাণ করতে পেরেছিল যতখানি, ঠিক ততখানিই ব্যাকফুটে চলে গেছে রাজীব কুমার ধরতে না পেরে। আর এই কারণেই সিবিআইয়ের কেন্দ্রীয় কর্তারা এখন এ রাজ্যে আর্থিক কেলেঙ্কারির নিয়ে একটা হেস্তনেস্ত করতে চলেছেন কিছুদিনের মধ্যেই।

সরকারিভাবে না হলেও বিভিন্ন মিডিয়া সূত্রে প্রথম দিকে খবর ছিল দীপাবলির আগেই বিশেষত সারদা কাণ্ডের চার্জশিট জমা পরবে। কিন্তু রাজীব কুমারকে ধরতে না পারায় সাময়িকভাবে তা কিছুটা পিছিয়ে গেল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকেই। আর তাই তদন্তে আরও গতি আনতে বা চমক দিতে তারা এখনও চার্জশিট জমা দিতে না পারলেও কালিপুজোর আগেই রাজ্যের কোনও রাঘববোয়ালকে গ্রেপ্তার করে নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে উদগ্রীব বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

বিজেপির দিল্লির একটি বিশেষ সূত্র বলছে, সিবিআই যেভাবে এগোচ্ছে তাতে নভেম্বরের মধ্যেই হয়তো সারদা বা রোজভ্যালি কাণ্ডের চার্জশিট জমা দিতে পারে। আর ঠিক সেই কারণেই একদিকে সারদা কাণ্ডের জাল গোটাতে তারা যেমন মরিয়া। একই সঙ্গে সিবিআই নারদ কাণ্ড নিয়েও যথেষ্ট তৎপর। তাঁরা এতটাই তৎপর যে কালিপুজোর আগে বা পরেই নারদ বা রোজভ্যালি কাণ্ডে জড়িতদের কাউকে কাউকে জালে তুলতে পারেন। কেউ কেউ বলছেন, সারদা কাণ্ডে রাজীব কুমারের মতো দাপুটে আইপিএসকে আইনী মার প্যাঁচে ফেলে তারা গ্রেপ্তারীর ব্যাপারে একটু ধীরে চলো নীতি নিচ্ছে যেমন।

ইতিমধ্যেই রাজীব কুমারের হাই কোর্টের আগাম জামিনের বিরুদ্ধে তারা সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে। সেক্ষেত্রে তারা আশা করছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত এইবার তাদের পক্ষেই রায় দেবেন এবং তখনই রাজীব কুমারকে জালে তুলতে তারা এইবার উঠেপড়ে লাগবে।

তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, মুকুল রায়ের বাড়িতে গিয়ে যতই আগের ঘটনার পুনর্নির্মাণ করুক সিবিআই, মির্জা বা ম্যাথু যতই মুকুলকে কাঠ গোড়ায় তুলুক, দুম করে তাঁকে গ্রেপ্তার করবে না। বরং বারবার মুকুলকে জড়িয়ে তাঁর বাড়িতে যাওয়াটাকে অনেকে আই ওয়াশ বলেই মনে করছেন। কারণ খাতায়-কলমে রাজ্য বিজেপিতে মুকুল রায়ের বিশাল পদ না থাকলেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে তিনি এখানে রাজ্য-সভাপতি দিলীপ ঘোষের প্রতিপক্ষ বলেই মনে করেন অনেকে। অন্যদিকে লোকসভা ভোটে দলকে ডিভিডেন্ট এনে দেওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেরও তিনি কাছের হয়ে উঠেছেন।

সেক্ষেত্রে সিবিআই চাইলেও আদৌ তাঁকে গ্রেপ্তার করার সাহস দেখাতে পারবে কি না সেটা প্রশ্নের বিষয়। তবে নারদ কাণ্ডে টাকা নেওয়ার ব্যাপারে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়কে জেরা করে তেমন বুঝলে গ্রেপ্তার করলেও করতে পারে বলে মনে করছে তৃণমূলের অনেকে। কারণ এই মুহূর্তে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই সন্দিহান অনেকে। তাছাড়া বিজেপিতে আসবার পরও তিনি এখনো সেই অর্থে বিজেপির ঘরের লোক হয়ে উঠতে পারেননি। তাই মুকুলের ব্যাপারে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা খানিকটা মাথা ঘামালেও শোভনের ব্যাপারে যে তাঁরা কোনও রকম হস্তক্ষেপ করবে না সেটাও এখন পরিষ্কার।

অন্যদিকে নারদ কাণ্ডে তৃণমূলের এক মহিলা নেত্রীকে গ্রেপ্তার করে অন্যরকম বার্তা দেওয়া হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। একই সঙ্গে সারদার প্রমোটিং-এর সঙ্গে যুক্ত এক হেভিওয়েট মন্ত্রীকেও ঘায়েল করা হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।

মাস তিনেক আগে থেকেই কথা চলছিল দুর্গাপুজো বা দীপাবলির মধ্যেই সারদা তদন্তের চার্জশিট দেওয়া হতে পারে। সেই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্ভব না হলেও চাপ বাড়বে রাজ্যের শাসক দলের ওপর। অবশ্য রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অন্য একটি মহল বলছেন, এই করে করে ২০২০ জানুয়ারি বা মার্চ অব্দি যেতেও পারে এই তদন্ত। কারণ হিসেব মতো আগামী বছরেই রাজ্যে শতাধিক পৌর নির্বাচন। অন্যদিকে আছে নাগরিক বিল পাশ করানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহায্য নিলেও নিতে পারেন। তাই এই মুহূর্তে দুম করে বিজেপিও বিশাল কিছু ঝামেলা পাকতে চাইছে না বলে মনে করছেন নির্বাচনী কৌঁসুলিদের অনেকেই। রাজ্যের ক্ষেত্রে তারা একটু ধীরে চলা নীতিই গ্রহণ করছে বলে মত অনেকের। আর এ রাজ্যে ২০২১ দখলের মূল লড়াইয়ে বিজেপি আক্রমনাত্মক ভাবে ঝাপাবে সম্ভবত ২০২০ সালের মার্চের পরেই। তখন তারা এনআরসিকে হাতিয়ার করেই মূলত রাজ্যের শাসক তৃণমূলকে চাপে রাখতে চাইবে। অন্যদিকে আসন্ন পৌরনির্বাচনও একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে আদতে কী হয়, সেটা সবটাই সময়ের ওপর নির্ভরশীল। এখন কে গ্রেপ্তার হবে, কবে হবে সেটা জানতে অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

sweta

(Visited 43 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here