সাংবাদিকতার জগতে যখন বিদ্যাসাগর, আলোচনায় এক অন্য ইতিহাস

সেখ আবদুল হামিদ, কলকাতা: ‘উনিশ শতকে বাঙালি সমাজের স্বরূপ ও তার সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে আধুনিক মানসিকতায় উত্তরণ সমস্তটাই উঠে এসেছে তৎকালীন প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্রে। সেদিকেই চোখ মেললে দেখা মিলবে পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। তিনি সংবাদপত্রের সহযোগিতা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তবে ইতিহাসের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থাকার বিষয়টি সেভাবে সামনে আসেনি, তার অন্যান্য পরিচয়ের চাপে।’ বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজের ‘সাংবাদিক বিদ্যাসাগর’ স্মরণ সভায় সে কথাই তুলে ধরলেন বিশিষ্ট জ্ঞাপনবিদ ও অধ্যাপক সুবীর ঘোষ। শুক্রবারের বারবেলাই তিনি তুলে ধরেন সাংবাদিক বিদ্যাসাগরের কিছু  ‘চেপে থাকা ইতিহাস’।

১৮৪৩ সালের ১৬ আগস্ট প্রকাশিত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতে বিদ্যাসাগর নিয়মিত লিখতেন। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ধর্মভিত্তিক মাসিক সাময়িক পত্রিকা হলেও তিনি এখানে যুক্তিনির্ভর পরিশীলিত মানসিকতার কথা বলতেন। শুধু তাই নয়, অক্ষয় কুমার দত্ত সম্পাদিত এই তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার প্রবন্ধ নির্বাচনের জন্য যে পাঁচ জনের কমিটি ছিল সেখানেও ছিলেন পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি ছাড়াও এই কমিটিতে ছিলেন শ্রীধর ন্যায়রত্ন, রাজ নারায়ণ বসু, আনন্দ কৃষ্ণ বসু প্রমুখ বিশিষ্টজনেরা।

বিশিষ্ট অধ্যাপক ও ‘ভারতীয় সাংবাদিকতার ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রণেতা  ডক্টর অর্ণব বন্দোপাধ্যায় এদিন জানান, ১৮৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে যখন বিধবা বিবাহ নিয়ে বিদ্যাসাগর ‘ বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়, আলোড়ন পড়ে যায় বাঙালির জীবন সমাজে, তখন পত্রিকাটির বৃহৎ প্রচারের জন্য পুস্তিকাটি পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল তত্ত্ববধানেতে। আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক বাদানুবাদের পর বিদ্যাসাগরের এই লেখার জেরে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই বের হয় বিধবা বিবাহ আইন।

দেশের কুসংস্কার ও কু-রীতি নীতির গুলির বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য তিনি এগিয়ে এসেছিলেন এটা সর্বজনবিদিত। তবে বিদ্যাসাগর তাঁর বন্ধু মাধব মোহন তর্কালঙ্কারকে সাথে নিয়ে যে সর্বশুভকরী পত্রিকা (১৮৫০) বের করতেন তা সেভাবে সামনে আসেনি। তিনি এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ‘বাল্যবিবাহের দোষ বর্ণন’ নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। যেখানে তিনি যুক্তি দিয়ে তীব্রভাবে বাল্যবিবাহের তীব্র নিন্দা করেছিলেন।

তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ও সর্বশুভকরী পত্রিকা ছাড়াও বিদ্যাসাগর ‘সোমপ্রকাশ’, ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ এবং ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’ পত্রিকাতে কলম ধরেছেন। সে কথাও এদিন জানান অধ্যাপক সুবীর ঘোষ ও অধ্যাপক ডক্টর বন্দোপাধ্যায়, দু’জনই।

‘সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য এবং জনমত তৈরীর ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের যে একটা বড় ভূমিকা আছে তা উপলব্ধি করেছিলেন বিদ্যাসাগর। তিনি কোন অর্থকারী উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পত্রিকার সম্পাদনার কাজে হাত দেননি। সমাজ সংস্কারের জন্য ঠিক যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই ব্যবহার করেছেন সংবাদপত্রের পাতাকে। তবে তিনি বুঝেছিলেন আড়াল থেকে শুধু কলম চালিয়ে সামাজিক অন্ধকার থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনে সামনে থেকে লড়াই করা, আর তিনি সেটাই করে গেছেন সারা জীবন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল তার এই জেদি ও সদা জেহাদি মনোভাব।’ জানান সুবীর ঘোষ।

[email protected]

(Visited 53 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here