অনুবাদ গল্প: তুষারের মুকুটেই থাকে জ্ঞানের ভাণ্ডার

এটি একটি অনুবাদ গল্প। মূল কাহিনী (The Aged Mother – by Matsuo Basho)। এক জাপানি লোককাহিনী, যেখানে রয়েছে এক নিষ্ঠুর রাজার গল্প। যিনি এমন এক নিষ্ঠুর আদেশ জারি করেন, যেখানে তাঁর দাবি যে সমস্ত বৃদ্ধ-লোককে পরিত্যাগ করে উচু পাহাড়ের টিলায়, গহন বনে ফেলে আসতে হবে এবং অবশেষে তাদের মরতে হবে। সেই ভয়ানক পরিস্থিতিতে এক মা ও তার ছেলের একে অপরের প্রতি স্নেহ-ভালবাসার এক করুণ কাহিনী এখানে বর্ণিত। গল্পটি তরজমা করেছেন ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত।


সে অনেক দিন আগের কথা। পাহাড়ের পাদদেশে বাস করতেন এক দরিদ্র কৃষক এবং তার বৃদ্ধ বিধবা মা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষেতে ফসল নষ্ট হওয়ায় আর বাকি ফসলের সঠিক দাম না পাওয়ায়, অভাবের তাড়নায় কীটনাশক খেয়ে তার ঋণগ্রস্ত বাবাকে আত্মহত্যা করতে হয়। সারাদেশে তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর অভাব অনটন লেগেই রয়েছে। তারা ওই অভাব অনটনের মধ্যেও নম্র, বিনয়ী ভাবে এবং শান্তিতে দিন কাটাত। জনসংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে। লোকসংখ্যার অনুপাতে খাদ্যের যোগান কম। বাজার আগুন। অভাবের তাড়নায় রাজার বিরুদ্ধে প্রজারা মাঝে মাঝেই আন্দোলনে নামছে। হিংসাত্মক ঘটনা ঘটছে। এসব কারণে, রাজার মাথাও ঠাণ্ডা নেই। রাজা ভাবলো, দেশে মানুষ কম থাকলে অভাব-অনটন কম হবে। তাই রাজা এক অদ্ভুত আইন জারি করলো। বৃদ্ধ মা-বাবা কেবল শুয়ে বসে খায়। এরা কোনও কাজে লাগেনা। এদেরকে বনে ফেলে আসতে হবে। কি আর করা। আইন না মানলে যে প্রাণ যায়। তাই ভয়ে লোকজন বৃদ্ধ বাবা-মাকে পাহাড়ের চূড়ায় বনে ফেলে আসতো। সেখানে তারা না খেয়ে মরতো। কখনও কখনও আবার বাঘের পেটেও যেতো।

তার মধ্যে কেউ কেউ আবার বৃদ্ধ বাবা-মা’র প্রতি ভালবাসায় বাড়ির কোনও গোপন জায়গায় বাবা-মা’কে লুকিয়ে রাখত। কিন্তু তা করলে কি হবে, রাজার কানে ঠিক খবর পৌঁছে যেত। রাজার প্রহরীরা ঘুরে ঘুরে দেখতো। কারা কারা বৃদ্ধ বাবা-মা’কে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াচ্ছে। কারা কারা আইন অমান্য করছে। জানতে পারলেই প্রহরীরা বাড়ির কর্তাকে ধরে নিয়ে যেতো। আর রাজার আদেশে তাকে শূলে চড়ানো হত। তাই এই বৃদ্ধ বাবা-মাকে পাহারের চূড়ায় না পাঠিয়েও উপায় ছিল না। অবশেষে বৃদ্ধ বাবা-মাকে বনবাসে পাঠাতোই হতো।

আর এই পিতৃহীন দরিদ্র কৃষক তার মাকে খুবই ভালোবাসতো। মা’ও তাকে খুবই স্নেহ করত, ভালোবাসতো। কিন্তু তাতে কি! রাজার হুকুম। রাজার ভয়ে বনবাসে পাঠাতেই হবে মা-কে। সে হাঁটতে পারে না। রান্নাবান্না ঘরের কাজ কিছুই করতে পারে না। গায়ে শক্তি নেই। লাঠি ভর দিয়ে হাঁটে।

একদিন রবিবারে, কৃষক তাঁর দিনের কাজ শেষ করে কিছু পরিমাণ আতপ চাল নিয়ে (যা দরিদ্রদের প্রধান খাদ্য) সেটাকে রান্না করে। তারপর শুকনো করে, একটি কাপড়ে বেঁধে, বান্ডিলের মত করে, সঙ্গে শীতল পানীয় জল নিয়ে ঘাড়ের উপর ঝুলিয়ে, নিজের অসহায় বৃদ্ধা মা’কে কাঁধে তুলে পাহাড়ের উপরে এক বেদনাদায়ক যাত্রা শুরু করল। চললো পাহাড়ের চূড়ায়, বনের দিকে। মায়ের মনও মানে না। নানা চিন্তা। নিজে মরে গেলেও হবে কিন্তু ছেলে কিভাবে বাঁচবে এই চিন্তায় তার কান্না এলো।

পাহাড়ি রাস্তা যেমন হয় দীর্ঘ এবং খাড়া; কত না চড়াই-উতরাই। কৃষক তার মা’কে কাঁধে নিয়ে চলছে সে চড়াই উতরাই অতিক্রম করে। পথের মধ্যে কিছু ভয়ংকর সরু রাস্তাও আছে যা অতিক্রম করতে হয়েছে যেগুলো শিকারি আর কাঠুরিয়ারা তৈরি করে গেছে। কোনও কোনও জায়গায় চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পথ হারিয়ে বিভ্রান্ত হয়েছে, কিন্তু তাতে সে তোয়াক্কা করে নি। সোজা পথ দিয়ে হোক বা অন্য পথ দিয়ে শীর্ষে পৌঁছাতে হবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আসলে রাজার আদেশ পালন করতে বৃদ্ধা মা’কে যে পাহাড়ের চূড়ায় রেখে আসতে হবে। দরিদ্র কৃষক মা’কে কাঁধে নিয়ে বেপরোয়া ভাবে হাঁটছে আর হাঁপাচ্ছে পাহাড়ের এক রাস্তা থেকে অন্য আর এক রাস্তায়। ওদিকে মা’র হৃদয় ক্রমশ উদ্বেল হয়ে উঠছে ছেলের এই অমানুষিক পরিশ্রম দেখে। আসলে ছেলে তো দুর্গম পাহাড়ের অনেক রাস্তাই চেনে না। ওদিকে মা’র চিন্তা ছেলে আমাকে এখানে রেখে এই বিপদ সঙ্কুল রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরবে কিভাবে? তাই মা যাওয়ার সময় তার হাত দিয়ে গাছের ছোট ছোট ডাল ভেঙ্গে পথে পথে ছড়িয়ে চলেছে। ছেলে যাতে পথ ভুলে না যায়। ঠিক ভাবে বাড়ি ফিরতে পারে। বনে তো বাঘ-ভালুকের অভাব নেই। ছেলের যদি বিপদ ঘটে। মা ছেলের হাতে তুলে দিল একটি কচি ডাল। বললো, বাবা আমি সারা পথেই এ রকম ডাল ফেলে এসেছি। তুমি এসব ভাঙা ডাল দেখে বাড়ি ফিরো। অন্য-পথে গেলে বাঘের কবলে পড়বে। শেষে কোনও দিকে না তাকিয়ে ছেলে অন্ধের মত উপরের দিকে আরোহণ করল একেবারে পাহাড়ের শীর্ষে – যেটা উবাসুত বা ওবাতসুইমা (Ubasute) নামে পরিচিত, “বয়োজ্যেষ্ঠদের পরিত্যক্ত” জায়গা নামে কুখ্যাত পর্বতমালার চূড়ান্ত শীর্ষে অর্থাৎ উচ্চ চূড়ায়। ক্লান্ত শরীর এবং অসুস্থ হৃদয়ে ছেলেটি তার মা’কে ধীরে ধীরে কাঁধ থেকে নামাল এবং নিঃশব্দে প্রিয় মা’র জন্য তার শেষ কর্তব্য হিসাবে বিশ্রামের জায়গা প্রস্তুত করতে লাগল। পাইনের ডাল-পাতা ও আঁশ সংগ্রহ করে, সে একটি নরম কুশন তৈরি করে তার বৃদ্ধা মাকে কোমলভাবে তার উপরে বসতে দিল। ছেলে তার নিজের উলেন কোট মা’র শরীরে জড়িয়ে দিয়ে ছলছল চোখে মা’কে চিরবিদায় দিল।

মা’ও কাঁপাকাঁপা গলায় আর নিঃস্বার্থ ভালবাসায় ছেলেকে বিদায় দিয়ে শেষ নির্দেশটুকু দিলেন, “পুত্র আমার, বাড়ি ফেরার সময় অন্ধের মত রাস্তা ধরে যেওনা। এই দুর্গম পাহাড়ে প্রতি মুহূর্তে বিপদ লুকিয়ে আছে। সাবধানে যাবে, আর আমি যে রাস্তায় গাছের ডালপালাগুলো ছড়াতে ছড়াতে এসেছি সেই পথ অনুসরণ করে যাবে। ওই গাছের ডালপালাগুলোই তোমাকে পথ দেখাবে আর তুমি নির্বিঘ্নে সন্ধ্যের আগে বাড়ি পৌঁছে যাবে।” ছেলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পিছন ফিরে একবার সে রাস্তার দিকে তাকিয়েই ভাবল এই বৃদ্ধ বয়সে কাঁপা কাঁপা হাতে ছেলের প্রতি মা’র ভালবাসার কি অভূতপূর্ব নিদর্শন! বৃদ্ধা মা যে তাকে এতো ভালোবাসে ভাবতেই ছেলের চোখে জল এলো। সে থমকে দাঁড়ালো। মাটিতে নিচু হয়ে বসে মা’কে প্রণাম করে চিৎকার করে বললো, “ওগো মা, সন্তানের প্রতি তোমার এত স্নেহ, এত মমতা আমার হৃদয়কে দুর্বল করে দিয়েছে। আমি তোমাকে এখানে ফেলে বাড়ি যেতে কিছুতেই পারব না। আমরা একসাথে তোমার নির্দেশ মত পথ অনুসরণ করে তোমাকে নিয়েই বাড়ি যাবো। আমি রাজার আইন মানি না। আমি ভয় পাই না। দরকার হলে দুজনে একসাথে মরব।”

এরপর সে আর একবার তার মা’কে কাঁধে তুলে (এখন কি হালকা মনে হচ্ছে) ধীরে ধীরে পাহাড়ের নীচের দিকে এগিয়ে চাঁদের উজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় আর ছায়াঘেরা অরণ্যের মধ্যে দিয়ে সেই উপত্যকায় একটা ছোট্ট কুঁড়েঘরে মা’কে এনে রাখল। সেই ঘরের রান্নাঘরের নীচে সবজি ও ফল রাখার জন্য একটা গোপন জায়গা ছিল। সেই জায়গায় ছেলে তার মা’কে লুকিয়ে রাখল। জায়গাটা এমন যে বাইরে থেকে তাকে দেখা যায় না। ছেলে সেখানে লুকিয়ে মা’র প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র (খাবার, জামাকাপড় ইত্যাদি) যোগান দিতে লাগল। ছেলে সবসময়ই মা’কে নজরে নজরে রাখত। আস্তে আস্তে মা’র ভয় ভীতিও দূর হয়ে গেল। এইভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে। ছেলে আর মা একসঙ্গে নির্ভাবনায় দিন কাটাচ্ছে। এমন সময় রাজার তরফ থেকে আবার একটা অযৌক্তিক ঘোষণা এল, যার মাধ্যমে রাজা আপাতদৃষ্টিতে তার নিজের ক্ষমতার অহংকার দেখাতে চাইছেন। রাজার ঢাকিরা ঢাক পিটিয়ে ঘোষণা করলো ছাই দিয়ে সব প্রজাকে দড়ি বানিয়ে রাজার সামনে হাজির হতে হবে। কে পারবে ছাই দিয়ে দড়ি বানাতে? সারা রাজ্যের প্রজারা রাজার এই ঘোষণায় আবার নতুন করে কেঁপে উঠল।রাজার হুকুম! সবাইকে কে মানতেই হবে। কেউ ভাবতেই পারছেনা কি ভাবে করবে। একদিন ভীষণ টেনশনে রাত্রিবেলা ছেলে সেই লুকানো জায়গায় মা’কে গিয়ে চুপিচুপি রাজার এই ঘোষণা জানিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “বলো তো মা ছাই দিয়ে কিভাবে দড়ি বানাতে হয়? রাজামশাইয়ের হুকুম দিয়েছেন, ছাই দিয়ে দড়ি বানিয়ে রাজাকে দেখাতে হবে, নইলে আবার উনি কি শাস্তি দেবেন জানি না”। মা বললেন, “ঠিক আছে, আজকের দিনটা আমাকে একটু ভাবতে দে”। পরের দিনই সকালে মা ছেলেকে ডেকে বললেন, “প্রথমে খড় বা বিচালি দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একটা লম্বা দড়ি বানিয়ে ফেল। তারপর সেটা ছড়িয়ে বা শুইয়ে রাখ পাহাড়ের ছোট ছোট পাথরের উপর। রাত্রে যখন হাওয়া থাকবে না, তখন ওই দড়িটাকে আগুন দিয়ে জ্বালাও। আগুন যখন সম্পূর্ণ নিভে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, তখন দেখবে যে ছাই পড়ে আছে সেটা অবিকল দড়ির মত দেখতে। কি ছাইয়ের দড়ি তৈরি হল তো? এবার এই ছাইয়ের দড়ি রাজামশাইকে দেখাও”। ছেলে তখন সবাইকে ডেকে মা’র কথামতো খড় দিয়ে দড়ি বানিয়ে, পাহাড়ের পাথরের উপর রেখে, আগুন জ্বালিয়ে, তারপর নিভিয়ে দিল। সবাই চেয়ে দেখল ছাইয়ের তৈরি দড়ি যেন শুইয়ে রাখা আছে।

রাজা খুশি হয়ে কৃষকের খুব প্রশংসা করলেন, কিন্তু তিনি জানতে চাইলেন সামান্য কৃষক এই জ্ঞান সে কোথা থেকে আহরণ করেছে? কৃষক আনন্দে চিৎকার করে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমাকে সত্যটা অবশ্যই আপনাকে জানাতে হবে। তারপর সে নিচু হয়ে রাজাকে সম্মান জানিয়ে, বৃদ্ধা মা’র থেকে পাওয়া জ্ঞানের কথার পুরো বর্ণনা দিল। রাজামশাই সব শুনলেন, তারপর নির্বাক হয়ে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ধ্যানমগ্নের মত হয়ে রইলেন। তারপর আস্তে আস্তে মাথা তুলে বললেন, “জ্ঞান, যা তারুণ্যের শক্তির চেয়েও বেশি প্রয়োজন”। আসলে আমি সেই সুপরিচিত প্রবাদ বাক্যটাই বলতে ভুলে গেছি, “তুষারের মুকুটেই থাকে জ্ঞানের ভাণ্ডার” (অর্থাৎ যখন মানুষ ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হয়, যখন তাদের চুল পেকে সাদা হয়, আর সেখানেই থাকে জ্ঞানের ভাণ্ডার- বৃদ্ধরা ফেলনা নয়, তাদের মধ্যেই রয়েছে জ্ঞানের ভাণ্ডার)। সেই মুহূর্তেই রাজার সেই নিষ্ঠুর আইনটি বিলুপ্ত হয়ে গেল, এবং প্রথাটি এমন এক অতীতে রূপান্তরিত হল যা আজও কিংবদন্তি হয়েই আছে। তবে এই ঘটনার রেশ এখনও নেই বললেও ভুল হবে। রাজার হুকুম নেই, তবে আমরা এখন পাহাড় বন জঙ্গলের পরিবর্তে বাবা-মা’কে স্টেশনে বা বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রেখে আসি।

 

@এস. এ. হামিদ

(Visited 30 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here