ExclusiveFeaturedLead NewsReader's ChoiceTop Newsঅফবিটআজকের গুরুত্বপূর্ণ খবর ৩ব্লগ

সেদিন রাতে নিজের মাথার ব্যান্ডেজ খুলে ক্ষত জায়গায় আঘাত করেই মৃত্যুকে বরণ করেন বিনয়

মনোজ রায়

দিনটা ছিল ১৯৩০ সালের ৮ই ডিসেম্বর। রাইটার্স বিল্ডিং-এ, বলা ভাল ইংরেজ শাসনের হেডকোয়ার্টারে ঢুকে যুদ্ধ করে অত্যাচারী ইন্সপেক্টর জেনারেল সিম্পসনকে হত্যা করেন বিনয়-বাদল-দীনেশ। যে যুদ্ধ ইতিহাস মনে রেখেছে ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে। সেই যুদ্ধের যে তিন বিপ্লবীর মধ্যে আজ জন্মদিন বিনয় বসুর। এই বিনয় কৃষ্ণ বসু, যিনি বিনয় বসু নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।

ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম বাঙালি ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের এই বিপ্লবী বিনয় বসুর জন্ম হয় ১৯০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, মুন্সীগঞ্জ জেলার রোহিতভোগ গ্রামে। ইংরেজদের নির্মম অত্যাচারে ভারতবাসী তখন মৃতপ্রায়। আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছে অনেকদিন আগেই, ইতিমধ্যেই দেশের জন্য প্রাণও দিয়েছেন অনেকে বিপ্লবী। এরকমই সময়ে দেশকে স্বাধীন করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন বিনয় বসু। সঙ্গে ছিলেন আরও দুই সঙ্গী। বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত।

যে কোনও পন্থায় তখন বিপ্লবীরা চাইছেন দেশের স্বাধীনতা। ঢাকায় ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করার পর মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলে (বর্তমানে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ) ভর্তি হন বিনয়। এই সময় তিনি ঢাকার ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের সংস্পর্শে আসেন এবং যুগান্তর দলের সঙ্গে মুক্তিসংঘে যোগ দেন। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার জন্য তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে তার পড়ালেখা শেষ করতে পারেননি। বিনয় ও তার সহযোদ্ধারা ১৯২৮ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলে যোগ দেন। ১৯৩০ সালের ৯’ই আগষ্ট সাধারণ বেশভূষায় নিরাপত্তার গন্ডিকে ফাঁকি দিয়ে অত্যাচারী ইন্সপেক্টর লোম্যনের খুব কাছে এসে তাকে গুলি করেন বিনয়৷ ঘটনাস্থলেই লোম্যানের মৃত্যু হয়৷ এবং তার সঙ্গে থাকা পুলিশের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হডসন গুরুতর আহত হন।

এরপর পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে বিপ্লবী সুপতি রায়ের সাহায্যে বিনয় কলকাতা শহরে পালিয়ে যান। তারপর তিনি বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্তর সঙ্গে একজোট হয়ে দেশের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেন। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল কারা কর্তৃপক্ষের অত্যাচারী ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এন এস সিম্পসন। খুব সাধারণ ঘর থেকে আসা এই তরুণেরা দেশের জন্য জীবন বাজি রাখতেও পিছপা হননি। শুধু সিম্পসনকে হত্যাই নয় তাঁদের লক্ষ্য ছিল কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে অবস্থিত ব্রিটিশ শাসকদের সচিবালয় রাইটার্স ভবনে আক্রমণ করে ব্রিটিশ অফিস পাড়ায় ত্রাস সৃষ্টি করার। ইংরেজদের বুঝিয়ে দেওয়ার এবার সময় বদলাচ্ছে।

১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর তারিখে বিনয়, তাঁর দুই সঙ্গি বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত একত্রে মিলে ইউরোপীয় বেশভুষায় সজ্জিত হয়ে রাইটার্স ভবনে প্রবেশ করেন ও সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। টেগার্টের নেতৃত্বে ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে গুলিবর্ষণ শুরু করে। গুলি বিনিময়ে টেয়ানাম, প্রেন্টিস, নেলসনসহ আরও কিছু পুলিশ অফিসার গুলিবিদ্ধ হন। তবে পুলিশ দ্রুতই তাঁদেরকে পরাভূত করে ফেলে। নির্ভীক এই বিপ্লবীরা সহজেই হার স্বীকার করে নিতে চাননি তাই পটাশিয়াম সায়নাইড খেয়ে আত্যহত্যার চেষ্টা করেন বাদল। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু তাঁর।

বিনয় এবং দীনেশ নিজেদের রিভলভারের গুলি নিজদের মাথা লক্ষ্য করে চালান। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁদের আনা হয় হাসপাতালে। বিনয় ছিলেন মেডিকেলের ছাত্র তাই মৃত্যুকে কিভাবে বরন করতে হয় তা তিনি জানতেন, তাই ১৯৩০ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে বিনয় নিজের মাথার ব্যান্ডেজ খুলে ক্ষত জায়গায় আঘাত করে মৃত্যুকে বরণ করেন। ভারতের ইতিহাসে বিনয়-বাদল-দীনেশ এই ত্রয়ীর নাম সবসময়েই স্বর্ণাক্ষরে লেখা। দেশের প্রতি তাঁদের আত্মত্যাগ ভারতবাসীর মনে তাঁদের চিরস্মরণীয় আসন দিয়েছে। দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন যারা তাঁদের মধ্যে এই তিনটি নাম থাকে একদম প্রথমের দিকেই। বিনয়-বাদল-দীনেশের এই আত্মত্যাগের স্মরণে কলকাতার ডালহৌসি চত্বরের নামকরণ করা হয় বিবাদি বাগ।

@মনোজ রায়
(Visited 56 times, 1 visits today)

Tags

Related Articles

Back to top button
Close
Close