মৃত ছাত্রীকে বাঁচাতে দেড় দিন ধরে চললো ওঝার ঝাড়ফুঁক ও বুকে বাইবেল রেখে প্রার্থনা

0
33

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় ও লক্ষ্মীশ্রী রায়, বর্ধমান: বেহুলা-লক্ষিন্দরের কাহিনীকেও হার মানালো সাপের কামড়ে মৃত্যু হওয়া এ যুগের এক ছাত্রীর মৃতদেহ নিয়ে চলা কুসংস্কার-কাহিনী। পূর্ব বর্ধমানের কালনার অকালপৌষ এলাকার ঘটনা। ছাত্রী কবিতা মুর্মুকে বাঁচিয়ে তুলতে দেড়দিন ধরে মৃতদেহ নিয়ে চললো টানাহেঁচড়া। কখনও মৃতদেহ ওঝার বাড়ি নিয়ে গিয়ে চলে ঝাড়ফুঁক। আবার কখনও মৃত কবিতার বুকে বাইবেল রেখে চললো যিশুর কাছে প্রাণভিক্ষা প্রার্থনা। শেষপর্যন্ত ওঝার ঝাড়ফুঁক কিংবা প্রার্থনা, কোনও কিছুতেই প্রাণ ফেরেনি কবিতার। দেড়দিন পর মৃতদেহ পচে ফুলে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পর কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাসভঙ্গ ঘটে ছাত্রীর পরিবারের। সোমাবার কালনা মহকুমা হাসপাতাল পুলিশ মর্গে ছাত্রীর মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হয়। এই ঘটনা ফের সামনে এনে দিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির যুগেও কুসংস্কার মুক্ত হতে পারেনি গ্রাম-বাংলার মানুষ।

কালনার অকালপৌষ পঞ্চায়েতের পূর্ব পাড়ায় বাসবাস মুর্মু পরিবারের। পরিবারের সকলেই ক্ষেতমজুর। এই পরিবারের বছর ১৫ বয়সি কন্যা কবিতা মুর্মু কালনার অকালপৌষ অরবিন্দ প্রকাশ উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেণীতে পড়তো। ছাত্রীর বাবা যোগেশ মুর্মু বলেন, গত শনিবার রাতে বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকাকালীন বিষধর সাপ তাঁর মেয়ের বাঁ পায়ে ছোবল মারে। জ্বালা-যন্ত্রনায় কবিতা ছটফট করতে শুরু করলে পরিবারের সবাই মিলে ওই রাতেই তাঁকে কালনা মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক কবিতাকে মৃত ঘোষনা করেন।

যোগেশবাবু বলেন মেয়ে কবিতা মারা গেছে বলে চিকিৎসক জানিয়ে দিলেও তাঁরা তা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। সে-কারণে হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে তাঁরা সোজা চলে যান পরিচিত ওঝার বাড়িতে। যোগেশ মুর্মু জানান ওই ওঝা তাঁকে বলেছিল বিষ তুলে দেবে, মেয়ে বেঁচে যাবে। ওঝা মেয়ের পায়ের উপর বড় পাথর রেখে ঝাড়ফুঁক সহ অনেক কেরামতি করে। কিন্তু ওঝার হাজারো কেরামতি ও ঝাড়ফুঁক কাজ আসে না।

মৃতার মামা বিশ্বনাথ বাস্কে বলেন, ওই সময়ে তাঁদের প্রভু যিশুর কথা মাথায় আসে। ওঝার বাড়ি থেকে কবিতার মৃতদেহ তাঁরা বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে চলে আসেন। বাড়িতে কবিতার বুকে বাইবেল রেখে সবাই মিলে প্রাণভিক্ষা প্রার্থনা শুরু করেন। কিন্তু তাতেও প্রিয় কন্যা কবিতার আর প্রাণ ফিরে আসেনি। মেয়ের দেহ পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পর সবাই বুঝতে পারে আর কোনওভাবেই কবিতার বেঁচে ওঠা সম্ভব নয়। সোমবার মেয়ের দেহের ময়নাতদন্ত করিয়ে পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন করা হয়।

গ্রামবাসী পরিমল গড়াই বলেন, কুসংস্কার এখনও পিছু তাড়া করে বেড়াচ্ছে গ্রাম-বাংলার মানুষজনকে। এই ঘটনা সেই সত্যকেই আরও একবার সামনে এনে দিল। অপর বাসিন্দারা বলেন, কালনা হাসপাতালের চিকিৎসক ছাত্রীকে মৃত ঘোষনার পর পরিবার কীভাবে হাসপাতাল থেকে বের  আনলো, তারও তদন্ত হওয়া দরকার।

এ বিষয়ে কালনা হাসপাতালের সুপার কৃষ্ণচন্দ্র বরাই জানিয়েছেন, ছাত্রীর পরিবার হাসপাতাল রেকর্ডে নাম নথিভুক্ত করায়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসক ছাত্রীকে মৃত ঘোষনা করেন। সেকথা বিশ্বাস করতে পারেনি ছাত্রীর পরিবার। অন্য ডাক্তারকে দেখাবে বলে জানিয়ে ছাত্রীর পরিবার মৃতদেহ নিয়ে চলে যায়। বিডিও মিলন দেবগড়িয়া বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। সবিস্তার খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি বলেন, কুসংস্কারের কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে।

ছবি: পথিকৃৎ দাস বৈরাগ্য

(Visited 8 times, 1 visits today)