সাধারণের মধ্যেও ‘অসাধারণ’ অভিনেত্রী ছিলেন স্মিতা পাটিল

শৈবাল পত্রনবীশ: আটপৌঢ়ে অভিনেত্রী। অথচ ভীষণ পাওয়ারফুল অ্যাকট্রেস। অনেক একটা কথা বিশ্বাস করবেন না যে স্মিতা কম বয়সেই এতগুলো ছবি করা সত্ত্বেও কোনও ছবিতে মেক-আপ করেননি। বললাম না আটপৌঢ়ে অভিনেত্রী।
স্মিতার সাথে আলাপ অনেক পরে। ১৯৮০ দশকের মাঝামাঝি কলকাতা থেকে দিল্লিতে ফ্লাইট পরিবর্তন করে উড়ে যাচ্ছি ফরাসি দেশে। ফ্লাইটে পাশাপাশি বসার সুযোগে আলাপ-পরিচয় হয়। তখন স্মিতা রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত। অনেকগুলো ছবি করে ফেলেছেন। সবই হিট। যেমন আমাদের পাশের বাড়ির মেয়েটি।
লক্ষ্য করলাম কি সহজেই মিশে গেল। প্রাণ খুলে গল্প করতে করতে দিব্যি চলে গেলাম। মন খুলে গল্প করতে করতে ওর  আর রাজ বব্বরের প্রেম বিষয়ে অত কম আলাপেই বলে ফেললেন।

একটু ছোট্ট ঘটনা। কিন্তু মনে হয় কেউ জানেন না। স্মিতার মুখেই শোনা। একদিন হোটেলের ঘরে বসে ভীষণ কাঁদছেন। পাশের ঘরে ছিলেন মিঠুন। মিঠুনের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। হায়দরাবাদে ‘দিলওয়ালা’ ছবির শুটিং চলছে। কান্নার কারণ-রাজ বব্বর যে এনগেজমেন্ট রিং-টা নিজের হাতে পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই আংটি পাচ্ছেন না। মনে-প্রাণে এতটাই পরিষ্কার ছিলেন যে এই হারানো আংটিটার কথাও বলে ফেললেন।

মিঠুন ওকে বললেন যে ছোটবেলায় মা-বাবার কাছে শুনেছেন যে কোন জিনিস হারিয়ে গেল বাঁ হাতের কড়ে আঙুল কামড়ালে সেই হারানো জিনিস নাকি খুঁজে পাওয়া যায়। স্মিতা আঙুল কামড়ে আছেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সেই আংটি পাওয়া গেল ঘরের কার্পেটের নীচে। হয়তো সেটা ঘটনাচক্রে পাওয়া গেছে, কিন্তু অনেক ভারতীয় এই প্রক্রিয়াটা মানেন।

স্মিতা পাটিলের স্নান-দৃশ্যে নগ্নতার প্রকাশ বলে অনেকের ধারণা। অবাক হতে হয়! কি অসাধারণ ক্ষমতাবলে স্মিতা একটি বস্তির খোলা কলের সামনে স্নান দৃশ্যেটিতে অনায়াস অভিনয়। ভাবলে অবাক হতে হয়। উনি অন্তরের অন্তস্থলে গিয়ে অভিনয় করতেন। যেটা শাবানা আজমিও পারেননি। কি আশ্চর্য্য ওই দৃশ্যের মাধ্যমে স্মিতা নারীকে স্ত্রীলোক হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলেন।

অথচ সেই বাণিজ্য চিত্রে অমিতাভ-র বিপরীতে(ছবির  নাম (‘নমক হালাল’) স্নান দৃশ্যে স্থানচ্যুত শাড়ি। এই দৃশ্যে ভীষণ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। উনি বুঝেছিলেন ওনাকে হৃদয়ের ভেতর থেকে অভিনয় করতে দেওয়া হচ্ছে না। সবটাই ব্যবসার জন্য। এমনটাই সাচ্চা ছিল ওর কম সময়ের অভিনয় জীবন।

‘মান্ডি’, বা ‘ভূমিকা’, ‘মন্থন’ ‘মির্চ মশালা’ সব ছবিতেই অভিনয়কে হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু করে নিতে পেরেছিলেন।

রাজ বব্বরকে ভীষণ ভালোবাসত। কোথাও গেলে নিজের জন্য কিছু কিনত না। হৃদয়তাড়িত রাজ বব্বরের জন্য-ই নৈবিদ্য সাজানো হত।

আরেকটি কথা জানিয়ে এখানে শেষ করছি। স্মিতা আর রাজের প্রণয় যখন শিখরে তখন চার মাসের গর্ভবতী স্মিতা। অন্য নায়িকা হলে অন্য আধুনিক অনেক ব্যবস্থা-ই করতেন। কিন্তু হৃদয়তাড়িত স্মিতা বুক ফুলিয়ে ছিলেন উনি গর্ভবতী। সাধারণ বাড়ির মেয়ের এই স্বচ্ছতা তখনকার দিনে কল্পনা করা যেত না।

পুণের এই মেয়েটি দূরদর্শনের সংবাদ পাঠিকা ছিলেন। বাবা পুণেতে খুব বড় মাপের রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, কিন্তু এই তফাৎ অনেকের কাছে অজানা। তাঁর মেয়ে হয়ে মাটির সাথে এইভাবে মিশে গেছেন, ভাবতে অবাক হতে হয়।

চলচ্চিত্র জগতে যাত্রা শুরু একটি মারাঠি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। হিন্দি চলচ্চিত্রের নিয়ে আসেন শ্যাম বেনেগাল ১৯৭০ সালে। ‘চরণদাস চোর’ ছবির মাধ্যমে। আবার শ্যাম বেনেগাল পরের ছবি ‘মন্থন’-এ খুব নাম করে। এই ছবিতে কাজ করে জাতীয় পুরস্কারও পান। একজন গ্রাম্য দুধওয়ালির চরিত্রে অভিনয় করলেন ‘মন্থন’-এ। আমাদের সমাজকে তীব্র কষাঘাত করলেন ওই ঘুংঘট পরা নিয়ে।
তারপর এল ‘চক্র’। চরিত্রের ভিতরে পুরোপুরি ঢুকে যাওয়ার জন্য স্মিতা দিনের পর দিন বম্বের বস্তিগুলোতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ওদের সুখে-দুঃখ অনুধাবন করার জন্য এই মন্ত্রিকন্যা বস্তিতে বস্তিতে কত ঘুরছেন। সেজন্য ‘চক্র’ অত সফল একটি ছবি। ‘চক্র’ ছবিটায় অভিনয় করার জন্য দ্বিতীয়বার জাতীয় পুরস্কার পেলেন। তার সাথে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হলেন।
কিন্তু ব্যক্তি জীবনে রাজ বব্বরকে বিয়ে করার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে স্মিতার সমালোচনা শুরু হয়।

স্মিতার বাচ্চা হওয়ার সময় বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিয়েছিল। তারপর পরিচালক মৃণাল সেন তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন যে বাচ্চা হওয়ার সময় ডাক্তার বা ভীষণ অবহেলা করেছিলেন। কিন্তু তার কোনও বিচার হয়নি। যাইহোক সেই বাচ্চা ছেলেটি এখন বলিউডে উঠতি তারকা প্রতীক বব্বর। চলচ্চিত্র জগতে কত না অজানা তথ্য থাকে আমরা তার অনেক কিছুই জানতে পারি না।

‘ভূমিকা’, বা ‘মান্ডি’ দেখে মুগ্ধ মৃণাল সেন স্মিতাকে আমন্ত্রণ জানান, ‘আকালের সন্ধানে’। অভিনয় করলেন। অসাধারণ অভিনয়। তারপর-ই বাংলা আবার ডাকলো। ভারতের একমাত্র টেলিচিত্র করার জন্য স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে ডাক এল। তৈরি হল ‘সদগতি’।
শ্যাম বেনেগালের ‘মন্থন’ ছবিতে দলিত রমণীর ভূমিকায় আমরা মর্মে মর্মে টের পাই দেহ দিয়ে ভালোবেসে এই রমণী-ই নতুন সিনেমার ভোরের কল্লোল।
প্রচলিত মতের পক্ষে গিয়ে নব্য ভারতীয় ছবির সরস্বতী রূপে আমরা স্মিতাকে বরণ করে নিই।
নিশান্ত ছবিতে কামুক জমিদারের অনুজ বধূ হিসেবে স্মিতা সামান্য কয়েকটি দৃশ্যের সুযোগ পেয়ে-ই প্রমাণ করল ও স্রোতস্বিনী ঝরনা।
স্মিতা এক অভিনয় দর্শন। কেন যে ঈশ্বর ওকে অত তাড়াতাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। আপামর ভারতবাসী এই দংশনে চিরকাল কষ্ট পাবে। স্মিতা, হ্যাঁ স্মিতা তুমি আর কয়েকটা বছর বাঁচলে না। তোমার অভিনয়ে আগুনের শিক্ষা থাকা সত্ত্বেও আমরা বেশিদিন উপভোগ করতে পারলাম না।

bipasha

(Visited 47 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here