আবার তৃণমূলে ফিরছেন শোভন!

শংকর দত্ত, কলকাতা: কলকাতার প্রাক্তন মেয়র, বিজেপি নেতা শোভন চট্টোপাধ্যায় কি সত্যিই তৃণমূলে ফিরছেন? বিজেপি-তৃণমূল সহ সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও এই নিয়ে জল্পনায় ব্যস্ত। যদিও শুক্রবার কপি লেখা পর্যন্ত খবরে শোভনবাবুকে রাজ্য সরকার পুনরায় তাঁর নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং তিনি তৃণমূলে এক প্রকার ফিরে গেলেন এটা না বলার অপেক্ষায় আর নেই। এমনকী আগামী ৭ নভেম্বর তৃণমূলের বিধায়কদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সভাতেও তিনি উপস্থিত থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন বলে জানা যাচ্ছে।

শোনা যাচ্ছে এই মুহূর্তে মেয়র পদ আর না ফেরালেও তাঁকে অন্তত দুটি দফতরের মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দিতে রাজি তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। যদি খবর সত্যি হয় তাহলে জল্পনার অবসান ঘটতে চলেছে। এই বিষয়ে তৃণমূলের এক রাজ্যস্তরের নেতাকে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘শোভন বাবু দলের বিধায়ক ছিলেন, কাউন্সিলর ছিলেন। তাছাড়া ঘরের ছেলে ভুল করে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন যদি এটাই ধরে নিই, তিনি আবার ঘরে ফিরবেন, এটা আর নতুন কথা কী।’ তাঁকে কি আবার মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ‘ওনার পুরো বিষয়টিই দেখছেন দলনেত্রী নিজে। উনি তৃণমূলের জন্ম লগ্ন থেকে ছিলেন, দক্ষ নেতা। আশা করছি স্বমহিমাতেই ফিরছেন’।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘আমরা ওঁনাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলাম। উনি নিজের থেকেই দূরত্ব বাড়িয়েছেন।’ তাহলে কি শোভনের বিরুদ্ধে বিজেপি কোনও ব্যবস্থা নিতে চলেছে? তাঁর কাছে কৈফিয়ৎ চাওয়া হবে? এর উত্তরে দিলীপবাবু জনান, ‘আমরা পুরো বিষয়টির ওপরে নজর রাখছি। প্রয়োজনে দিল্লির সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
সিপিএম নেতা বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘এটা ওদের সংস্কৃতি। সুবিধার রাজনীতিতে যারা বিশ্বাসী, তাঁরাই এইগুলো করে থাকেন। এদের নিয়ে কথা বলবার প্রয়োজন বোধ করছি না।’ কংগ্রেস নেতা রাজ্যসভার সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা তো বার বারই বলছি, বিজেপি আর তৃণমূলের তলে তলে গভীর সম্পর্ক। এই যাওয়া আসাটাও ওদের রাজনৈতিক সৌজন্যতা হতে পারে। কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন আর কী উদ্দেশ্যে ফিরছেন সেটা ওরাই বলতে পারবেন।’
সূত্রের খবর, ভাইফোঁটার মতো শুভদিনে তৃণমূল নেত্রী তাঁর প্রিয় ভাই কাননকে ফিরে পেয়ে সেদিনই আগামী দিনের রুট-ম্যাপ তাঁকে দিয়ে দেন। শোভন সানন্দে সেটা গ্রহণ করে সম্মতি দেন বলেও খবর। শর্ত হিসাবে শুধু রত্নার বিষয়টি ওঠে। দিদি সেটা বুঝে নেবেন বলেও জানান।
ভাইফোঁটাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে নতুন করে ফোঁটা নিয়ে তিনি নিজেই এই জল্পনা বাড়িয়েছেন। এর মাঝেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে তৃণমূলে আবার আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরলে তিনি কি দায়িত্ব পেতে চলেছেন। তৃণমূলের পক্ষ থেকে অনেক আগে থেকেই শোভনকে বারবার দলে ফেরার আহ্বান করা হয়েছে। এমনকী তাঁকে পুনরায় মেয়র ও মন্ত্রিত্বের পদ ফিরিয়ে দেওয়া হবে বলেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। লোকসভা ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবির পর শোভনের প্রয়োজনীয়তা তৃণমূলে নতুন করে বেড়ে গিয়েছিল।

কলকাতার বর্তমান মেয়র ফিরহাদ হাকিম, মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় সহ একাধিক হেভিওয়েট নেতা মমতার দূত হিসাবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু দেখা গেছে দিন যত এগিয়েছে শোভন নিজের থেকে তৃণমূল থেকে স্বেচ্ছায় দূরত্ব বাড়িয়েছেন। বরং একের পর এক ঘটনায় তাঁর বিজেপি যোগের জল্পনা বেড়েছে। এবং শেষমেশ তিনি বিজেপিতেই যোগ দিয়েছেন। যদিও তাঁর এই বিজেপি যোগ বা বিজেপি অনুরাগের ইচ্ছেটাই বেড়েছে বান্ধবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমেই বলে খবর।
অনেকেই বলেছেন মূলত বৈশাখীর ইচ্ছা ও যোগাযোগের ভিত্তিতেই সম্মানের সঙ্গে সাংগঠনিক কাজ করতে সম্মত হয়ে তিনি বিজেপিতে আনুষ্ঠানিক যোগ দেন দিল্লি গিয়ে। সেখানে বৈশাখীও একই সঙ্গে যোগ দেন। কিন্তু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার দিনেই দিল্লিতে অভিনেত্রী তথা তৃণমূল বিধায়ক দেবশ্রী রায়ের উপস্থিতি ছন্দপতন ঘটায়। সেদিন তো নয়, ভবিষ্যতেও দেবশ্রী যাতে বিজেপিতে যোগ দিতে না পারে সে ব্যাপারে তাঁদের মৃদু আপত্তি দেখা গেছে প্রথম দিকে। শেষমেশ সে যাত্রায় দেবশ্রী রায়ের বিজেপিতে যোগ দেওয়া হয়নি। পরে কলকাতায় বিজেপির রাজ্য অফিসে শোভনকে সংবর্ধনার ব্যবস্থা করা হলেও বৈশাখীকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছিল। সেই অনুষ্ঠানে বৈশাখী শেষমেশ এলেও তাঁদের নিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ ‘ডাল-ভাত’ তত্ত্ব তোলেন। এরপরও সংগঠনে তাঁদের যৌথভাবে সেই ভাবে জায়গা করে না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁদের তরফ থেকে। অনেক ক্ষেত্রে শোভনকে গুরুত্ব দিলেও বৈশাখীকে গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

আর খুব স্বাভাবিকভাবেই বৈশাখী গুরুত্ব না পাওয়ায় শোভনও নিজের থেকে বিজেপির কর্মকান্ড থেকে নিজেকে একটু একটু করে গুটিয়ে নেন। এমনকী কলকাতায় নেতাজি ইন্ডোরে অমিত শাহ’র অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি উপস্থিত হননি। যদিও ওই অনুষ্ঠানেই বিধানগরের প্রাক্তন মেয়র মুকুল ঘনিষ্ট সব্যসাচী দত্ত যোগ দিয়ে বাজিমাৎ করেন, শোভন বৈশাখীকে দূরে ফেলে প্রচারের সামনে চলে আসেন। দলের সঙ্গে তাদের বনিবনা না হওয়া বা দলের থেকে দূরত্ব ঘোচানোর নানা চেষ্টা করেছে কলকাতায় বিজেপির রাজ্য নেতা ও এমনকী দুই একজন শীর্ষ নেতাও চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টা ও ফলপ্রসূ না হওয়াই শেষ ইস্তক তাঁরা দিল্লিতে গিয়ে মুকুল রায়ের বাড়িতে একদিন ডিনার মিটিংয়ে বসেন। তখনকার মতো মুকুল রায় সব ঠিক আছে এমন বার্তা দিতে চাইলেও ভিতরে ভিতরে আসলে কিছুই ঠিক ছিল না।
এর মধ্যেই অবশ্য শোভন দলে থাকা সত্ত্বেও বিজেপির সঙ্কল্প যাত্রায় দক্ষিণ কলকাতার দায়িত্ব দেওয়া হয় সব্যসাচী দত্তকে। এটা যদি শোভনকে মানসিক আঘাত দিয়ে থাকে বৈশাখীকে আশালীনভাবে প্রকাশ্যে বিজেপি নেতা জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আক্রমণ শোভন বৈশাখী দুজনকেই দলের সঙ্গে চির ধরাতে অনুঘটকের কাজ করে। শোভন ঘনিষ্ট এক নেতার কথায়, আসলে দাদা বিজেপি থেকে এত তাড়াতাড়ি সরে আসবেন এমন ভাবনা ছিল না। বিজেপি যেমন ওদের গুরুত্ব দিচ্ছেন না তেমনই ওনারাও চুপচাপ বসেছিলেন। তবে বিজেপির ভুল হল বৈশাখীদিকে আলাদা করে শুধু দাদাকে নিয়ে ভাবাটা। কারণ দাদা বিজেপিতে গেছেনই বৈশাখীদির জন্য। আর তার শর্তই ছিল তারা দুজনে একসঙ্গে রাজনীতি করবেন।’
অবশেষে আবার এটাই সত্যি হতে চলেছে। বৈশাখী মাধ্যম হয়েই কিন্তু শোভন-তৃণমূলের বরফ গলতে শুরু হয়েছে। কারণ বৈশাখীই বিজয়ার সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে প্রথম পার্থ চট্টোপাধ্যায় বাড়ি যান। আর সেদিনই সূচনা হয় শোভনের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের নতুন সমীকরণ।

bipasha

(Visited 12 times, 1 visits today)

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here