রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে, তাদের আশঙ্কা স্বদেশে প্রত্যাবাসন হচ্ছে না

বিভিন্ন উপায়ে ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা। তাদের কেউ সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছে। আবার কেউ বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ঢুকে বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিশে গিয়ে কৌশলে পাসপোর্ট তৈরি করে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

কক্সবাজার থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টার সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড ও পুলিশের পৃথক ২১ অভিযানে গত দেড় মাসে প্রায় ছ’শো রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৬ জুন কক্সবাজার শহরের লিংকরোড থেকে ১৮ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ। এর আগে গত ৩০ মে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে গভীর সমুদ্রে মালয়েশিয়া পাড়ি দেওয়ার সময় কোস্টগার্ড দুই দালালসহ ৫৮ জনকে আটক করে। এর মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ২৬ জন নারী ও ১০ শিশু রয়েছে। তারও আগে ২০টি অভিযানে ৫১৭ রোহিঙ্গাকে আটক করে ক্যাম্পে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ৩২ দালালকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

শুধু সাগরের পথে রোহিঙ্গারা পালানোর চেষ্টা করছে না, তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বৈধভাবে বিদেশ পাড়ি দেওয়ারও চেষ্টা করছে। গত ১০ মে রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে পালানোর সময় ২৩ জন রোহিঙ্গা ধরা পড়ে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাসপোর্ট করতে গিয়ে আরও অর্ধশত রোহিঙ্গা ধরা পড়েছে। কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আবু নাঈম নাসিম জানান, পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের করা ৩০০ আবেদন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা মেয়েরা প্রথমে কিছুদিন স্থানীয়দের সঙ্গে বসবাস করে। পরে তারা স্থানীয় ভাষা রপ্ত করে, স্থানীয়দের মতো পোশাক পরে। আচার-আচরণ সবকিছু স্থানীয়দের মতো শিখে ফেলে। এরপর স্থানীয়দের সহায়তায় কাগজপত্র সংগ্রহ করার পর পাসপোর্ট অফিসে  হাজির হয়।হজে যাবে বা চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবে বলে পাসপোর্ট নেওয়ার চেষ্টা করে। এভাবে নানা কৌশলে পাসপোর্ট নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে এমন কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা মানবিক সহায়তা পেলেও অনেকে মনে করছেন সহসা তাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন হবে না। তাই বাংলাদেশে বিদেশে পাড়ি দেওয়া কিংবা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের উপায় খুঁজছে। এমন চিন্তায় অনেকে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা ইন্টার সেক্টর কমিউনিকেশনের (আইএসসিজি) মুখপাত্র সৈকত বিশ্বাস জানান, রোহিঙ্গাদের অনেকে উন্নত জীবনের জন্য দেশের বাইরে যেতে চায়। আবার অনেকের আত্মীয়-স্বজন বিদেশ থাকার কারণে এসব রোহিঙ্গারা সেসব দেশে গিয়ে তাদের সঙ্গে থাকতে চান। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে নতুন সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

বেসরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা পালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট সীমানায় ঘেরাও করে রাখতে না পারায় তারা বনজঙ্গলসহ বিভিন্ন চোরাইপথ দিয়ে সহজে বের হয়ে যাচ্ছে। সাগর পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু রোহিঙ্গা পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করলেও অধিকাংশ রোহিঙ্গা এখন কৌশল পাল্টেছে। তারা বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঢুকে পড়ছে। এরপর বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের সঙ্গে বসবাস করছে। পরে তৈরি করছে পাসপোর্ট। আর উড়াল দিচ্ছে বিদেশে। এই সুযোগে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে বের করে বিদেশে পাচার করতে গড়ে উঠেছে ক্যাম্পভিত্তিক দালাল চক্রও।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম জানান, একসঙ্গে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। নানা কৌশলে ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে তারা। এমন কি অনেকে বেরও হয়ে গিয়েছে। রোহিঙ্গারা যাতে ক্যাম্প থেকে বের হতে না পারে এর জন্য সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট এড়িয়ে পাহাড়-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এলাকা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন জানান, রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় পাচার হচ্ছে। যারা স্বেচ্ছায় পালিয়ে যেতে চায় তাদের ধরা কঠিন। আর এর মধ্যে মানবপাচারকারীরা সহযোগিতা করলে আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

ক্লিক করুন এখানে, আর চটপট দেখে নিন ৪ মিনিটে ২৪টি টাটকা খবরের আপডেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *