কবি নজরুল সম্প্রীতির নাম

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক | May 26, 2019 | 10:30 am

নরেন্দ্রনাথ কুলে

উৎসব মানে যে যার মতো করে আনন্দ, মজা, হৈ-হুল্লোড় করা। আবার উৎসব মানে মিলন, পরস্পর কুশল থাকার শুভেচ্ছা।  উৎসব মানে এক সংস্কৃতি। উৎসব মানে সম্প্রীতি।  সদ্য দেশে  একটি উৎসব শেষ হল। শুধু উৎসব নয়। মহা উৎসব। গণতন্ত্রের। যেখানে উৎসব মানের প্রতিটি শব্দের খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেগুলো কোথায় যেন আজ হারিয়ে গেছে। গণতন্ত্রের সংস্কৃতির মূল বিষয় হিসাবে সম্প্রীতির কথা বলা যায়। অথচ আজকে চারপাশে এই শব্দটিও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার পথে। আসলে সম্প্রীতির কথা উঠলেই সাম্প্রদায়িক শব্দটি হাজির হয়ে যায়।  এ দেশে এই সম্প্রদায় বলতে আবার মনের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান শব্দ দুটি  অনায়াসে ভেসে ওঠে। প্রাক-স্বাধীনতা থেকে এই দুই সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির মধ্যে যে ফাটল ধরিয়ে দিয়ে ব্রিটিশ এ দেশ ছেড়েছিল আজও সে ফাটল আমরা মেরামত করতে পারিনি। আজকের সময়ে এই ফাটলের সুবিধে ভোট অঙ্কের সমীকরণে আর এক সম্প্রদায় কাজে লাগাচ্ছে তা হল সংসদীয়  রাজনৈতিক সম্প্রদায়। সকলে বুঝতে পারি, তবুও সেই স্রোতে ভেসে চলি।  স্রোতে ভাসা অতি সহজ। অথচ এই স্রোতের চাপেই বাড়তে থাকে ফাটল। এখন এই ফাটল  মেরামত যাদের করার কথা কোনো চেষ্টা না করেই তারাই এক চোরা স্রোতে তা বাড়িয়ে তুলছে। যার ফলে দেশ ও সমাজের বাস্তুতন্ত্র একদিন পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। এভাবে দেশ কি এগিয়ে  যেতে পারে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কবেই তা সতর্ক করেছেন। বলেছেন, দুটি সম্প্রদায়ের দোষ-ত্রুটি থাকবে তবুও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে না চললে নতুন ভারতবর্ষ গড়া সম্ভব নয়। তিনি ভারতবর্ষকে গড়তে চেয়েছিলেন মহামানবের তীর্থস্থানে। তাই তিনি বলেছিলেন, হে মোর চিত্ত, পূণ্যতীর্থ, জাগো রে ধীরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে। সেই সাগর তীরে কেউ ত সেভাবে না জাগলেও একজন সত্যি জেগে উঠেছিল যিনি সেখানে ফোটাতে চেয়েছিলেন সম্প্রীতির ফুল। যিনি বললেন একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান/ হিন্দু তাহার নয়নমনি মুসলিম তাহার প্রাণ। শুধু তাই নয়। এই সম্প্রীতি ভাঙার কারিগরদের  বজ্জাতির কথা সরাসরি বলতেও দ্বিধা করেননি। বলেছেন,  জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছ জুয়া। তার জন্য কম বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়নি তাঁকে?  তাঁরই জন্য আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় সেই সম্পর্কে বলেছিলেন ‘…কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি মাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায়  ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে-হাতে-হাত মিলানো যদি হাতাহাতির চেয়েও অশোভন হয়ে থাকে, তাহলে  ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে, আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোনো বেগ পেতে হবেনা। কেন-না, একজনের হাতে লাঠি, আর-একজনের আস্তিনে আছে ছুরি।’  তিনি আরো বলেন, ‘… এ যদি বেদনাসাগরমন্থনের হলাহলই হয়, তাহলে ওই সমুদ্রমন্থনের সব দোষ অসুরদেরই নয়, অর্ধেক দোষ এর দেবতাদের। তাঁদের সাহায্য ছাড়া তো এ সমুদ্রমন্থন-ব্যাপার সহজ হত না…।’

সম্প্রীতি নষ্ট করার পেছনে কারা থাকে তার ইঙ্গিত তিনি এখানে স্পষ্টভাবেই দিলেন।  তিনি কি শুধু হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি দেখতে চেয়েছেন? তা নয়। তিনি চেয়েছেন সকল ধর্মের সমন্বয়। সেজন্য বলেছেন, ‘গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান-ক্রিশ্চান।’

শুধু তাই নয়। সকল সময়ের সকল মানুষের ভেদাভেদ মুছে সাম্যের গান গেয়েছেন। ‘গাহি সাম্যের গান-/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!/ নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ্য ধর্মজাতি,/ সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে  তিনি মানুষের জাতি।’

এমনকি তাঁর চোখে নারী-পুরুষের মধ্যেও নেই কোনো ভেদ। তাই তিনি বলেছেন, ‘গাহি সাম্যের গান-/ আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনও ভেদাভেদ নাই।/ বিশ্বের যা কিছু সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

এভাবেই বিশ্বকবির মহামানবের সাগর তীরে দাঁড়িয়ে সকল মানুষকে মিলনের সুরে বাঁধার আহ্বান করেছেন – ‘সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি/ এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশি।/ একজনে দিলে ব্যাথা-/ সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।/ একের অসম্মান/ নিখিল মানব-জাতির লজ্জা- সকলের অপমান!’

তিনিই কাজী নজরুল ইসলাম। কবি। বিদ্রোহী কবি। প্রকৃতই কাজী। একমাত্র কাজী  যিনি ন্যায় বিচারের জন্য  অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। বিদ্রোহ করেছেন ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। বিদ্রোহ করেছেন সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে।  বিদ্রোহ করেছেন মানুষের অধিকারের জন্য। বিদ্রোহ করেছেন দেশের মুক্তির জন্য। তিনি একমাত্র কবি যিনি এ দেশের মুক্তির জন্য সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেছেন। যে কবি সত্য কথা বলতে কখনই ভণিতা না করে কাব্যে তার সরাসরি প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তাঁর কথাই তা বলে দেয়,  ‘হিন্দু-মুসলমান দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে কঠোর দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব- অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাঙ্কে কোটি কোটি টাকা পাষাণ স্তূপের মত জমা হয়ে আছে- এই অসাম্যকে, এই ভেদজ্ঞান দূর করতে আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সঙ্গীতে, কর্মজীবনে অভেদ-সুন্দর অসাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম- অসুন্দরকে ক্ষমা করতে, অসুরকে সংহার করতে এসেছিলাম। আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না-‘।  তাই এমন কবিই বলতে পারেন, বড় কথা বড় ভাব আসেনাকো’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুঃখে/ অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে।

আজও কি তাঁর এই দুঃখ আমরা কতটুকু বুঝতে পেরেছি। ‘একজনে দিলে ব্যাথা–/ সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।/ একের অসম্মান/ নিখিল মানব-জাতির লজ্জা–সকলের অপমান!’ – মানবতার এ সুর আজ বাজে কি আমাদের মনে।

হৃদয়ে সেই সুর না বেজে উঠলে কবির ১১ই জৈষ্ঠ জন্মদিন স্মরণের সার্থকতা যে থাকে না তা তিনি নিজেই বলে গেছেন।

‘যেদিন আমি দূর তারার দেশে চলে যাব…তারপর হয়ত বা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা, কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামে। দেশপ্রেমিক, ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী বিশেষণের পর বিশেষণ। টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পড় মেরে- বক্তার পর বক্তা।

এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের…দিনে বন্ধু! তুমি যেন যেয়ো না। যদি পার চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ করো। তোমার আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি মরা, পায়ে পেষা ফুল পাও সেইটাকে বুকে চেপে ধরে বলো- বন্ধু,  আমি তোমায় পেয়েছি।’

 

ক্লিক করুন এখানে, আর চটপট দেখে নিন ৪ মিনিটে ২৪টি টাটকা খবরের আপডেট