নয় নিছক ভ্রমণ – সৌম্যেন্দ্র রায় চৌধুরী (সপ্তম ও শেষ কিস্তি)

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক: 

(ষষ্ঠ কিস্তির পর)…

আজ ৭ ই অক্টোবর ২০১৯।  বাড়ির পথে যাত্রা করব শুরু। অন্য দিনগুলোর মত আমার সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেছে। সৌম্য আর এখানে দেরী করতে রাজী নয়। ও খুব উৎকন্ঠায় আছে। কাল রাতের হৈ হুল্লোড়ে প্রধান ভূমিকা ছিল যোগেশের। সে কত রাতে কি অবস্থায় ঘুমোতে গেছে জানে না কেউ। পাহাড়ি রাস্তা। মাঝে মাঝেই ধ্বসের মুখে পড়তে হচ্ছে। সেই সব জায়গা পার হতে সময় লাগছে। এমনিতেই এখানে গাড়ির গতি খুব কম। ১১৭ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে হবে। ফেরার সময় যা হয়। অনেকেরই শরীর খারাপ হয়েছে। ঠিক সময়মত পৌঁছে ট্রেন ধরাটা দরকার। তাই একটু আগে বেরিয়ে পড়তে চায় ও।

কিন্তু আমাদের সারথি? তাকে সময়মত বার করা যাবে তো? আমরা সকলে বেরিয়ে পড়ার জন্য তৈরী। খোঁজ নিয়ে জানা গেল সে অনেক রাতেই নীচের একটা ঘরে ঘুমোতে গেছে। কিন্তু তার ঘুম ভেঙেছে কি? অমরনাথদা (আমার মেয়ের শ্বশুরমশাই) দায়িত্ব নিয়ে তাকে ঘুম থেকে তুললেন……।

 

আধঘন্টার মধ্যেই আমরা যাত্রা শুরু করলাম। আমি যোগেশের দিকে ভালো করে দেখলাম……। না সেরকম কিছু আলাদা নয়। ও অন্যান্য দিনের মতই। একটু আশ্বস্ত হলাম। যোগেশ আগেই জানিয়েছিল আমরা রংপো হয়ে ফিরব। অর্থাৎ আাসার সময় যে যে রাস্তা দিয়ে এসেছিলাম সে রাস্তা নয়। রোলেপ থেকে রংপোর দূরত্ব ২৫ কিলোমিটারের মত। রংপোর উচ্চতা ১০২৫ ফুট।

রংপোকে ‘গেটওয়ে’ অফ সিকিম বলা হয়। এন জে পি থেকে গ্যাংটকের দিকে আসতে গেলে  এন এইচ ১০ ধরে আসতে হবে। বাঁ দিকে তরঙ্গিনী তিস্তা। রংপোকে আধা গ্রাম; আধা শহর বলা চলে। নেপালী,ভুটিয়া,লেপচা প্রভৃতি জাতি ও উপজাতির বাস। শিক্ষিতের হার প্রায় ৭৮ শতাংশ। এখানে অনেক স্কুল, কিছু কলেজ ও কল কারখানা রয়েছে। বহুজাতিক ও প্রাইভেট  কিছু ওষুধ কোম্পানির কারখানাও আছে। আমাদের যাওয়ার পথে নয় খানা চোখে পড়ল। এর মধ্যে ‘সিপলা’-র মত নামী কোম্পানির কারখানাও দেখলাম।

পথে অনেকগুলো নদী পেরোলাম। রংপোর নামেও একটা নদী। তিস্তা অবশ্যই আছে। তার শাখা নদী রয়েছে দুটোর মত। এখানে জীবনের গতি মন্থর নয়। রংপো থেকে বেরোতেই তিস্তাকে ডানদিকে পেলাম। রাস্তার একটা বোর্ডে দেখলাম এন জে পি ৯১ কিলোমিটার আরো আড়াই ঘন্টার পথ। এখন গাড়ির গতি যথেষ্ট।  পেছন ফিরে সিকিমকে মনে মনে বিদায় জানালাম।  আর এদিকে হয়ত আসা হবে না। এখানকার প্রকৃতি ও মানুষেরা আমার মনে জায়গা করে নিয়েছে।  “তবু আবার আাসিব ফিরে” এ কথাটা বলতে পারলাম না।

 

গাড়ির ভেতরে নীরবতা। স্মৃতি কি ভারাক্রান্ত করে তুলেছে সবাইকে!? বাংলায় ঢুকে পড়েছি।  পাহাড় তবু আমাদের ছাড়েনি। তিস্তা এখন ডানদিক থেকে বা দিকে। জলের স্রোত কমেছে, গভীরতা বেড়েছে। স্বচ্ছতা কমেছে। বাংলার আর পাঁচটা নদীর মত অপরিচ্ছন্নতা বেড়েছে।

 

যোগেশকে চা খাওয়ার ইচ্ছে জানিয়েছি বেশ আগে। আরো আধঘণ্টা পর একটা বড় দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করাল। এখানেও দোকানে মালিক নয় মালকিন। বাঙালী নয় নেপালী।  বেশ বড় ও চালু দোকান। আমরা চা আর মোমো খেলাম। যোগেশ ভাত।

 

ওর বেশ পরিচিত দোকান সেটা বোঝা গেল।

 

আবার চলা শুরু। একেবার এন জে পিতে গিয়ে থামবে।

ইতিমধ্যেই আমরা সমতলে চলে এসেছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যে  স্টেশনের পার্কিং জোনে গাড়ি দাঁড়াল।

 

যোগেশ চটপট লাগেজ নামাতে শুরু করল। মনে হল ও আর বেশী সময় আমাদের সাথে থাকতে চায় না। সৌম্য,সৌমী, নাতি দীননাথবাবু ( মেয়ের খুড়ো শ্বশুর) সবাই যোগেশকে ধন্যবাদ ও বিদায় জানাল। আমি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানালাম।

মন প্রাণ দিয়ে ও দায়িত্ব পালন করেছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় ওর মত একজন বিশ্বস্ত সারথি না পেলে এ যাত্রা এতটা সুন্দর হয়ে উঠতে পারত না।

 

ওর আসন্ন দাম্পত্য জীবন সুখের হোক। ওর মনে য়ে স্বপ্ন আঁকা আছে তা বাস্তবতা লাভ করক।  এই শুভকামনা করলাম।

 

সৌম্য ওকে বিদায় জানিয়ে এসে বলল “ওর দুচোখের কোলে জল দেখলুম”….।

 

(লেখকের কথা- এই ভ্রমণ কাহিনি লেখার আগে আমি ঠিক করেছিলাম – লেখাটা এমন হোক যাতে পাঠকও আমাদের সাথে ভ্রমণ করবে। এ ভ্রমণ আর পাঁচটা ভ্রমণের মত নয়। প্রকৃতি- পাহাড়,মেঘ,আকাশ,কুয়াশা, নদী, ঝর্ণা, দূর্গম পাহাড়ের বুকে মানুষের জয়যাত্রায় নিশান। তাদের জীবনের বৈশিষ্ট্য। তার সাথে অবশ্যই আমাদের বীর সেনাবাহিনী। যারা এই দূর্গম অঞ্চলে নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমদের দেশের সীমানা ও আমাদের রক্ষা করছে। কতটা পারলাম তা পাঠকের বিচারের ওপর ছেড়ে দিলাম।

এটা লিখতে বিভিন্ন পর্যায়ে আমাকে যারা উৎসাহিত করেছেন তাদের অশেষ ধন্যবাদ।

বিভিন্ন তথ্যসূত্রঃ- সিল্করুট সম্পর্কিত নানা ওয়েবসাইট। ট্যুর কনডাক্টরের দেওয়া কিছু প্রচারপত্র আর যোগেশ তো ছিলোই)।

(সমাপ্ত)

(Sreemanta)

(Visited 23 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here