Lead NewsTop Newsঅসম

‘এন আর সি’ এক নজরে ফিরে দেখা

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক: এনআরসি নিয়ে উত্তাল গোটা দেশ ৷নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে আসামকে। আজ অসমে এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা বের হবে ৷ শুরু থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এনআরসি ৷ শুধু রাজনীতি নয়, পাড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাড়ির অন্দরমহল, সবজায়গায় আলোচনায় বিষয়বস্তু এই এনআরসি ৷

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে সমগ্র অসম জুড়ে ৫১ কোম্পানি সিএপিএফ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে । সূ্ত্রে খবর, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত জুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে ৷ ভারত-বাংলাদেশ ৪০৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে কঠোর নজরদারির বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷

অসমের জাতীয় নাগরিকপঞ্জিকরণ বা এনআরসি -ইস্যুতে যাবতীয় বিতর্কে বারবার উঠে আসছে অসম চুক্তি বা অসম একর্ড এর প্রসঙ্গ। সংসদে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ নিজের ব্যাখ্যা সম্প্রতি বলেছেন, রাজীব গান্ধী অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। অসমে নাগরিকপঞ্জিকরণ নিয়ে বিতর্ক তোলার অধিকার নেই কংগ্রেসের।

ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন্স অর্থাৎ এনাআরসি মানে এটি রাজ্যের বৈধ নাগরিকদের তালিকা ৷ এই জাতীয় নাগরিকদের নথিভুক্তকরণের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৪৮ সালের ১৯জুলাই থেকে৷ ১৯৪৮ সালে প্রথম কার্যকর হয় পশ্চিম পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স ৷ এরপর ১৯৫০ সালের ৮ এপ্রিল নেহরু-লিয়াকত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ৷ ১৯৫০ সালের ১ মার্চ সংবিধানে নথিভুক্ত হয় ইমিগ্র্যান্টস অ্যাক্ট (অনুপ্রবেশকারীদের অসম থেকে বহিষ্কার) ৷

প্রথমবার এই তালিকা তৈরি হয় ১৯৫১ সালে ৷ স্বাধীন ভারতের জনসংখ্যার পরিসংখ্যানের পাশাপাশি অসমের প্রথম এনাআরসি তালিকা প্রকাশিত হয় ৷ ১৯৫৭ সালে অনুপ্রবেশকারীদের অসম থেকে বহিষ্কারের আইন বাতিল করা হয় ৷১৯৬০ -এর ২৪ অক্টোবর অহমিয়াকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে অসম বিধানসভায় বিল পাশ হয় ৷ ১৯ মে ১৯৬১ সালে অসমের ব্যারাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ৷ এর ফলে সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রায় কয়েক হাজার শরণার্থীদের ভারতে অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ প্রকল্পের আওতায় অসম থেকে চলে যেতে বাধ্য হতে হয় ৷ ২৩ সেপ্টেম্বর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর থেকে ভারতে শরণার্থীদের প্রবেশের ফলে দাঙ্গার সূত্রপাত হয় ৷ ১৯৬৭ সালে অসম ছাত্র ইউনিয়ন সংগঠিত হয় ৷ এরপর ১৯৭১ -এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারতের উদ্বাস্তুদের নতুন দিশা দেখায় ৷ ১৯৭৮ সালে ভোটার তালিকায় অভিবাসীদের প্রবেশ করানো হয় ৷ ১৯৭৯ সালে অসমের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি নির্বাচন বয়কটের ডাক দেয় ৷ এরপর ১৯৭৯থেকে পরবর্তী তিন বছর অসম রাষ্ট্রপতি শাসনে ছিল ৷ এরপর প্রায় 6 বছর আন্দোলন চলে ৷ ১৯৮৩ তে অসমের ১৪ টি গ্রামে প্রায় ৩০০০ হাজার জনকে গণহত্যা করা হয় ৷ সেই বছরই অসমে বিধানসভা নির্বাচন করা হয় ৷ ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে অবৈধ শরণার্থী আইন পাশ হয়, যাতে ছিল ১৯৭১ এর ২৪মার্চের আগে যারা ভারতে এসেছিল তারাই এনআরসি-র অন্তর্ভুক্ত হবে ৷১৯৮৫ এর ১৫ অগাস্ট অসম আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে অসমের উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত হয় ৷

এরপর ও ১৯৯৭ সালে নির্বাচন কমিশন শরণার্থীদের নামের যে ভোটারের তালিকা প্রকাশ করে সেই নামগুলির পাশে “সন্দেহজনক” শব্দটি লেখা ছিল ৷ ২০০৩ সালে চালু হয় নাগরিকত্ব আইন ৷২০০৯ সালে অসমভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অসম পাবলিক ওয়ার্কস অবৈধ নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তিকরণের জন্য সুপ্রিম কোর্টে যায় ৷ এরপর ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে এনআরসি ইশুতে মন্ত্রীপরিষদের উপ-কমিটি গঠন করে ও নতুন পদ্ধতি জমা পড়ে ৷২০১৩- র অগাস্টে সুপ্রিম কোর্ট পিটিশন গ্রহণ করে ও এনআরসি তালিকা নবীকরণ ও গণনা প্রক্রিয়া শুরু করে ৷

২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে এই তালিকা নবীকরণের কাজ শুরু হয় ৷ ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে অসমে আসা ব্যক্তি ও তাঁদের বংশধরদের নামই এনআরসি-তে উঠবে বলে জানানো হয় ৷২০১৫ সালে এনআরসি নবীকরণের পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের কাজই শুরু হয় ৷ কয়েক দফায় তারিখ পিছোনোর পর ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম খসড়া প্রকাশিত হয় ৷ প্রায় ৩.২৯ কোটি আবেদনকারীর মধ্যে ১.৯। কোটি মানুষ এই তালিকার আওতায় পড়েনি ৷ এর জেরে ২০১৮ সালে অসম নাগরিকত্ব বিলের বিরোধিতায় বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু হয় ৷ ৩০ জুলাই, ২০১৮ সালে দ্বিতীয় খসড়ায় তালিকা প্রকাশিত হয় ৷ সেই তালিকায় ২.৮৯কোটি আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ৪০ লাখ মানুষ ছাড়া প্রত্যেকেই এই তালিকার আওতায় চলে আসে ৷

প্রসঙ্গত, এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকার প্রকাশের আগে অসমে অব্যাহত রাজনৈতিক তরজাও ৷ কোনও বৈধ ভারতীয় নাগরিকের নাম তালিকা থেকে বাদ গেলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কেউ ৷ কেউ আবার মুখ খুলেছেন এনআরসি-র সমর্থনে ৷ রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অল অসম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (AASU) মুখ্য উপদেষ্টা সমুজ্জল ভট্টাচার্য ৷ অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (AIDUF) বিধায়ক আমিনুল ইসলামের অভিযোগ, কেন্দ্রের শাসকদলের চাপের মুখেই কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারী প্রতীক হাজেলা ৷ এনআরসি আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও তোপ দেগেছেন আমিনুল ৷

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের দাবি, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে আতঙ্ক ও উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছে অসমবাসী ৷ যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে অসমে বসবাস করছেন, তাঁরাও বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন ৷ তিনি বলেন, “সঠিক উপায়ে এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হচ্ছে না ৷ এর ফলে, বিরূপ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে রাজ্য ৷ “রাজ্য বিজেপি সভাপতি রঞ্জিত কুমার জানিয়েছেন, কোনও বৈধ ভারতীয়র নাম এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকায় না থাকলে তাঁর পাশে দাঁড়াবে কেন্দ্র ৷ তিনি বলেন, “এটা দেশপ্রেমের প্রশ্ন ৷ প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিককে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ৷ এখানে ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির কোনও প্রশ্নই ওঠে না ৷ ধর্ম, জাতপাত বা ভাষার বিভেদ ছাড়াই প্রত্যেক ভারতীয়কেই আমরা সমর্থন করি ৷ “যদিও এনআরসি প্রসঙ্গে বিজেপি বিধায়ক শিলাদিত্য দেবের অভিযোগ, সবার নজর এড়িয়ে চূড়ান্ত এনআরসি তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে ৯৬-৯৭ শতাংশ অনুপ্রবেশকারী ৷

চলতি বছরের 8 জানুয়ারি লোকসভায় নাগরিকত্ব বিল পাশ হয় ৷এরপর চলতি সালের গুয়াহাটি হাইকোর্ট এনআরসি তালিকা পেশের জন্য ২২১ জন সদস্যের একটি ফরেনারস ট্রাইবুনাল তৈরি করে ৷ খসড়া তালিকাতেই ৪২ লাখ মানুষের নাম বাদ যায়। এঁদের বেশির ভাগই বাঙালি। এবার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশকে ঘিরে তাই টানটান উত্তেজনা।  এনআরসি-র কারণে অসমের মানুষের চূড়ান্ত উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। সঙ্গে রয়েছে মারাত্মক হীনমন্নতা। খসড়া তালিকায় বাদ পড়াদের বেশির ভাগই এখন মনোরোগের শিকার। এর ফলে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাশাপাশি  সারা অসম সংখ্যালঘু ছাত্র সংস্থা বা আমসু-র অভিযোগ, বেছে বেছে সংখ্যালঘুদেরই নির্যাতন করা হচ্ছে। এর আগেই ৪২ লাখ মানুষের নাম বাদ দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে খসড়া তালিকা। খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্তদের ২৯ শতাংশের তথ্য ফের যাচাই হয়েছে। উগ্র বাঙালি বিদ্বেষী বলে পরিচিত সারা অসম ছাত্র সংস্থা বা আসু অন্তত ৫ লাখ বাসিন্দার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। সবদিক বিচার করেই কয়েক লাখ মানুষকে বাদ দিয়ে প্রকাশ হতে চলেছে চূড়ান্ত তালিকা। বহু বিদেশি মুসলিমের নাম এনআরসি-‌তে থাকবে। এই অভিযোগ তুলে পথে নেমেছে বিজেপি ও তাদের লেজুড় সংগঠনগুলি। বিভিন্ন জায়গায় এনআরসি কেন্দ্রের সামনে ধর্না দিতে শুরু করেছে বিভিন্ন গেরুয়া সংগঠন। বিক্ষোভকারীদের পান্ডা শিলাদিত্য দেব বলে চলেছেন, ‘বাংলাদেশি মুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দিতে মরিয়া এনআরসি। তাই এর বিরোধিতা চলবে।’ মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, এনআরসি পছন্দ না হলে বিধানসভায় বিল এনে তাঁরা বাতিল করে দেবেন গোটা প্রক্রিয়া। এদিন আরও একধাপ এগিয়ে তিনি রাজ্যবাসীকে এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর শান্ত থাকার আর্জি জানান। সেইসঙ্গে জানান বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবে তাঁদের সরকার।

অন্যদিকে, খসড়া তালিকায় বাদ পড়াদের গ্রাস করেছে আতঙ্ক। ন্যাশনাল ক্যাম্পেন এগেনস্ট টরচার (এনসিএটি)-র সমীক্ষায় উঠে এসেছে সেই তথ্য। গত মাসের ১৬ থেকে ২০ জুলাই অসমের বক্সা, গোয়ালপাড়া ও কামরূপ জেলায় এনআরসি-ছুটদের মধ্যে সমীক্ষা চালায় তারা। সম্প্রতি প্রকাশিত হয় তাদের সমীক্ষার রিপোর্ট। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে এনআরসি-ছুটদের মধ্যে ৮৯ শতাংশই ‘চূড়ান্ত উদ্বেগ’-এ দিন কাটাচ্ছেন। বাকি শতাংশও রয়েছেন ‘স্বাভাবিক উদ্বেগ’-এ। মাত্র ১ শতাংশের অভিমত, তেমন কিছু হবে না এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর।

(শ্রেয়শ্রী)

 

 

(Visited 902 times, 2 visits today)

Tags

Related Articles

Back to top button
Close
Close