কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ জ্যোতি বসু

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক | July 8, 2019 | 7:12 am

পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী ও জননেতা জ্যোতি বসু ভারতের রাজনীতিতে এক অনন্য নজির। গোটা দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। জ্যোতি বসুই ভারতের একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী, তিনি ১৯৭৭ সালের ২১ জুন থেকে ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত একটানা ২৩ বছরের বেশি সময় ধরে ওই পদে বহাল ছিলেন।

জ্যোতি বসুর জন্ম ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুলাই কলকাতার ৪৩/১ হ্যারিসন রোডস্থ(বর্তমান মহাত্মা গান্ধী রোড) বাসভবনে। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল জ্যোতিরিন্দ্র বসু। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ঔপনিবেশক শাসনের অবসানের পর স্বাধীন হল ভারত। স্বাধীনতা লাভের উৎসব শেষ হলে নতুন উদ্যমে সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন জ্যোতি বসু। কমিউনিস্ট পার্টির নতুন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটি বা ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি’ গঠন করা হল– জ্যোতি বসু এই কমিটির অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হলেন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ তারিখে কংগ্রেস সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। পরদিন জ্যোতি বসুকে পুলিশ গ্রেফতার করে। প্রেসিডেন্সী জেলে শুরু হল জ্যোতি বসুর প্রথম কারাজীবন। তিন মাস পর মুক্তি পেলেন তিনি।

৫ ডিসেম্বর ১৯৪৮ আলিপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বীরেন্দ্রনাথ বসুর কন্যা কমল বসুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন তিনি। বিয়ের পর তিন মাস পুরো হওয়ার আগেই আবার তাঁকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নিল পুলিশ। ১৮ জানুয়ারি ১৯৫২’র বিধানসভার নির্বাচনে বরাননগর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে জিতে গেলেন জ্যোতি বসু। এবার বিধানসভায় তিনি বিরোধী পক্ষের নেতা মনোনীত হলেন। বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক আইনের বিরূদ্ধে তিনি শক্ত অবস্থান নিয়ে অটল ছিলেন। ১৯৫৩-এ কমিউনিস্ট পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন তিনি। পার্টি সংগঠনের অনেকটা দায়িত্ব বেড়ে গেল।

১৯৬০-এর দশকে জ্যোতি বসুর ওপর বেশ কয়েক বার হামলা হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে মে দিবসের আগের দিন বরাননগরে এক শ্রমিক সমাবেশে যাওয়ার পথে কংগ্রেসী পতাকা হাতে একদল সন্ত্রাসী তাঁর গাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনের তিনি বরাননগর এলাকা থেকে ধীরেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জিকে পরাজিত করে বিধানসভার সদস্য হলেন; বিধানসভায় বিরোধীয় দলীয় নেতাও হলেন তিনি।

১৯৬২’র ২০ জুন চিন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ শুরু হলে সারা ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির ওপর নেমে আসে নির্যাতন। কালীঘাটে কুশপুত্তলিকার দোকানে জ্যোতি বসুর কুশপুত্তলিকা বিক্রয় হতো। তাঁকে “চিনের দালাল”, “দেশদ্রোহী” ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করে রাস্তায় সেগুলো পোড়ানো হতো। গোয়েন্দা পুলিশ সর্বত্র অনুসরণ করত তাঁকে। যুদ্ধ স্থায়ী হল মাত্র ১৪ দিন; কিন্তু এর মধ্যে জ্যোতি বসুকে এক কাকডাকা ভোরে গ্রেফতার করে টানা ১ বছর কারাবন্দী করে রাখা হল। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ডিসেম্বর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের আধিপত্য খর্ব হল। গঠিত হল অ-কংগ্রেসী কোয়ালিশন সরকার। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ২ মার্চ জ্যোতি বসু দ্বিতীয় বারের মতো পশ্চিমবঙ্গের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে জ্যোতি বসু পুনর্বার বরাননগর থেকে নির্বাচিত হলেন, আবার বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এল; জ্যোতি বসু আবারও উপমুখ্যমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র দায়িত্ব পেয়ে তিনি পুলিশকে “জনগণের বন্ধু” হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করলেন।

এরপর ৯ মার্চ ১৯৭১-এ অনুষ্ঠিত হল মধ্যবর্তী নির্বাচন। কিন্তু রাজনীতি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। সরকার গঠন হতে না-হতেই জারী করা হল রাষ্ট্রপতির শাসন। পরবর্তী নির্বাচন ১১ মার্চ ১৯৭২। জ্যোতি বসুর ভাষায় “বাহাত্তরের নির্বাচনটা ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের এক নির্লজ্জ প্রহসন। আমি সেদিন আমার নির্বাচনী এলাকা বরাননগরে ঢুকতেই পারিনি।

১৯৭৭ পর্যন্ত কয়েকটি বছর দুঃসময়ের কাল। এরই মধ্যে ইংল্যান্ডের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বিলেত ভ্রমণ করলেন জ্যোতি বসুর। লন্ডনে নানা সভা-সমিতি করে তিনি সফর করলেন বেলজিয়াম, জার্মানি, হল্যান্ড প্রভৃতি কয়েকটি দেশ। ভারতে তখন নানা সমস্য। একদিকে খাদ্যঘাটতি, অন্যদিকে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কলহ।

১৬ মার্চ ১৯৭৭-এ অনুষ্ঠিত লোকসভার নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিধ্বস পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূত্রপাত। সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে জনতা দল সরকার গঠন করল। প্রধানমন্ত্রী হলেন মোরারজি দেশাই। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনেও সার্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা গেল। সাতগাছিয়া থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে জ্যোতি বসু নির্বাচিত হলেন। তাঁর দল সিপিআইএম পরিষ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করল। পশ্চিমবঙ্গে গঠিত হল বামফ্রন্ট সরকার; মুখ্যমন্ত্রী হলেন জ্যোতি বসু। বামফ্রন্টের ৩৬ দফা কর্মসূচীর ওপর জোর দিলেন তিনি।

মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে দেশ শাসনের দর্শন ব্যক্ত করে জ্যোতি বসু বলেন, “আমরা রাইটার্স বিল্ডিং থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করব না, আমরা আমাদের কর্মসূচী রূপায়ণ করব মাঠ আর কারখানা থেকে, জণগণের সহায়তা নিয়ে, কারণ এরাই আমাদের ক্ষমতার উৎস।” ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠান তাঁর একটি প্রধান অর্জন। এছাড়া গ্রামীণ বাংলায় ভূমিসংস্কারও একটি বিরাট সাফল্য। ১৯৭৯-এর গোড়ার দিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেন। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের লোকসভার নির্বাচনে জিতে ইন্দিরা গান্ধী আবার ক্ষমতায় এলেন। কেন্দ্রের অসহযোগিতা সত্ত্বেও জ্যোতি বসু সরকার পরিচালনা করে গেলেন দৃঢ়তার সঙ্গে। তাঁর সাফল্য পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ের পথ সুগম করে দিল।

২০০০ সালের ২৮ জুলাই সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক চলাকালীন হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন জ্যোতি বসু। তাঁকে প্রথমে ভর্তি করা হয় রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালে; পরে নিয়ে যাওয়া হয় অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসে। চিকিৎসার পর পরদিন সন্ধ্যায় ছাড়া পান বসু। ১৫ অগস্ট নিজেই জানান ১৫ সেপ্টেম্বরের পর অবসর নিতে চলেছেন তিনি। তবে পার্টির চাপে অবসরের তারিখ নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পিছিয়ে যায়।

৩ নভেম্বর শেষ বারের মতো পশ্চিমবঙ্গ সচিবালয় মহাকরণে আসেন বসু। ৫ নভেম্বর রাজারহাট নিউটাউনে একটি আবাসিক ভবনের অনুষ্ঠানে যান; এটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ সরকারি অনুষ্ঠান। তারপর তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হলে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি বসু বিধাননগরের অ্যাডভান্সড মেডিকেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে(আমরি হসপিটাল) ভর্তি হন। ১৬ জানুয়ারি তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে পড়ে এবং তাঁর একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে থাকে। ১৭ দিনের দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় সময় সকাল ১১টা ৪৭ মিনিটে জ্যোতি বসুর জীবনাবসান হয়।

জ্যোতি বসুই ভারতের একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী, তিনি ১৯৭৭ সালের ২১ জুন থেকে ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত একটানা ২৩ বছরের বেশি সময় ধরে ওই পদে বহাল ছিলেন।

ক্লিক করুন এখানে, আর চটপট দেখে নিন ৪ মিনিটে ২৪টি টাটকা খবরের আপডেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *