জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রকৃত উৎস

দোয়েল দত্ত: উৎসব, পুজো ও পার্বণ এই তিনটি শব্দ বাঙালির জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল, আছে ও থাকবে। দেবীপক্ষ ও কালীপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই জগদ্ধাত্রী পুজোর আমেজ। শহর কলকাতায় খুব বেশি মাত্রায় না হলেও আশেপাশের জেলা শহরে বিশেষ করে কৃষ্ণনগর ও চন্দননগরে এই পুজোর আনন্দে মাতোয়ারা গুঁড়ো থেকে বুড়ো সকলেই। চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোকে নিয়ে যতই হইচই হোক না কেন, জানেন কি এর উৎস কৃষ্ণনগরে।

সময়টা সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিক। ইতিহাসের সমর্থিত সূত্র জানাচ্ছে, নদিয়ায় তখন রাজা মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রমরমা। আর জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোর কথা সকলের মুখে মুখে ঘুরত। মহালয়া থেকে শুরু করে টানা ১৭ দিন দেবী বন্দনায় মুখরিত হত কৃষ্ণনগরের আকাশ-বাতাস। দিল্লির দরবারে তখন মোঘল রাজত্বের রবিও অস্তাচলে। মোঘলদের পৃষ্ঠপোষক বাংলার নবাব আলিবর্দি খান বিশেষ কারণে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর পুত্র কুমার শিবচন্দ্রকে দুর্গাপুজোর সময় কারারুদ্ধ করেন। কিন্তু দুর্গানবমীর দিন কৃষ্ণচন্দ্র পালিয়ে গিয়ে খালি পায়ে উন্মাদের মতো ছুটতে থাকেন মায়ের পুজোর জন্য। কিন্তু বিধি বাম মাঝরাস্তায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

রাত্রে তিনি স্বপ্ন দেখেন এক সুন্দরী কন্যা দেবীরূপে আবির্ভূতা হয়ে তাঁকে পুজোর নির্দেশ দিচ্ছেন। আর বলছেন তিনি মা দুর্গার অন্য এক রূপ এবং পরবর্তী শুক্লানবমীতে যেন তাঁর পুজো করা হয়। স্বপ্নে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র যে অপরূপ দেবীমূর্তিকে দেখেছিলেন তাঁর বাহন সিংহ এবং হাতে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, ধনুর্বাণ। কালবিলম্ব না করে দ্রুত রাজধানীতে ফিরে এসে পুরোহিতদের সঙ্গে আলোচনা করে জানতে পারেন ইনিই সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রী, আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে দ্রাবিড় সভ্যতায় তাঁর পুজো করা হত। সেই থেকে আজও কৃষ্ণনগরে ধূমধাম করে এই পুজো হয়।

তবে উন্মাদনা, প্রচার আর জনপ্রিয়তার নিরিখে যদি বিচার করা হয় তাহলে বর্তমানে কিন্তু এগিয়ে চন্দননগর। প্রচুর পুজো চোখধাঁধানো প্যান্ডেল ও অপরূপ আলোর আকর্ষণে আগত দর্শনার্থীদের ঢল নামে। চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর হাত ধরে যিনি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন ঘটনাচক্রে। অন্য একটি মতবাদ অনুসারে, চন্দননগরের সবথেকে বড় চালের আরত লক্ষ্মীগঞ্জ বাজার। একবার কৃষ্ণনগর থেকে বেশকিছু ব্যবসায়ী এসে চন্দননগরে প্রবল বর্ষায় আটকে পড়েন। সময়টা ছিল জগদ্ধাত্রী পুজোর, ফেরার কোনও উপায়ন্তর না দেখে সেখানেই দেবীপুজোর সিদ্ধান্ত নেন। এভাবেই নাকি শুরু হয়েছিল চন্দননগরের প্রথম পুজো।

ইতিহাসের মতবাদ ভিন্ন হলেও আজও সনাতনী ঐতিহ্য বজায় রেখে সর্বত্রই ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়ে চলেছে জগদ্ধাত্রী পুজো।

sweta

(Visited 23 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here