গণতন্ত্রের স্বপক্ষে হোক অহিংসার সংগ্রাম 

0
23

নরেন্দ্রনাথ কুলে

সম্প্রতি সতেরোতম লোকসভা নির্বাচনে বিশেষ করে বাংলায় একইরকম হিংসা দিয়েই শেষ হয়েছে। ফল প্রকাশের পরেও হিংসার ধারাবাহিকতা এখনো বজায় আছে। তার জন্য পরস্পরবিরোধী চাপানউতোর চলছে ও চলতে থাকবে। তবুও কোনো দলই জোর দিয়ে সবাই একসাথে এই হিংসা বন্ধ করার জন্য এগিয়ে আসছে কোথায়। তাহলে হিংসা বন্ধ না হয়ে ক্রমশ বাড়তে থাকবে এটাই কি স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতা কেন ? তার উত্তরের জন্য  কয়েকটি নমুনার দিকে তাকালে হয়তো বোঝা যেতে পারে।

এক- এবারের নির্বাচনে সবথেকে বেশি সকলের  নজর কেড়েছে বড় দলগুলোর নেতাদের পরস্পরের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া সৌজন্যহীন অশালীন কথা।

দুই- সারা দেশে লোকসভা প্রার্থীর ১৯% খুন, ধর্ষণে অভিযুক্ত। এই সংখ্যাটা ২০০৪ সালে ছিল ১৫%। দু’বছরের বেশি কারাদণ্ডে অভিযুক্ত বিজেপির ৪০% প্রার্থী ও কংগ্রেসের ৩৯% প্রার্থী ছিল এই নির্বাচনে।

তিন- হলফনামা অনুযায়ী গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত এই নির্বাচনে ১৩% প্রার্থী ছিল।

চার- এডিআর-এর সমীক্ষায় এবারে উঠে এসেছে বিভিন্ন দলের নেতাদের কাছ থেকে ইডি কত টাকা, মদ, সোনা বাজেয়াপ্ত করেছিল।

 

একসময় বিশেষ করে গত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত গুন্ডা-মাফিয়ারা রাজনৈতিক দলকে বাইরে থেকে প্রার্থীকে সাহায্য করতো যাতে প্রার্থী বিজয়ী হলে পুলিশি গ্রেপ্তার থেকে তাদের বাঁচায় বা তাদের অপকর্মে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। আর এখন এরাই নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জনপ্রতিনিধি হয়ে নিজেরাই সব প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণ করে।

এই চারটি নমুনা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য কেমন হবে। অর্থাৎ রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মদতেই বাড়ছে। কারণ এই দলগুলো এই ধরণের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিচ্ছে। তাহলে নির্বাচনকে হিংসামুক্ত করা আদৌ কি সম্ভব হবে?

এছাড়াও আরো দু’একটি নমুনার উল্লেখ করলে এই দুর্বৃত্তায়ন রাজনীতির পরিচালনা কাদের হাতে তা বেশ পরিস্কার হয়ে যাবে।

পাঁচ- ভোটের হলফনামায় অনেক প্রার্থীর পেশা হিসেবে দেখানো হয়েছে সর্বক্ষণের রাজনীতি।

এই ‘সর্বক্ষণের রাজনীতি’ শব্দটি দিয়ে একজন সমাজসেবী হিসেবে দেখানো যেতেই পারে। কিন্তু তার মধ্যে কোনো দুর্নীতি থাকবে না বা নেই এ কথাটা বলা যায় কি। আর একটি কথা রাজনীতি কখনও পেশা হতে পারে না।

ছয়— এই নির্বাচনে ২৯% প্রার্থী কোটিপতি। যেখানে বিজেপির ৮৩% প্রার্থী ও কংগ্রেসের ৮৩% প্রার্থী কোটিপতি।  বাংলার ২৩% প্রার্থী কোটিপতি।

২০১৪ সালে ৫৪৩ জন সাংসদের মধ্যে  ৪৪২ জন অর্থাৎ প্রায় ৮০%-এর বেশি কোটিপতি ছিলেন। তাহলে দেশের ৯৫% গরিব-নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষের প্রতিনিধি কারা ?

২০১৪ সালের নিরিখে বলা যায় পার্লামেন্ট একটা ধনীদের প্রতিষ্ঠান। ২০১৯ সালের নির্বাচনের ফলেও সেই একই ধারা বজায় থাকল। এবার কোটিপতি সাংসদ সংখ্যা ৪৭৬ যার মধ্যে বাংলার ৩১ জন সাংসদ আছে। তাহলে বলা যায় এই ধনী সাংসদরা কি গরিবের হয়ে কাজ করে ?  কোনো বিল জনবিরোধী হলেও পাশ করতে এরাই ত সম্মতি দেয়।

আরো অবাক লাগে এই কোটিপতি সাংসদরা নিজেদের ভাতা বাড়ানোর জন্য নির্লজ্জভাবে আন্দোলনও করে।

এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটি লাইন আজও প্রাসঙ্গিক–‘ এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি।’

এই সমস্ত নমুনা থেকে একটি অতি পরিচিত কথা আবার বলতে হয় যে গণতন্ত্রের সাথে ‘মানি পাওয়ার’ আর ‘মাসল পাওয়ার’ শব্দগুলো আজ দ্রবীভূত হয়ে গণতন্ত্রকে দুর্বল করে কি যাচ্ছে না ?  rigging আর ragging শব্দদুটো দিনের পর দিন নতুন নতুন ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।  সতেরোতম লোকসভা নির্বাচনে প্রতি দফায় তার প্রতিফলন প্রকটভাবে দেখা গেছে। এর জন্য কোনো রাজনৈতিক দলই অনুতপ্ত নয়। অথচ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সবসময়ই এরা বলে থাকে। যার জন্য সব দলই দাবি করে এ কেবল নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। যেন দলগুলোর কোনো দায়িত্ব নেই। আগের পয়েন্টগুলোর দিকে তাকালে আর আশ্চর্য হওয়ার সত্যি কোনো  কারণ থাকে না।

এমন পরিবেশে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও দুর্নীতিমুক্ত গণতন্ত্র পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা – এ প্রশ্নের উত্তর সকলের নজর এড়িয়ে আজ আর যেতে পারে কি।

সদ্য সমাপ্ত এমন নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের কাছে প্রকৃতপক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ যারা সেই জনসাধারণ তাদের হাসি কি শেষ পর্যন্ত থাকবে ?

হিংসার পরিবেশ নিয়ে  সরকার পারবে কি হিংসা দূর করতে।  সেটা আজকে দিনে হয়তো সোনার পাথরবাটি। কারণ আজকের সময়ে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন যেভাবে বেড়ে চলেছে, সেখানে রাজনৈতিক বৃত্তে এই দুর্বৃত্তায়ন কখনই হিংসামুক্ত হতে পারে না। তাহলে  দুর্বৃত্তায়ন, হিংসা ও গণতন্ত্র আজকে পরস্পরের সমর্থনে কি রাজনৈতিক চিন্তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে ? এভাবে চলতে থাকলে আমরা কোথায় পৌঁছে যাচ্ছি, তা কি একবারও ভাববো না ?

আর কয়েক মাস পরে গান্ধীজীর সার্ধশত জন্মবার্ষিকী মহা ধুমধামে পালিত হবে।  তাঁর অহিংসা বাণী নিয়ে কত চর্চা হবে।  অথচ সে বাণী নীরবে থেকে যাবে। সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং যে দল সরকারে এল গণতন্ত্র বাঁচাতে অহিংসার জন্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে কি ?  নাহলে আগামী প্রজন্মের সামনে বাঁচার আদর্শটা হয়তো হারিয়ে যাবে।

 

(Visited 4 times, 1 visits today)