অভিনব কায়দায় শহরে রমরমিয়ে চলছে অবৈধ দেহ ব্যবসা ও মধুচক্র

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক | August 5, 2019 | 7:05 am

শংকর দত্ত, কলকাতা: গত কয়েকবছর ধরেই রাজধানী কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় রমরমিয়ে চলছে মধুচক্রের ব্যবসা। কোথাও পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে তো কোথাও পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে স্পা, লেডিস সেলুন কিংবা ফিজিওথেরাপি বা ব্যায়াম সেন্টারের আড়ালে। কোথাও আবার বডি ম্যাসেজ পার্লার কোথাও আবার ফ্রেন্ডশিপ ক্লাবের নামে কাগজে রেগুলার বিজ্ঞাপন দিয়েই ধরা হচ্ছে খদ্দের। এক একটা ঠেক হয়ে উঠেছে বালি খাদানের মতোই যেন নারী-খাদান।

কোথাও কোথাও পুলিশ যে একদমই জানে না ব্যাপারটা এমন নয়। তারা কাজও করছে নিয়মমাফিক। বহু জায়গায় ধরা পড়তেও দেখা যাচ্ছে এই সব চক্রের পান্ডা-সহ এই কাজে লিপ্ত পুরুষ-মহিলাদের। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ বা রাজ্য পুলিশের একাংশ এই বিষয়টা নিয়ে সদা তৎপর। তা সত্ত্বেও তাঁদের ফাঁকি দিয়েই অনেক জায়গাতেই জমে উঠছে এই ব্যবসা। এখন আবার অনেক বড় বড় আবাসন কমপ্লেক্সের ভিতরেও কেউ কেউ এইসব বেআইয়িনী কারবার করছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে জানা গেল স্পা, সেলুন এই গুলোতে মোটামুটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের পার্মানেন্ট কাস্টোমার থাকে। এই সব ক্ষেত্রে মূলত বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমেই খোঁজ খবর নিয়ে আসেন কাস্টোমাররা। কোথায় গেলে কতটা নিরাপত্তা, কত ঘন্টায় খরচ কেমন, সব জেনে-বুঝে নিয়েই আসেন তাঁরা। এদের অনেকে আবার ইন্টারনেট বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিনব কায়দায় কাস্টোমার ধরে থাকেন সূত্রের খবর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ কলকাতার এক স্পা এর মালিককে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি এড়িয়ে যান। পরে অবশ্য বলেন, আসলে দাদা কিস্যু ব্যাপার না, পুলিশ সেটিং টাই আসল ব্যাপার। আমাদের এখানে কোনও ঝামেলা নেই। তিন বছর ধরে আমরা স্পা চালাচ্ছি। কাস্টোমার আমাদের ফিক্সড। তবে অনেকেই নতুন নতুন রেফারেন্স নিয়ে আমাদের ফোন করেন। আমরা কাস্টমারকে অনেক ঝেলে নিয়ে তবেই আসতে বলি।

অন্যদিকে শিয়ালদা স্টেশনের এক ও দুই নম্বর প্লাটফর্মের সামনে দিয়ে সোজাসুজি বেরোন। বাইরে বটতলায় পুরুষদের যে হাটখোলা প্রসাবাগার আছে, এখানে গেলেই নিয়মিত ডিটিপি করা সাদা পোস্টারে এক অভিনব বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন। যা যেকোনো বেকার শক্ত-সামর্থ যুবককে ফাঁদে ফেলতে যথেষ্ট। বিজ্ঞাপনে লেখার মূল বিষয় দেখলে চমকে যাবেন যে কেউ। হেডিং- “রথ দেখুন কলা বেচুন” তার নিচেই লেখা ‘মাত্র ১৫০০ দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে সারা বছর বড় ঘরের মহিলাদের সঙ্গে যৌবন তৃষ্ণা মিটিয়ে ফুলটুস মস্তি নিন এবং মাসে কমপক্ষে ১৮ হাজার রোজগার করুন। খদ্দের আমরাই দেব। তবে কেবল মাত্র শক্ত-সামর্থ যুবকরাই ফোন করবেন’ জাতীয় পোস্টার।

শিয়ালদার দায়িত্বে থাকা রেল পুলিশ এর এক আধিকারিককে জানতে চাইলাম, রেলের জায়গায় রীতিমতো ফোন নম্বর দিয়ে এই ধরনের বিজ্ঞাপন। আপনারা ব্যবস্থা নেন না? তাঁর উদাসীন উত্তর, ‘ ব্যবস্থা যে নেওয়া হয় না তা নয়। ধরে আনবার পর কিছুদিন বন্ধ থাকে। তারপর আবার যেই কে সেই। তবে এ ব্যাপারে পাব্লিককেই সচেতন হতে হবে আগে। বুঝতে হবে এগুলো ফাঁদ পাতা জাল।’

একটি সর্বভারতীয় দৈনিকের শ্রেণীবদ্ধ কলমে এই জাতীয় একটা বিজ্ঞাপন। হেডিং “হাত বাড়ালেই বন্ধু”। তারপরই আছে ‘ নিজের ইচ্ছা মত নিজের এলাকায় বা কলকাতায় মহিলা বন্ধু করুন। আমাদের ক্লাবের মেম্বার হয়ে বোল্ড রিলেশন করুন। চাইলে সঙ্গীকে নিয়ে কাছে পিঠে ঘুরেও আসতে পারবেন। রিয়া….’ বলে একটা মোবাইল নম্বর দেওয়া। বার কয়েক ফোন করেও শুধু ব্যস্ত দেখালো। মনে হলো, রোববারের বাজার, দুপুরে কচি পাঠার ঝোল খেয়ে বউয়ের আড়ালে পাশের ঘরে গিয়ে অনেক বাবুই হয়তো ফোন করছেন।

শেষমেষ আমার ভাগ্যেও সিকে ছিঁড়লো। সুন্দরী কণ্ঠের ‘রিয়া’ ফোন ধরেই আমার রীতিমতো ইন্টারভিউ করা শুরু করলেন। কোথায় থাকি, কত বয়স, কেমন বয়সের বান্ধবী খুঁজছি, কোথায় তাকে নিয়ে ঘুরতে যেতে চায়, নাকি তাঁর সঙ্গে কলকাতাতেই ডেটিং করতে চাই এইসব। আমি একটার পর একটা উত্তর দিলাম। শেষমেশ জানতে চাইলাম, ‘খরচ কেমন।’ তার একটাই কথা ‘আগে তো মেম্বার হোন।’ মাত্র ৫০০ টাকায় সদস্যপদ। সদস্য হলেই তারা যতক্ষন না পছন্দ হয় আমায় ৩ মাসে ১২ টি সুন্দরী মহিলার কন্টাক্ট নম্বর দেবে।

যদিও ওই টাইম পেরিয়ে গেলে বা আমার উক্ত মহিলাদের সঙ্গে ঠিক ম্যাচ না করলে আবার নতুন করে সদস্য পদ নিতে হবে। জানতে চাইলাম ‘আপনাদের অফিস কোথায়? ওখানে গিয়ে মেম্বারশিপ নিলে কি আমায় ছবি দেখতে পারবেন বা ওই দিনই কোনও সুন্দরী মহিলাকে সামনা-সামনিই আলাপ করতে পারবেন, তেমন কোনও সুযোগ আছে?’ এইবার জনৈক ‘রিয়া দেবী’ একটু বিরক্তই হলেন! বললেন ‘আপনি কি পুলিশের লোক নাকি রিপোর্টার বলুন তো?’ আমি খানিকটা সাহসে ভর করেই বললাম ‘দিদি পাতি ব্যবসায়ী। একটা ভালো মাল চাই, পারবেন কি দিতে? টাকা যা লাগে দেব।’ এইবার তিনি খানিকটা আন্তরিক হয়েই বললেন, ‘আসল কথাটা বললেই তো হয়। এত প্রশ্ন করেন কেন? আমি আর বলতে সাহস পেলাম না যে আপনিও তো কম প্রশ্ন করেন না।’

যাইহোক শেষমেশ তিনি জানালেন তাঁদের অফিস কেস্টপুরে। তবে অফিসের ঠিকানা বলার নিয়ম নেই । মেম্বার হওয়ারও আধুনিক নিয়ম। আগ্রহীদের ব্যাংক একাউন্ট দিয়ে দিচ্ছেন। টাকা ব্যাংকে দিয়েই রশিদ হোয়াটসআপ করে পাঠাতে হবে। সেখানেই নাম মেম্বার কোড লিখতে হবে। আর সঙ্গে সঙ্গে সেইদিনই প্রথম এক সুন্দরীর ছবি ও ফোন নম্বর দিয়ে দেবেন তাঁরা। ক্লাবের কর্মকর্তাদের আপনি কোনোদিনই চিনতে পারবেন না, দেখাও হবে না। সবটাই হবে ফোন আর হোয়াটসআপ মারফত।

এই পুরো বিষয়টা সল্টলেকে কর্তব্যরত এক চেনা গোয়েন্দা অফিসারকে জানালাম। জানতে চাইলাম এইগুলো বন্ধ করা যায় না? তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা এগুলো নিয়ে রেগুলার মনিটরিং করি। তবে কেউ কমপ্লেন করলে ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এর আগে। তবে তাঁর কথায় আর একটা বিষয়ও স্পষ্ট, তিনি বলেন এমনিতেই রাজ্যে প্রতিদিন এত নানা ধরনের ক্রাইম হচ্ছে। রেগুলার এত কেস আসছে সেগুলো তদন্ত করতেই আমাদের সময় চলে যাচ্ছে। নতুন করে সতস্ফূর্ত ভাবে আর সব সময় উদ্যোগ নেয়া হয় না সব সময়। তবে রাজ্য পুলিশ যথেষ্ট সজাগ। আমরা সবসময় ই এই বিষয় গুলিতে নজরদারি রাখি। এবং অনেক ক্ষেত্রে আমরাই খদ্দের সেজে এমন অনেককেই পাকড়াও করেছি সে নজির আছে।’একই সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, ‘অদ্ভুত লাগে আজকের মতো ডিজিটাল যুগেও মানুষের মন বা মস্তিষ্ক কেন উন্নত হচ্ছে না। মানুষ তো জানেন, এই গুলো খারাপ বিষয়। এইসব জায়গায় গেলে ঠকতে হতে পারে, কোনো ক্রাইমের সঙ্গেও জড়িয়ে পরা অসম্ভব নয়, এর পরেও মানুষ কেন যায় এইসব জায়গায়?’ বন্ধু অফিসার টির অকপট উত্তর ও জিজ্ঞাসা শুনে আমিও সেই থেকে ভাবছি, “মানুষ যায় বলেই তো এদের এতো রমরমা, সত্যিই তো কেন যায় মানুষ?”

ক্লিক করুন এখানে, আর চটপট দেখে নিন ৪ মিনিটে ২৪টি টাটকা খবরের আপডেট