এনআরএস কান্ডের জেরে জেলায় জেলায় ডাক্তারদের বিক্ষোভ

এনআরএস কান্ডের জেরে ডাক্তার ও নার্সদের বিক্ষোভ ও মিছিল

এনআরএস কান্ডের জেরে উত্তর থেকে দক্ষিণ জেলায় জেলায় ডাক্তারদের কর্মবিরতি, বিক্ষোভ। বন্ধ আউটডোর পরিষেবা। রোগীরা কার্যত নাজেহাল। আজ সকাল থেকেই একই ছবি ধরা পড়েছে জেলার সব হাসপাতালগুলিতে।

উত্তর বঙ্গঃ জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনে বুধবার সকাল থেকেই স্তব্ধ উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। এদিন সকাল থেকেই বন্ধ আউটডোর বিভাগ। যার জেরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা কার্যত নাজেহাল হচ্ছে। প্রচুর মানুষ এদিন চিকিৎসা করাতে এসেও বিনা চিকিৎসায় ফিরে যেতে হচ্ছে। তবে এই আন্দোলনকে ঘিরে যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় তার জন্য মেডিকেল চত্বরে মোতায়েন করা হয়েছে প্রচুর পুলিশ।

উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে বন্ধ পরিষেবা

বারুইপুরঃ বারুইপুর হাসপাতাল ও বারুইপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ব্যাহত চিকিৎসা পরিষেবা। বন্ধ আউটডোর। ভোর পাঁচটা থেকে অনেকেই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সকা ৯টা থেকে আউটডোরের টিকিটও দেওয়া হয়। চিকিৎসা করাতে আসা সমস্ত রুগীরাই ২টাকা দিয়ে সেই টিকিটও কাটেন। তারপর সকলেই আউটডোরে চিকিৎসার জন্য লাইন দিলেও ডাক্তারদের দেখা পাওয়া যায়নি। আদৌ চিকিৎসা হবে কিনা সেই সংশয় নিয়েই এখনও অপেক্ষায় রুগীরা।

অন্যদিকে হাসপাতালের সুপার অচিন্ত্য গায়েন জানান, প্রতিকী ধর্মঘট চলছে। পরিষেবা চালু রয়েছে। ইমার্জেন্সি পুরোপুরি চালু আছে বলেই জানান তিনি।

বীরভূমঃ ডাক্তারদের কর্মবিরতি, ৫২ দিনের শিশুকে নিয়ে চরম ভোগান্তি দম্পতির। গতকালই এনআরএস কাণ্ডের জেরে রাজ্যজুড়ে কর্মবিরতির ডাক দিয়েছিল ডাক্তারেরা। সেই মতো আজ সকাল থেকেই রাজ্যজুড়ে ১২ ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। ডাক্তারদের পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী আজ সকাল ৯ টা থেকেই বন্ধ সমস্ত রকম সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা, এমনকি আউটডোরও। এই কর্মবিরতি চলবে আজ রাত্রি নটা পর্যন্ত। কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে ডাক্তারদের সংগঠন ডক্টর ফোরাম। এই কর্মবিরতির ফলে চরম সমস্যায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সিউড়ীতে ধরা পরল ৫২ দিনের এক শিশুকে কোলে নিয়ে দম্পতি চরম ভোগান্তির ছবি। গতকাল রাতে হঠাৎ করে ওই শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। তারপর তারা আজ সকালে সিউড়ির বিভিন্ন বেসরকারি থেকে শুরু করে সরকারি সমস্ত জায়গায় ঘোরাঘুরি করলেও মিলেনি চিকিৎসা ব্যবস্থা। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে আউটডোরের টিকিট করলেও সেই আউটডোরেও নেই ডাক্তার। অবশেষে ওই দম্পতিকে হতাশ হয়ে অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়েই ফিরতে হলো বাড়ি।

৫২ দিনের শিশুকে নিয়ে চিকিৎসা করাতে আসা ওই দম্পতি হলেন নীলিমা দাস এবং অক্ষয় দাস। তারা বীরভূমের পাথরচাপুরী এলাকার বাসিন্দা। ওই ছোট্ট শিশুর বাবা-মা জানান, “সকাল থেকে সিউড়ি হেনো কোন ডাক্তারখানা নিয়ে যেখানে ঘুরে দেখি নি। কিন্তু কোথাও কোন ডাক্তার আজ চিকিৎসা করবে না এনআরএস কাণ্ডের দরুন। শেষে আউটডোরে এসেও চিকিৎসা না পেয়ে জ্বরাক্রান্ত শিশুকে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।”

কর্মবিরতির বিষয়ে ডাক্তার দেবাশীষ দেবাংশী জানান, “গত সোমবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডাক্তারদের মেরে ফেলার জন্য ২০০ জন লরিতে করে এসে হামলা চালিয়েছিল। তবে এই ঘটনা এই প্রথম নয়। যে ডাক্তাররা মানুষের প্রাণ বাঁচায় তাদের উপর আক্রমণ গত দেড় বছরে ১৯০ টির বেশি হয়েছে। আমরা প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে রাজ্যবাসী এবং সরকারকে আমাদের প্রতিবাদ জানানোর জন্য কর্মবিরতির মত পথ বেছে নিয়েছি। তবে এই কর্মবিরতির মাঝেও আমরা সিনিয়র ডাক্তাররা হাসপাতালে ইমার্জেন্সি সার্ভিস চালু রেখেছি সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য। যদিও জুনিয়ার ডাক্তাররা পুরোপুরি কর্মবিরতির পথে নেমেছে এবং সেই কর্মবিরতিকে আমাদের সমর্থন রয়েছে। আর এরপরেও যদি সরকারের কোন রকম হেলদোল না হয় তাহলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যাবো।”

ডাক্তারদের এই কর্মবিরতির মূলে রয়েছে, গত সোমবার রাতে রোগীর মৃত্যুকে ঘিরে এনআরএসে ব্যাপক উত্তেজনা। রোগীর আত্মীয়দের হাতে নিগৃহীত হন জুনিয়র ডাক্তাররা। এমনকি রোগীর আত্মীয়দের ছোঁড়া ইঁটের আঘাতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন এক জুনিয়র ডাক্তার পরিবহ মুখোপাধ্যায়। এরপরই ডাক্তারদের সংগঠনের তরফ থেকে এমন কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়।

কাটোয়া: এনআরএস কাণ্ডের জেরে কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসকদের কর্মবিরতি জন্য কয়েকশ রোগী ব্যাপক সমস্যায় পড়েছেন। বহু দূর থেকে আসা রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন। যদিও হাসপাতালের জরুরী বিভাগে পরিষেবা চালু রয়েছে।

কাটোয়ায় চিকিৎসা না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন রোগীরা

কেতুগ্রামের রঘুপুর গ্রামের বাসিন্দা মিঠু প্রামানিক বলেন প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে ভাগীরথী নদী পেরিয়ে কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে পায় চিকিৎসার জন্য এসেছিলাম। কিন্তু, চিকিৎসকদের কর্মবিরতি জেরে আউটডোর বন্ধ থাকায় চিকিৎসা পরিষেবা পেলাম না। এখন বাইরে থেকে চিকিৎসা করিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেই বাঁচি।

কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে সুপার এন আর এস কান্ডি জুনিয়র ডাক্তারদের উপরে তা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের এখানকার চিকিৎসকরা আন্দোলনে  নেমেছেন। তবে রোগীদের কোন রকম অসুবিধা না হয় সেই কথা মাথায় রেখেই আমরা জরুরী পরিষেবা ইনডোর চালু রেখেছি।

বাঁকুড়া:  জুনিয়র ডাক্তারদের লাগাতার কর্মবিরতির ও অবস্থানের ফলে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চরম অবব্যবস্থা অব্যাহত। চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত।  এই অভিযোগ তুলে ফের বুধবার সকালে হাসপাতালের সামনের রাস্তায় পথ অবরোধ করলেন রোগীর আত্মীয়রা। এই অবস্থায় শহরের গোবিন্দনগর বাসস্ট্যাণ্ডে ঢোকার মুখে আটকে পড়েছে বহু যাত্রীবাহি বাস ও অন্যান্য যানবাহন। তীব্র গরমে সমস্যায় সাধারণ মানুষ। উল্লেখ্য, একই অভিযোগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঐ জায়গায় রোগীর আত্মীয়রা পথ অবরোধ করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে অবরোধ তুলে দেয়। এই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। জুনিয়র ডাক্তারদের অবস্থান না তুলে কেন সাধারণ মানুষের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ করলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। পথ অবরোধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বিশাল পুলিশ বাহিনী হাসপাতাল চত্ত্বরে পৌঁছেছে।

রাজ্যের অন্যান্য অংশের  সঙ্গে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালেও এদিন ‘আউটডোর’ পরিষেবা বন্ধ থাকায় চরম সমস্যায় দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের আত্মীয়রা। এবিষয়ে আগাম কিছুই জানানো হয়নি বলে অভিযোগ। সাতসকালে এই হাসপাতালের আউটডোরে চিকিৎসা করাতে আসা কল্পনা মণ্ডল বলেন, “এবিষয়ে আগাম কোন নোটিশ দেওয়া হয়নি। কি করবো ভেবে পাচ্ছি না।”একই অভিযোগ সনাতন দাস সহ অন্যান্যদেরও।তাঁদের কথায়,”রাত থাকতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভোর থেকে হাসপাতালে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।পরে আউটডোর বন্ধের খবর শুনি।প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়েও ডাক্তার দেখানো হল না বাড়ি ফিরে যেতে হবে। সাধারণ মানুষ হয়রানির স্বীকার।”

 

ক্লিক করুন এখানে, আর চটপট দেখে নিন ৪ মিনিটে ২৪টি টাটকা খবরের আপডেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *