ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বাংলাদেশে, ঈদে অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে

 

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ মূলত রাজধানীতে হলেও ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচশো জন এই মশাবাহিত ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, আসন্ন ঈদুল আজহার সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়ে  গ্রামে চলে গেলে এই ভাইরাস সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পরিস্থিতি তেমন হলে কী ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে? এমন এক প্রশ্নের জবাবে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মেহেরজাদী সাব্রিনা ফ্লোরা বলছেন, ঢাকা থেকে যারা যাবেন তাদের মধ্যে একটা অংশ কোনো না কোনওভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। তিনি বলেন, কিন্তু এদের মধ্যে কারও হয়তো জ্বর থাকবে, আবার কারও হয়তো তখনো জ্বর নেই কিন্তু পরে জ্বর হতে পারে। তিনি বলেন, এডিস মশা এখনো শহরকেন্দ্রিক। সাধারণত এ মশা একশো’ থেকে চারশো’ মিটারের বেশি উড়তে পারে না। কিন্তু পরিবহনের মাধ্যমে এটা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে।

ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ এখন দেশজুড়ে। ৬৪ জেলাতেই আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে রাজধানীর পাশাপাশি সারাদেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এখন ডেঙ্গু রোগীর ভিড়। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট এবং সামর্থ্যরে সবটুকু ব্যয় করেও সরকারি হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না। হাসপাতালগুলোতে ব্যবস্থাপনা সংকট প্রকট। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলিতে আইসিইউ, রক্তের ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অভিজ্ঞ জনবল সংকট থাকায় ভুল চিকিৎসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, ঢাকার মতো চিকিৎসা সেবা মফস্বলে হবে না। ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগীদের শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে রাস্তায় মারা যাচ্ছেন রোগী। বাংলাদেশের বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকার বাইরে কিছু সংখ্যক সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলেও তা একেবারেই সীমিত।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় পাঁচজন মহিলা খেলোয়াড়, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকসহ ১৬৮৭ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মালিহা মাহফুজ অন্নি নামে এক অন্তঃসত্ত্বা নারী, সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী রাইয়ান সরকারসহ তিন জন মারা গেছেন। মালিহা মাহফুজ অন্নি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মারা যান। ১০ দিন আগে জ্বর নিয়ে মালিহা রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। পরীক্ষায় তাঁর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিয়ে আসা হয় বিএসএমএমইউতে। সেখানে তাঁকে আইসিইউতে রাখা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। শুক্রবার ভোরে তিনি মারা যান।

এদিকে বাংলাদেশের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কলকাতার একটি বিশেষজ্ঞ দল ঢাকায় আসার কথা থাকলেও আপাতত সেটা হচ্ছে না। দুই দেশের প্রোটোকল জটিলতায় এখন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মতবিনিময়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম চেয়েছিলেন কলকাতা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে একটি মত বিনিময় করে তাদের অভিজ্ঞতা জানতে।

কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণের রি-এজেন্ট। রি-এজেন্টের সংকট দেখিয়ে ঢাকার বাইরের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ইতোমধ্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে। চট্টগ্রামেও বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বরিশালের হাসপাতালগুলোতে রোগ পরীক্ষার হিড়িক পড়ায় ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটস (এনএস-১) সংকট দেখা দিয়েছে। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রক্তের এ পরীক্ষাটি বন্ধ রয়েছে। গতকাল ঢাকা শিশু হাসপাতালে জরুরি বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায়, রোগী নিয়ে স্বজনদের লম্বা সারি। শিশুদের প্রায় সবাই জ্বরে আক্রান্ত। কোনও শিশু জ্বরে কাতরাচ্ছে। কেউ কাঁদছে। অসুস্থ শিশুদের নিয়ে জরুরি বিভাগের সামনে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও চিকিৎসকদের দেখা না পেয়ে অভিভাবকরা অস্থির হয়ে পড়ছেন। অনেকেই করছেন হট্টগোল।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেল্থ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৬৮৭ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৯৬ জন। এ নিয়ে বাংলাদেশে চলতি বছরে ২১ হাজার ২৩৫ জন রোগী বিভিন্ন সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪ হাজার ৬৩৯ জন রোগী সুস্থ হয়েছেন ও বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ৬ হাজার ৫৮২ জন।

(Visited 7 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here