সৃজিত ঘোষের ‘গুমনামি বাবা’কে ঘিরে বিতর্ক, মোদি সরকারের কাছে আসল তথ্য প্রকাশের দাবী প্রাক্তন সেনা প্রধানের

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক | August 19, 2019 | 9:47 pm

ইন্দ্রাণী দাশগুপ্ত, নিউ দিল্লী: সম্প্রতি সৃজিত ঘোষ এর ‘গুমনামি বাবা’ চলচ্চিত্র নিয়ে সরগরম রাজ্য রাজনীতি। এই ফিল্ম নিয়ে স্বভাবতই দুই ভাগ হয়ে গেছেন নেতাজি প্রেমীরা। তার উপরে আবার গত রবিবার প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি) কর্তৃক ‘১৮ জুলাই’ কে সুভাষ চন্দ্রের মৃত্যু দিন বলে মেনে নিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় শোরগোল পড়ে গেছে সমগ্ৰ ভারতবর্ষজুড়ে। নেতাজি প্রেমীদের সাথে সুভাষচন্দ্রের পরিবারও এই বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত।

দীর্ঘদিন ধরেই ‘গুমনামি বাবা’ বা জলপাইগুড়ির শোলমারী বাবাকে নেতাজি প্রতিপন্ন করার বহু চেষ্টা হয়েছে। তবে কোনো যুক্তিসংগত কারণ এখনো ভালোভাবে তুলে ধরতে পারেনি প্রচার কারীরা। এমতাবস্থায়, গুমনামি বাবাকে নিয়ে সৃজিতের করা চলচ্চিত্রে যে ট্রেলার প্রকাশিত হয়েছে সেখানে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে- পরিচালক গুমনামি বাবার সাথে সুভাষচন্দ্রের একটা সংযোগ স্থাপন করার সবরকম প্রয়াস করেছেন। এই প্রসঙ্গে গবেষক এবং মুখার্জি কমিশনে দোভাষী হিসাবে কাজ করা শ্রীমতি পূরবী রায় এক কথায় সৃজিতের এই দাবিকে নস্যাৎ করে দেন। তিনি বলেন” সৃজিতের আরও পড়াশোনা করা উচিত ছিল। প্রচলিত গল্প কথা নিয়ে বহু সিনেমা হয়েছে এটা ঠিকই, কিন্তু বিষয়টা যখন নেতাজি সম্বন্ধীয় তখন আরো বেশি সাবধান হওয়া প্রয়োজন ছিল সৃজিতের। জাস্টিস মুখার্জির সাথে দীর্ঘদিন আমি কাজ করেছি, আমি জানি নেতাজির মত ১০ টি ‘ক্লোন’ ভারতবর্ষে তৈরি করা হয়েছিল বা বাইরে থেকে আনা হয়েছিল। এবং জহরলাল নেহেরু তখন আইবির ডিরেক্টর জেনারেল ভোলানাথ মল্লিককে নির্দেশ দিয়েছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের দশটা ডামি তৈরি করার জন্য। ভোলানাথ মল্লিকের নোটসও আছে এই বিষয়ে। আসলে যখন জহরলাল নেহেরু বুঝতে পেরেছিলেন যে নেতাজির তাইহোকু বিমান ক্রাশ এর মৃত্যু হয়নি, তিনি রাশিয়া বা অন্য কোথাও আত্মগোপন করে আছেন, তখন তিনি ভীষণ অস্থির হয়ে ওঠেন, তখনই তিনি বি এন মল্লিক কে জিজ্ঞেস করেন কি করব? তারপর ইন্টেলিজেন্স এর সাথে বৈঠক করেই নেহেরু এই সিদ্ধান্ত নেন। জাস্টিস মুখার্জি এই দশ জনের সাথেই মিলিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।’

তিনি আরোও বলেন, ‘এছাড়াও গুমনামি বাবার যে হাতের লেখা পরীক্ষা হয়েছিল তাও সুভাষ চন্দ্রের সাথে কোন অবস্থায় মেলেনি। আমরা যারা মুখার্জি কমিশন এ কাজ করেছি, সকলেই পরিষ্কার জানি সুভাষচন্দ্রের তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় ১৮ এপ্রিল মৃত্যু হয়নি। তিনি ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য সম্পূর্ণ এই গল্পটা তৈরি করেছিলেন। তাই শ্রীজিৎ সহ যারা নতুন ভাবে হঠাৎ করেই দাবি করা শুরু করেছেন যে গুমনামি বাবাই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, তাদের কাছে আমি দাবি করছি আই বি রিপোর্ট প্রকাশ করার। আর অনুরোধ করছি বিশেষ করে সৃজিতকে, সে তো অনেক খাতা বই উল্টেপাল্টে নেতাজি নিয়ে গবেষণা করছে ,তাকে বলছি আর একটু ভালো করে পড়াশুনা করো। গভীর মন দিয়ে জানার চেষ্টা করো ইতিহাস কে। না হলে নেতাজির মত মানুষকে নিয়ে এই বালখিল্য করার কোন অধিকার তোমাদের নেই।”

এই প্রসঙ্গে আর এক নেতাজি প্রেমী ও গবেষক জেনারেল জি ডি বক্সি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সৃজিতের এই চলচ্চিত্রকে একটা ‘অপপ্রয়াস’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থাকার কারণে আমি পরিষ্কার বলতে পারি তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি। এই ঘটনার পরে নেতাজি রাশিয়াতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাশিয়া তাকে ব্রিটিশের হাতে তুলে দেয় বলেই সেনাবাহিনী ধারণা। কিন্তু এর কোন প্রামাণ্য তথ্য প্রমাণ আমাদের কাছে নেই তবুও একটা কথা বলব রাশিয়া থেকে সাইবেরিয়া, চীন তিব্বত, নেপাল হয়ে যদি নেতাজি ভারতে ফিরে আসতেন ই, তাহলে এই মাপের, এই বিশাল পরিধির একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কি গুমনামি বাবা নামের আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে থাকতেন? এটা কি সম্ভব? এছাড়াও গুমনামি বাবার জন্যে আমরা বারবার সেনাবাহিনী থেকে ডিএনএ টেস্ট করার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেই পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এমনকি গুমনামি নামে বাবার মৃত্যুর পরেও খুব তাড়াতাড়ি তার মৃত শরীর দাহ করা হয়। অনেক বার বলা সত্ত্বেও আমাদের কোন খবর দেওয়া হয়নি। কিন্তু যতটুকু পরীক্ষা নিরীক্ষা আমরা করেছি, তাতে আমি পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম গুমনামি বাবার সাথে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কোন মিল নেই। কারণ, আমাকে আপনাকে অনুকরণ করতে পারে যে কেউই, কিন্তু ইন্টেলিজেন্সের চোখকে ফাঁকি দেওয়া খুব কঠিন। তাই আমি খুব জোরের সাথে গুমনামি বাবা যে সুভাষচন্দ্র বসুর নন- সেটা দাবী করছি এবং একই সাথে ১৮ জুলাই তাইহোকু বিমান বন্দরে ও নেতাজির মৃত্যু হয়নি সেটাও দাবি করছি। আমি জানি না সরকার নতুন কোনও পলিসি নিচ্ছে কিনা, না হলে পিআইবি হঠাৎ করে এতদিন পরে ‘১৮ জুলাই নেতাজির মৃত্যু দিন’ ঘোষণা করে দিল কি করে? মোদিজীর কাছে আমার একান্ত অনুরোধ বাজপেয়ী আমলে তৈরি মুখার্জী কমিশনের রিপোর্ট অবিলম্বে প্রকাশ করুন। তাহলেই সমস্ত সমস্যা, সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটবে। এবং দেশের মানুষের ও মুখার্জি কমিশন রিপোর্ট জানার অধিকার আছে। কারণ আমরা এমন একজন মানুষকে নিয়ে কথা বলছি, যে দেশের জন্য ভারতবাসীদের জন্য নিজের সবটুকু উৎসর্গ করেছিলেন। এবং তিনিই প্রথম স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা ভারতবর্ষে উত্তোলিত করতে পেরেছিলেন। সেই অর্থে নেতাজি’ই আমাদের দেশের প্রথম সেনানায়ক এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীও বটে।”

গবেষক জেনারেল জি ডি বক্সি এদিন আরও বলেন, ”সরকারের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ- ৩৭০ ধারা বা তিন তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিল যেমন সাহসের সাথে সংসদে পাস করানো হলো, ঠিক তেমন ভাবেই ইতিহাসের এই অজ্ঞাত অধ্যায়কেও নিয়ে আসা হোক আপামর ভারতবাসী সামনে। তবেই সঠিকভাবে সম্মান জানানো হবে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কে এবং তার দেশের জন্য লড়াইকে। সেইসাথে সম্মান জানানো হবে- আজাদ হিন্দ ফৌজের সেইসব সেনানীকে যারা দেশের জন্য আত্ম বলিদান দিয়েছিলেন।”

(SAH)

ক্লিক করুন এখানে, আর চটপট দেখে নিন ৪ মিনিটে ২৪টি টাটকা খবরের আপডেট