বর্ধমানের আইনজীবী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ, আইনজীবীদের কর্মবিরতির ডাক

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: চারদিন পেরিয়ে যাবার পরেও আধরাই রয়ে গেছে পূর্ব বর্ধমানে মহিলা আইনজীবী খুনে অভিযুক্তরা। কালী পুজোর দিন সকালে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আঝাপুর গ্রামের বাড়িথেকে উদ্ধার হয়েছিল আইনজীবী মিতালি ঘোষের রক্তাত মৃতদেহ। রহস্যজনক এই খুনের ঘটনার কুলকিনারা উদ্ধারে জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের সাহায়্য নিল জেলা পুলিশ। সিআইডির ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরীর সিনিয়র সাইনটিস্ট চিত্রাক্ষর সরকার বুধবার পৌছান আঝাপুর গ্রামে মিতালি ঘোষের বাড়িতে। মঙ্গলবার কলকাতার সিআইডি ভবন থেকে দুই ফিঙ্গার প্রিন্ট বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর গোটা বাড়ি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে যান।

এদিকে চারদিন অতিক্রান্ত হয়ে যাবার পরেও পুলিশ খুনিকে চিহ্নিত করতে না পারায় বর্ধমান আদালতের আইনজীবীদের পাশাপাশি হতাশ মৃতের পরিবার। নিরপেক্ষ তদন্ত ও অভিযুক্তকে গেপ্তারির দাবিতে বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট সহ রাজ্যের সমস্ত আদালতে কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে বর্ধমান বার অ্যাসোসিয়েশন।

বুধবার দুপুর পৌনে চারটে নাগাদ ফরেনসিক এক্সপার্ট চিত্রাক্ষর সরকার পৌছান আইনজীবী মিতালি ঘোষের বাড়িতে। একই সময়ে মহকুমা পুলিশ আধিকারিক আমিনুল ইসলাম খান সহ অন্য পুলিশ কর্তারা সেখানে পৌছান। মিতালিদেবীর বাড়ির সদর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে কিভাবে খোলা যায় সেই বিষয়টি চিত্রাক্ষর বাবুকেও ভাবিয়ে তোলে। বাড়ির কাজের একটি মেয়েকে দিয়ে পুলিশ মিতালিদেবীর বাড়ীর ভিতর ও বাইরে থেকে সদর দরজা খোলা ও বন্ধ করায়। চিত্রাক্ষর বাবু তা নিজে পরখ করেন।

এছাড়াও এদিন তিনি ওই বাড়ির ঘরের মেঝে, ছাদ ও পাশের বাড়ির বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখেন। বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা রক্তের নমুনা তিনি সংগ্রহ করেন। যে জায়গায় আইনজীবীর মৃতদেহ পড়েছিল সেই জায়গা ও তার চারপাশ এবং লন্ডভন্ড ঘর চিত্রাক্ষর বাবু খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন। এরপর তিনি পুলিশ কর্তাদের সঙ্গেনিয়ে আইনজীবীর বাড়ির ছাদের উপরে উঠে যান। ছাদ থেকেই তাঁর নজরে আসে বাড়ির মূল সদর দরজার পিছনের দিকেও একটি দরজা রয়েছে। ছাদ থেকে নেমে চিত্রাক্ষর বাবু ও পুলিশ কর্মীরা সেই দরজার কাছে পৌছান। দরজাটির একপাশের প্রায় সাড়ে ছয় ফুট উুঁচু একটি পাঁচিল রয়েছে। সে পাঁচিলের দেওয়ালে পায়ের ঘসা দাগ দেখা যায়। পুলিশের অনুমান কেউ পাঁচিল টপকানোর সময়ে তাঁর পায়ের ঘসায় দেওয়ালে দাগ পড়েছে। ওই দরজাটি খোলানো করা হয়। দরজা খোলার পর সেখানদিয়ে বাড়ির ভিতরের গিয়ে দেখা যায় ওই বাড়ি ও মিতালি দেবীর ঘরে যাবার মাঝে ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার একটি পার্টিশান দেওয়াল রয়েছে। ওই দেওয়ালেও একই রকম পায়ের ঘসা দাগ চিত্রাক্ষর বাবুর নজরে আসে।

এছাড়াও দেখা যায় কারুর পাঁচিল টপকানো আটকাতে ওই পাঁচিলের মাথায় যে কাঁচের টুকরো বসানো ছিল তার কয়েকটি ভাঙা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পুলিশ ওই ভাঙা কাঁচের টুকরো সংগ্রহ করে। মিতালিদেবী বাড়ির যে ঘরটিতে থাকতেন সেই ঘরটি এদিনও লন্ডভন্ড অবস্থাতেই ছিল। ওই ঘরে তালাবন্ধ অবস্থায় ছিল একটি ট্রাঙ্ক। সেই ট্রাঙ্কের তালা ভাঙা হলে দেখা যায় সেখানে রয়েছে বেশকিছু সোনার অলংকার। হিরের মত উজ্জ্বল চকচকে একটি বস্তুও ওই বাক্স থেকে মেলে। ঘরে একটি আলমারি খোলার পরেও মেলে অলংকার।

এইসবকিছু দেখে পুলিশ কর্তাদের মনে হয়েছে, সোনা গহনা লুটের উদ্দেশ্যে বাড়িতে ঢুকে আঁততায়ীরা মিতালিদেবীকে খুন করেনি। আইনজীবীকে খুনের পেছনে যে অন্য মোটিভ কাজ করেছে তা পুলিশ কর্তাদের কাছে একপ্রকার পরিস্কার হয়ে যায়। মিতালিদেবীর ঘরে লন্ডভন্ড অবস্থায় বহু নথি পড়েছিল। কিন্তু সেখানে জমিজমা সংক্রান্ত নথি দেখা যায়নি। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে জমিজমা নিয়ে কি পরিবারে কারুর সঙ্গে মিতালিদেবীর বিরোধ তৈরি হয়েছিল। খুনের ঘটনার নেপথ্যে কি তাহলে কোন জমি মাফিয়ার যোগসাজোস রয়েছে। যে জমি মাফিয়া খুনের ঘটনা ঘটিয়ে জমির নথিপত্র হাতিয়ে নিয়ে পালিয়েছে।’ এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখাদিয়েছে।

মিতালিদেবীর দেহ উদ্ধারের সময়ে তাঁর একটি হাতের মুঠো থেকে মাথার চুল পাওয়া যায়। তা ফরেকসিক পরীক্ষায় পাঠান হয়েছে। পুলিশ মনেকরছে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও ফরেনসিক রিপোর্টের ভিত্তিতে খুনিকে ধরা সম্ভব হবে।

চিত্রাক্ষর সরকার এদিন বলেন, মৃতার বাড়িথেকে রক্তের নমুনা ও চুল সংগ্রহ করা হয়েছে। রক্তের নমুনা স্টাডি করতে হবে। ঘটনার সময়ে মহিলার সঙ্গে যে ধস্তাধস্তি চলেছিল তা বোঝা যাচ্ছে। আঁততায়ীরা সংখ্যায় যে একের অধীক ছিল তা নিশ্চিৎ করেই বলা যায়। বাড়ির পাঁচিলের দেওয়ালের শ্যাওলায় ঘসা দাগ দেখা গেছে। চিত্রাক্ষর বাবু বলেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।

আইনজীবী খুনের ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন বর্ধমান আদালতের আনজীবীরাও। হতাকাণ্ডের প্রতিবাদে বুধবার কাজ বন্ধ রাখেন সকল আইনজীবীরা। বৃহস্পতিবারও “পেন ডাউন” এর ডাক দিয়েছেন বর্ধমান আদালতের আইনজীবীরা। মিতালি ঘোষ এর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কালনা মহকুমা আদালতের আইনজীবীরাও এদিন কর্মবিরতি চালিয়ে যান।

@এস. এ. হামিদ

(Visited 95 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here