ব্লক কার্যালয় স্থানান্তর, প্রতিবাদে ঘেরাও বিডিও

ব্লক কার্যালয় স্থানান্তরকে ঘিরে প্রতিবাদে উত্তাল দক্ষিণ করিমগঞ্জ, ঘেরাও বিডিও এবং অ্যাকাউনটেন্ট

করিমগঞ্জ (অসম): হাজার মানুষের প্রতিবাদী স্লোগান, তালা বন্ধ ও ঘেরাও কার্যসূচির পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার দক্ষিণ করিমগঞ্জ ব্লক প্রাঙ্গণ সরগরম হয়ে ওঠে। দক্ষিণ করিমগঞ্জ খণ্ড উন্নয়ন কার্যালয় কালিগঞ্জ থেকে স্থানান্তর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ব্লক এলাকার ২১ গ্রাম পঞ্চায়েত (জিপি) প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মকর্তা ও সাধারণ নাগরিক এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে শামিল হয়েছিলেন। তাঁরা দক্ষিণ করিমগঞ্জের বিডিও এবং অ্যাকাউন্টেন্টকে দীর্ঘক্ষণ ঘেরাও করে রাখেন। ব্লক হেডকোয়ার্টার কালিগঞ্জ থেকে নিলামবাজারের ভাড়া ঘরে স্থানান্তরে সরকারি বিতর্কিত নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সাব্যস্ত করতে গিয়ে ব্লকের মূল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন প্রতিবাদীরা।

প্রতিবাদী জনতার বিক্ষোভ ও নানা প্রতিবাদী স্লোগানে সমস্ত কালিগঞ্জ অঞ্চলের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তারা সরকারি বিতর্কিত নির্দেশটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করা না হলে আরও তীব্র গণ-আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার কড়া হুঁশিয়ারি দেন।

উল্লেখ্য, এর আগে এই খণ্ড উন্নয়ন কার্যালয়টি কালিগঞ্জ থেকে নিলামবাজারে স্থানান্তরের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চলছে বলে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে জেলাশাসকের মাধ্যমে রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন বিভাগের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারির কাছে একটি স্মারকপত্র প্রেরণ করা হয়। বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে দক্ষিণ করিমগঞ্জ ব্লক সুরক্ষা সংগ্রাম সমিতির সভাপতি বিভাস বর্ধন জানান, কালিগঞ্জ অঞ্চলের শ্যামনগর এলাকায় ১৯৬৮ সালে স্থানীয় জনগণের দানকৃত প্রায় তেত্রিশ বিঘা জমির উপর ২১টি জিপি নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। এই ব্লকের অধীনে দক্ষিণ করিমগঞ্জ বিধানসভা এলাকার ১১টি জিপি ছাড়াও বদরপুর ও উত্তর করিমগঞ্জ বিধানসভা এলাকার ১০টি জিপি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সরকারি নিয়মানুসারে এই ব্লক হেড কোয়ার্টারের পাশে ব্লক প্রাথমিক শিক্ষাধিকারিকের কার্যালয়, আইসিডিএস অফিস, পশু হাসপাতাল, ব্লক ক্যম্পাসে আঞ্চলিক পঞ্চায়েত ও ব্লক লাইভলি হুড মিশন, বায়ো ডাইভারসিটি কমিটি অফিস সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কিন্ত বর্তমানে একটি স্বার্থন্বেষী মহল রাজনৈতিক মুনাফা আদায়ের লক্ষ্যে দিশপুরে মিথ্যা তথ্য পেশ করে এই ব্লক হেড কোয়ার্টার এখান থেকে নিলামবাজারে স্থানান্তরের জন্য নির্দেশিকা জারি করাতে সক্ষম হয়। কিন্ত এর পরই এ-নিয়ে গুয়াহাটি হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলা দাখিল করা হয় বলে ব্লক সুরক্ষা সংগ্রাম সমিতির সভাপতি তথা তরুণ আইনজীবী বিভাস বর্ধন জানান।

বিভাস বর্ধনের স্পষ্ট বক্তব্য, একমাত্র দক্ষিণ করিমগঞ্জের বিধায়কের নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে গণ-দাবি উপেক্ষা করে ব্লকটি এখান থেকে স্থানান্তর করার জোরালো প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিজেপি-র এক নেতাও এই এআইইউডিএফ বিধায়কের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন। অতি সুকৌশলে প্রশাসনের এক শ্রেণির আধিকারিকদের এই ষড়যন্ত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন বক্তা।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণ করিমগঞ্জ বিধানসভা এলাকায় কালিগঞ্জ ব্লকের কয়েকটি জিপি-র সংযোজন বিয়োজন করে আরও নতুন তিনটি ব্লক স্থাপনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অসম সরকার একটি গ্যাজেট নোটিফিকেশন জারি করে। এই নোটিফিকেশনের প্রস্তাবে নতুন ব্লকগুলো কায়স্থগ্রাম, বিনোদিনী এবং বাজারঘাটে স্থাপনের কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। কিন্ত এই নোটিফিকেশন বহাল থাকাবস্থায় হঠাৎ ২০১৮ সালের ২৮ জুন কালিগঞ্জ থেকে দক্ষিণ করিমগঞ্জ ব্লক হেড কোয়ার্টার নিলামবাজারে স্থানান্তর সংক্রান্ত একটি নির্দেশে সমস্ত ব্লক এলাকায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পরবর্তীতে নিলামবাজারে অফিস পরিচালনার জন্য ভাড়া ঘরেরও বন্দোবস্ত করা হয়। পূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে ঘরের ভাড়া নির্ধারণ হওয়ার পর বিডিও-কে ঘরের মালিকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেন জেলা পরিষদের পূর্বতন সিইও।

এ-প্রসঙ্গে ব্লক সুরক্ষা সংগ্রাম সমিতির সভাপতি বিভাস বর্ধন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সরকারিভাবে প্রকাশিত গ্যাজেট নোটিফিকেশন যতক্ষণ পর্যন্ত বাতিল বলে ঘোষণা করা হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত নোটিফিকেশনের বিরুদ্ধ কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা আইন-বিরুদ্ধ। তাছাড়া নিজস্ব বিল্ডিং থেকে কোনও কার্যালয় ভাড়া ঘরে স্থানান্তর করতে হলে নির্ধারিত ভাড়া মঞ্জুরির জন্য সরকারের ‘বাজেট প্রভিশন’ থাকতে হবে। অন্যথায় ভাড়া আদায়ের জন্য দায়ী কে থাকবে? সুস্পষ্ট কোন নীতি নির্দেশিকা না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক চাপে এ-সব ষড়যন্ত্র চলছে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য, বর্তমানে এই ব্লক কার্যালয়টি নিলামবাজার সার্কলের অন্তর্গত দক্ষিণ করিমগঞ্জ বিধানসভা এলাকার সীমান্তে তিন সমষ্টির মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। দক্ষিণ করিমগঞ্জ আঞ্চলিক পঞ্চায়েতের ২১টি জিপি প্রতিনিধিদের বিকেলে ব্লক প্রাঙ্গণে আহূত এক বৈঠকে সম্প্রতি এই কার্যালয়টি কালিগঞ্জ থেকে স্থানান্তর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার ঐক্যবদ্ধ সিদ্বান্ত গ্রহণ করা হয়। এর আগে বৃহত্তর দক্ষিণ করিমগঞ্জের জনগণ অনুরূপভাবে রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী, পঞ্চায়েতমন্ত্রী, বিভাগীয় প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, জেলাশাসক, জেলা পরিষদের সিইও এবং বিডিও-র কাছে স্মারকপত্র পেশ করে ব্লক স্থানান্তরের বিরুদ্ধে জোরালো আওয়াজ তুলেন।

শুক্রবার আহূত প্রতিবাদী কার্যসূচিতে সমাজসেবী গৌরাঙ্গ ভট্টাচার্য, আইনজীবী জাকির হোসেন, জিপি সভাপতি আব্দুল ফত্তাহ, মোস্তাক আহমদ, আনোয়ার হোসেন, এপি সদস্য বদরুল ইসলাম-সহ সবকটি জিপি-র এপি সদস্য ও পঞ্চায়েত সভাপতি উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে অন্য  এক সূত্রে জানা গেছে, কালিগঞ্জ থেকে ব্লক হেড কোয়ার্টার স্থানান্তরিত হওয়ার গুজব সম্পূর্ণ মিথ্যাজ। দক্ষিণ করিমগঞ্জের আওতাধীন ১১টি জিপি নিয়েই নিলামবাজারে আলাদা নুতন একটি ব্লক স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে রাজ্যআ সরকার। কারণ দক্ষিণ করিমগঞ্জের ব্লক কার্যালয় নিজের সমষ্টির ভিতরে কোথাও অবস্থিত থাকার কথা। কিন্ত দক্ষিণ করিমগঞ্জের ব্লক কার্যালয়টি বদরপুর সমষ্টির শ্যা মনগরে অবস্থিত। তাই দক্ষিণ করিমগঞ্জের জনগণের সুবিধার্থে সমষ্টির মধ্যষবর্তী স্থান নিলামবাজারে ১১টি জিপি নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি ব্লক কার্যালয় স্থাপনের সরকারি নির্দেশ রয়েছে। কালিগঞ্জ শ্যা মনগরে থাকা ব্লক হেডকোয়ার্টার স্থানান্তরণের কোনও প্রশ্নই আসে না। সম্পূর্ণ ঘটনাটি ভুল বোঝাবোঝির নামান্তর মাত্র।

(Visited 8 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here