২৮ মে স্বাতন্ত্র্যবীর বিনায়ক রাও দামোদর সাভারকর-এর জন্মদিন

শুভব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

ঊষালগ্ন। চতুর্দিক নিস্তব্ধ। সমুদ্রের কালো জলে একটি বৃটিশ জাহাজ নিশ্চল হয়ে রয়েছে। যান্ত্রিক বিভ্রাট, তাই এগুনো যাচ্ছে না। একটু একটু করে কালো অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। একটু দুরে ফ্রান্সের উপকূল, মার্সেলিন পোতাশ্রয়। সেই অন্ধকারে সবার অলক্ষ্যে একজন ভারতীয় বন্দী, জাহাজের পোর্টহোল দিয়ে বেরিয়ে এসে সমুদ্রের কালো জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে সাঁতার কেটে তীরভূমি তথা পোতাশ্রয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে লক্ষ্য ওই স্থলভূমি মার্সেলিন পোতাশ্রয়, ফ্রান্সের মাটি। হঠাৎ নিশ্তব্ধতা ভেদ করে শোরগোল উঠল, শুরু হল হই চই। জাহাজে বিপদ সংকেত ঘন্টা বাজতে শুরু করল। কি ব্যাপার? জাহাজের দুরবীনের সাহায্যে পহরীরা দেখে সমুদ্রের কালো জলে একজন সাঁতার কেটে তীরভূমির দিকে এগিয়ে চলেছে। কখনও উত্তাল তরঙ্গ শীর্ষে উত্থিত হয়ে, কখনও দুই তরঙ্গের মধ্যবর্তী নিম্নদেশে নিমজ্জিত হয়ে ফরাসী উপকূলের দিকে এগিয়ে চলেছে। প্রহরীদের কারও সাহস হল না উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই পলায়নপর ব্যক্তিটিকে ধরে আনে। সুতরাং প্রহরীরা সেই পলায়নপর ব্যক্তিটিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করল। ইতিমধ্যে জাহাজ থেকে লাইফ বোট নামানো হল; স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড পুলিশ এবং প্রহরীরা ওই পলায়নপর ব্যক্তিটিকে অনুসরন করতে শুরু করল। ইতিমধ্যে পলায়নপর ব্যক্তিটি ফরাসী দেশের আইনের সাহায্য লাভের আশায় ডকওয়াল স্পর্শ করল। মার্সেলিসের ডকওয়াল অত্যন্ত উঁচু এবং খাড়া। ওই ডকওয়াল অতিক্রম করা খুবই কষ্ট সাধ্য। অতিকষ্টে সেই ডকওয়াল অতিক্রম করলেন পলায়নপর ব্যক্তিটি। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মাটিতে দাঁড়িয়ে মুক্ত বায়ু সেবন করে ক্লান্তি দুর করতে লাগল। কিন্তু না দাঁড়ালে চলবে না। ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো তাড়া করে আসছে বৃটিশ পুলিশ আর চিৎকার করছে “চোর চোর ধর ধর “মুহুর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে সেই পলায়নপর ব্যক্তিটিও চিৎকার করতে লাগল “পুলিশ পুলিশ।” অবশেষে একজন ফরাসী পুলিশের দেখা পেয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে থাকল “আমি বিপ্লবী চোর নই,আসামী নই আমাকে বন্দী করো। ইংরেজ পুলিশ আমাকে বন্দী করতে আসছে। স্বাধীন রাষ্ট্র ফ্রান্সের মাটিতে তারা আমাকে বন্দী করতে পারে না। কিন্তু তুমি পার। তুমি আমাকে বন্দী করো। ” ইতিমধ্যে ইংরেজ পুলিশ ওই স্থানে উপস্থিত হয়ে ওই ব্যক্তিকে বন্দী করতে উদ্যত হলে ফরাসী পুলিশটি আপত্তি জানায়। এরপর ইংরেজ পুলিশ আর ফরাসী পুলিশের মধ্যে কিছু কথাবার্তা হয়। তারপর ইংরেজ পুলিশ ওই ফরাসী পুলিশকে কিছু স্বর্ণমুদ্রা দিলে সে হৃষশট চিত্তে ওই স্থান পরিত্যাগ করে। এরপর ইংরেজ পুলিশ ওই পলায়নপর ব্যক্তিটিকে আটক করে এবং টানতে টানতে জাহাজে নিয়ে তোলে। ইতিমধ্যে জাহাজের যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত হয় এবং জাহাজ ভারত অভিমুখে রওয়ানা দেয়। ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত বন্দীটির মুক্তিলাভের শেষ প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

হ্যাঁ,এই ব্যক্তিটিই হলেন ভারত জননীর অসীম সাহসী সন্তান স্বাতন্ত্রবীর বিনায়ক রাও দামোদর সাভারকর, যাঁকে বলা হয়ে থাকে বিপ্লবীদের বিপ্লবী। এক জীবনে দুবার যাবজ্জীবন কারাদন্ড (৫০ বছর) দ্বীপান্তর, বই প্রকাশিত হওয়ার আগেই ইংরেজের রোষেই তা বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনা, ধর্মাধিকরণ বঞ্চিত প্রথম ভারতীয় ব্যারিষ্টার, বিদেশী বস্ত্র বহ্নুৎসবের প্রথম ভারতীয় এবং আরও অনেক কিছু। অসংখ্য যুবককে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করা, দেশব্যাপী বিপ্লবীদের সংগঠন তৈরী করা,অগ্নি বর্ষন করা বক্তৃতা এসব কিছুই বীর সাভারকরের বৈশিষ্ট্য। মহারাষ্ট্রের চিৎপাবন বংশের সন্তান ছিলেন সাভারকর। ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দের ২৮শে মে নাসিক জেলার ভাগুর গ্রামে। মাত্র দশ বৎসর বয়সে তাঁর মাতৃবিয়োগ ঘটে। সাভারকর তার দুই নাবালক ভ্রাতা এবং এক নাবালিকা ভগিনী সবাই পিতা দামোদর পন্থের তত্ত্বাবধানে বড় হতে থাকেন। মাত্র দশ বৎসর বয়সে বিনায়ক রাও দামোদর সাভারকর কবিতা এবং বিদগ্ধজনের প্রশংসা অর্জনকারী প্রবন্ধ রচনা করতে পারতেন। ১৯০১ খৃষ্টাব্দে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করেন এবং ১৯০৫ খৃষ্টাব্দে বিএ পাশ করে আইন পড়ার জন্য বোম্বাই চলে আসেন আর ১৯ “ফ্রি ইন্ডিয়া সোসাইটি”। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তির দলের সদস্য ছিলেন। লন্ডন থেকে এই দলের মাধ্যমে বিপ্লবের প্রচার চালানো হত। বোমা তৈরীর ফর্মূলা পাঠানো হত ভারতে। দুজন বিপ্লবী মরক্কো গেল যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। আর সাভারকরের কলম ঝরাতে লাগল আগুন। মদনলাল ধিংরা কার্জন উইলিকে হত্যা করল। সাভারকর ব্যারিষ্টারী পাশ করলেন কিন্তু তাঁকে ব্যারিষ্টারী করার সুযোগ দেওয়া হল না। তাঁর “প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম ১৮৫৭” বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই বেআইনী হয়ে গেল। তাঁকে যে কোনও সময় গ্রেফতার করা হতে পারে এই আশঙ্কায় তাঁর শুভাকাঙ্খীরা তাঁকে প্যারিসে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেখানে থাকতে না পেরে চলে এসেছিলেন। ১৯০৬ সালে একটি বক্তৃতা দেওয়ার অপরাধে ১৯১০ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ভারতে আনা হচ্ছিল। পরের ঘটনা পূর্বেই ঊল্লেখিত হয়েছে।

ফরাসী পুলিশকে ঘুষ দিয়ে, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এনে বিচারের নামে প্রহসন করে রায় দেওয়া হল, যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর এবং সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত। অন্য একটি মামলাতেও যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর সাজা হল। একসঙ্গে নয়, এ শাস্তি ভোগ করতে হবে পর পর। পঞ্চাশ বছর থাকতে হবে অন্ধকার কারাগারের অন্তরালে। ১৯১১ খৃষ্টাব্দের ৪ঠা জুলাই সাভারকরকে আন্দামানে আনা হল। প্রথমে তাঁকে দেওয়া হল ছোবড়া পিটিয়ে দড়ি পাকানোর কাজ। পরে তাঁকে দেওয়া হল ঘানি ঘোরানোর কাজ। প্রতিদিন ১০ সের করে তেল বের করতে হবে। অত্যাচার, পরিশ্রম আর অখাদ্য খাওয়া- কিন্তু সাভারকরের মন যেন ইস্পাতে গড়া। অবসর সময়ে কবিতা লিখতেন। কাঠকয়লা দিয়ে দেওয়ালে লিখে মুখস্থ করে নিতেন। অন্যদের মুখস্থ করিয়ে দিতেন। বিভিন্ন খবর বাইরে পাঠাতেন। কয়েদীদের ন্যায্য অধিকারের জন্য আন্দোলন করতেন। শরীর অস্থিচর্মসার হয়ে গেল। মৃত্যু নিশ্চিত ধরে নিলেন অনেকে।

এদিকে সারা দেশে তখন আন্দোলন চলছে সাভারকরের মুক্তির জন্য। মুক্তির আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠলে নানা টানা পোড়েনের পর ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দের ১০ মে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। সাভারকর দেখলেন দেশের মূল সমাজ ক্ষাত্রতেজ শুন্য। সাহস নেই, ক্ষমতা নেই। বিদেশী শাসক এবং স্বদেশী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দ্বারা তারা সমভাবে উৎপীড়িত হচ্ছে। অতএব শক্তি চাই। দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি হিন্দুমহাসভায় যোগ দিলেন। তিনি বোম্বাইএর সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়ে বললেন সাহিত্যিক এবং কবির প্রয়োজনের থেকে দেশে এখন বেশী প্রয়োজন সৈনিক যোদ্ধা এবং সাহসী মানুষের। তিনি আরও বলেছিলেন অষ্ট্রিয়ায় কবি সাহিত্যিকের অভাব ছিল না, কিন্তু তারা পরাজিত হয়েছিল জার্মান বেয়নেটের কাছে,জার্মান সনেটের কাছে নয়। তিনি দেশবাসীকে ব্যাপকভাবে সেনা বাহিনীতে যোগ দিতে অনুরোধ করেন। উদ্দেশ্য ছিল দেশবাসীকে অস্ত্রশিক্ষায়, অস্ত্রচালনায় পারদর্শী করে তোলা। ১৯৪০ সালে সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে অনেক কথা হয়েছিল। তার কিছুদিন পরেই সুভাষ চন্দ্রের অন্তর্ধান। সাভারকর ছুটে বড়াচ্ছেন সারা দেশে। শক্তি চাই,স্বাধীনতা চাই, দেশভাগ রুখতে হবে। দুর্ভাগা দেশ, তাঁর কথা শোনার কেউ নেই। তিনি ব্রাত্য। ১৯৪৬ সালের সাধারন নির্ববাচনে তাঁর দল হিন্দুমহাসভা সম্পুর্নভাবে পরাস্ত হয়েছিল। জয় জয়কার হয়েছিল জাতীয় কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের। জাতীয় কংগ্রেসের তখন অবিসংবাদিত নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী আর তাঁর প্রধান শিষ্য পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু। সেই সময় ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দু মহাসভার কোন ভূমিকাই ছিল না। দেশ বিভাগের আলোচনা টেবিলে সাভারকর কোনও স্থানই পাননি। অথচ তাঁকেই দেশভাগের অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে অপপ্রচার করে থাকে কংগ্রেসের কিছু নেতা। সারা জীবন যিনি অখন্ড ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁকেই দেশভাগের জন্য দায়ী করা হল। ডাক্তারবাবুদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও ১৯৬৬ খৃষ্টাব্দের ২৬শে ফেব্রুয়ারী নিজেকে মৃত্যু দেবতার হস্তে সমর্পন করলেন। দেশবাসী হারালো তাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর যোদ্ধাকে।

ক্লিক করুন এখানে, আর চটপট দেখে নিন ৪ মিনিটে ২৪টি টাটকা খবরের আপডেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *