৩৭০ ধারা কাশ্মীরের ভারতভুক্তির পূর্ব শর্ত ছিল না: সুশীল পন্ডিত

রক্তিম দাশ, কলকাতা: কাশ্মীরের ভারতভুক্তির জন্য ৩৭০ ধারা কোনও পূর্ব শর্ত ছিল না।দৃঢ়ভাবে যুগশঙ্খকে এমনটাই বললেন সুশীল পন্ডিত। উপত্যকায় ঘরছাড়া পন্ডিতদের নিরাপত্তা সহ প্রত্যাবর্তন এবং সমগ্র কাশ্মীর ভারতের অংশ দাবিতে সোচ্চার ‘রুট ইন কাশ্মীর’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সুশীল পন্ডিতের সাফ কথা,‘ কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারতভুক্তির যে চুক্তিপত্র সাক্ষর করেছিলেন তা অন্যান্য করদ রাজ্যের সঙ্গে দিল্লির যে সাক্ষরিত চুক্তিপত্র হয়েছিল, একদম তাই ছিল। এখানে কাশ্মীরকে বিশেষ রাজ্য বা ৩৭০ ধারার কোনও কথায় ছিল না।’
তিনি বলেন,‘ বলা হচ্ছে ৩৭০,৩৫-এ ধারা কাশ্মীরের ভারতভুক্তির শর্ত ছিল। এটা মিথ্যা। কারণ তখনও ভারতের সংবিধান তৈরি হয়নি। সংবিধান চালু হয় ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০। আর কাশ্মীর ভারতে যোগ দেয় ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭। সংবিধান যখন তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯৪৯ এর ১৫ নভেম্বর থেকে। এই সময় কংগ্রেস ওর্য়াকিং কমিটিতে কাশ্মীরকে ৩৭০ ধারা দেওয়ার কথা উঠলে তা খারিজ হয়ে যায়। নেহেরুজি লন্ডন যাওয়ার সময় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে নির্দেশ দেন এটা যুক্ত করার জন্য। বলেন, এটা আপনাকে করতেই হবে। প্যাটেল সবাইকে বুঝিয়ে এই ধারা সংবিধানে যুক্ত করেন। তিনি বলেছিলেন, এটা অস্থায়ী। কারণ এখনও কাশ্মীরে যুদ্ধ চলছে। পরিস্থিতি ঠিক হলে পরে প্রত্যাহার করা হবে। এতে সবাই রাজি হলেন। এই সময় শেখ আবদুল্লা সহ তিন কাশ্মীরিও ছিলেন। তাঁরা তো তখন আপত্তি করেন নি। ওমর আবদুল্লার বাবার বাবাও মেনে নিয়েছিলেন ৩৭০ ধারা অস্থায়ী।’
কাশ্মীরের ভারতভুক্তি নেহেরু চাননি বলে মন্তব্য করে সুশীল বলেন,‘ কাশ্মীর যখন আক্রান্ত তখনই কোন শর্ত ছাড়াই রাজা হরি সিং ভারতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পাঠান ২৪ অক্টোবর ১৯৪৭। নেহেরু তা খারিজ করে দেন। বলেন, যতক্ষণ শেখ আবদুল্লা না আসবেন ততক্ষণ কথা হবে না। এরমধ্যেই শুরু হয় ব্যাপক লুট ও হত্যালীলা। ২৬ অক্টোবর ফের রাজা, শেখ আবদুল্লাকে জেল থেকে বের করে তাঁর রানীকে সঙ্গে দিয়ে দিল্লিতে যোগদানের প্রস্তাব পাঠান মাউন্ট ব্যাটনের কাছে। তিনি তখন ভারতের বিদেশ ও সেনা বিভাগের দায়িত্বে। প্রেম শঙ্করের লেখা ‘রাইভাল ভার্সন অব হিস্ট্রি’ বইতে এর সাক্ষ্য মেলে। মাউন্ট ব্যাটন নেহেরু,প্যাটেল ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সর্দার বলদেব সিং ও সেনা জেনারেল ম্যানেক শাকে ডাকেন। এই বৈঠকে নেহেরুজির অভিমত জানতে চাওয়া হলে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। প্যাটেল বলেন, জহর তুমি চাও না কাশ্মীর? নেহেরু বলেন, হ্যাঁ চাই। সঙ্গে সঙ্গে ম্যানেক শাকে প্যাটেল বলেন, তুমি সেনা প্রস্তুত করে কাশ্মীরে যাও।’
তিনি বলেন,‘ কাশ্মীরের সঙ্গে তখন ভারতের কোনও সড়ক যোগাযোগ ছিল না। ২৭ অক্টোবর শিখ ও কুমায়ুন রেজিমেন্ট প্রথম বিমান নিয়ে অবরুদ্ধ শ্রীনগরে নামে। বিমানবন্দরকে দখল মুক্ত করে। এই সময় কুমায়ুন রেজিমেন্টের কর্ণেল সোমনাথ শর্মা শহিদ হন।’
নেহেরু চাইলেই সমগ্র কাশ্মীর ভারতে আসত অভিযোগ করে সুশীল বলেন,‘ সওয়া একবছর ধরে যুদ্ধ চলে। শুধু উপজাতীরা নয় কাশ্মীর দখলে পাক আর্মি ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব প্রমাণ রাষ্ট্রসংঘের হাতে তুলে দিলে পাকিস্তান স্বীকার করে তাদের সেনাবাহিনীর কয়েকজন কাশ্মীরে গিয়ে যুদ্ধ করেছে। এরপরই ভারতীয় সেনার পক্ষ থেকে পাকিস্তানে আক্রমণ করার অনুমতি চাওয়া হয়। ওদের সাপ্লাই লাইন বন্ধ করার জন্য। কিন্তু অনুমতি মেলেনি। বলা হয় সরকারিভাবে পাকিস্তান যুদ্ধ ঘোষণা করেনি।
১ জানুয়ারি ১৯৪৯ একতরফা যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে দিল্লি। তখন কাশ্মীরের ৬০ শতাংশ মুক্ত হয়েছিল। সেনারা বলে,আর কয়েক সপ্তাহ দিন। পুরো কাশ্মীর আমরা মুক্ত করব। নেহেরু বলেছিলেন, না আমরা বাকিটা রাষ্ট্রসংঘে গিয়ে চাইব।’
একই ভাবে আকসাই চিন ভারতের হাত থেকে চলে গিয়েছে বলে সুশীল বলেন,‘ ১৯৬২-তে আকসাই চিন নিয়ে যখন সংসদ উত্তাল। তখন সংসদে নেহেরু বললেন, ওটা একটা বরফের মরুভূমি, ঘাসও জন্মায় না। তার প্রতিবাদ করে সংসদে মহাবির ত্যাগি নিজের পাগড়ি খুলে তাঁর টাক মাথা দেখিয়ে বলেছিলেন, এখানেও কিছু জন্মায় না। তাহলে কেটে ফেলুন আমার মাথা।’
শ্যামাপ্রসাদের কথা উল্লেখ করে সুশীল বলেন,‘দেশভাগের পর যখন মানবিক কারণে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে কোন পাসর্পোট ছিল না। তখন কাশ্মীরে প্রবেশ করতে পারমিট লাগত। এই অবৈধ আইনের প্রতিবাদ করে শহিদ হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।’
কাশ্মীরকে ভারত থেকে আলাদা করার জন্য টার্গেট হয়েছিলেন হিন্দু পন্ডিতরা। সুশীল বলেন, ‘আমাদের কোনও প্রস্তুতি ছিল না। ১৯৯০ সালে ২৯ জানুয়ারি আমাদের উৎখাত করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এতবড় উৎখাতের ঘটনা আর নেই। আমরা হিন্দু ছিলাম বলে আমাদের বলা হত হিন্দুস্তানের চর। মসজিদ থেকে রাতে মাইকে বলা হতো, আজাদি কি মতলব কেয়া হ্যায়, ইনশাল্লা ইনশাল্লা। সাড়ে চার লক্ষ হিন্দু পন্ডিত যাঁরা ছিলেন কাশ্মীরের ভূমিপুত্র তাঁরা আজাদির নামে ইসলামিক মৌলবাদের স্বীকার হয়ে সেদিন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে ছিলেন উপত্যকা থেকে।’

(Visited 1 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here